মাগুরানিউজ.কমঃ
মাগুরার একটি গ্রামের নাম নরসিংহাটি। মাগুরা জেলা শহর থেকে ৩ মাইল দক্ষিণে মীরের দোহার পাশে দাঁড়িয়ে আছে গ্রামটি। ছায়া ঢাকা পাখি ডাকা নয়নাভিরাম একটি পুরানো আমলের গ্রাম। কোন কিছু সৃষ্টির মূলে থাকে বিশেষ উৎস। তেমনি নরসিংহাটি গ্রামের সৃষ্টির উৎসে রয়েছে কিংবদন্তীর সুর যা আজও মানুষের মুখে মুখে ছুটে চলেছে। ঐতিহাসিকদের মতে ১৬০০ সালের আগে নরসিংহাটিতে কোন লোক বসতি ছিল না। পাশ দিয়ে প্রবাহিত ছিল নদী। আস্তে আস্তে নদীতে চর পড়ে নদীর প্রবাহ অনেক দূরে চলে যায়। তার ফলে চরের পার্শ্বে বড় বড় বিল বাওড়ের সৃষ্টি হয়। কালে কালে চরগুলোতে নানা গাছ-গাছড়া জন্মে মাটি শক্ত হয়। একসময় নরসিংহাটি গ্রাম এলাকা গভীর জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল।
১৬১২ সালে রাজ মহল হতে রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তরিত করা হয়। এ সময়ে নরসিংহাটি এলাকার নদী দিয়ে অনেক সময় দিল্লীতে মুর্শিদাবাদ থেকে রাজ কর্মচারী নৌকাযোগে রাজধানী ঢাকায় যাতায়াত করতেন। তারা যাতায়তের সময় এ সব উর্বর চরগুলো দেখতে পেয়ে লোক বসতি স্থাপন করার জন্য রাজ-দরবারে প্রস্তাব দেন। প্রস্তাব অনুমোদিত হয় এবং লোকবসতি শুরু হয়।
মাগুরা জেলায় মহম্মদপুরে এককালে হযরত মহম্মদআলী শাহ (রঃ) ইসলাম প্রচারের জন্য আগমন করেছিলেন। তার সাথে শিষ্য হিসেবে এসেছিলেন হযরত কেদার শাহ (রঃ)। তিনি ইসলাম প্রচার করতে এসে ডাকাতদের হাতে আক্রান্ত হন পরে নরসিংহাটির গভীর জঙ্গলে পালিয়ে যান। তখন নাকি সেই জঙ্গলে সিংহ ছিল। তিনি জঙ্গলের মধ্যে সিংহের কবলে পড়েন। সিংহ তাকে আক্রমণ করে মারাত্মকভাবে আহত করল। তিনি আল্লাহর দরবারে হাত তুললেন।
আল্লাহর অশেষ মহিমায় জঙ্গলের সব সিংহ তার কাছে ছুটে আসল এবং তার পদতলে লুটিয়ে পড়ল। তিনি তাদের গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করতে লাগলেন। পরে সিংহগুলো তার খুব বাধ্য হয়ে গেল। জঙ্গলের প্রচুর রসালো ফলের গাছ ছিল। তাই খেয়ে কেদার শাহ বেঁচে রইল। তিনি অধিকাংশ সময় আলস্নাহর ধ্যানে মগ্ন থাকেন। একদিন একদল ডাকাত কর্তৃক কেদার শাহ জঙ্গলের মধ্যে আক্রানত্ম হলেন। তারা খবর পেয়েছিল যে কেদার শাহের কাছে প্রচুর ধনন্ত আছে। কেদার শাহকে ডাকাতরা আক্রমণ করেছে দেখতে পেয়ে সিংহের পাল ছুটে এসে তাদের উপর ঝাড়িয়ে পড়ল। তখন এক যুবক ডাকাত তার হাতে ধনুক দিয়ে তীর মেরে একটি সিংহকে হত্যা করে ফেলে। এই দৃশ্য দেখে কেদার শাহ খুব দুঃখ পেলেন। তিনি আল্লাহর দরবারে আবার হাত উঠালেন। কিছু ক্ষণের মধ্যে যুবক ডাকাতটির মাথা হাত ও পা সিংহের আকৃতি হয়ে গেল। বাকি অংশ মানুষের মতই রয়ে গেল। পরে যুবকটি সিংহের দলে মিশে যায়। ডাকাত দল এ দৃশ্য দেখতে পেয়ে জঙ্গল থেকে পালিয়ে যায়।
কিছুদিন পর কেদার শাহ ইসলাম প্রচারের জন্য অন্যত্র চলে যান। তারপর সিংহের পাল জঙ্গল ছেড়ে চলে যায়। কিন্তু মানুষ রূপী সিংহটি ঐ জঙ্গলে থেকে যায়। এ ঘটনার কিছু কাল পরে লোকজন বন জঙ্গল কেটে বসতি স্থাপন শুরু করে। একদিন একদল লোক জঙ্গল কাটতে এসে মানুষরূপী সিংহ দেখতে পায়। এই খবর চারি দিকে ছড়িয়ে পড়ে। তখন দলে দলে লোক ছুটে এসে জঙ্গলটি ঘিরে ফেলে। তারপর মানুষরূপি সিংহটা লোকজন হত্যা না করে আহত অবস্থায় খাঁচার মধ্যে কৌশলে আবদ্ধ করে। মানুষরূপী সিংহকে খাঁচায় বন্দি করে নিয়ে আশা হলো লোকালয়ে। খবর হয়ে গেল চারি দিকে। মানুষরূপি সিংহ ধরা পড়েছে। নরসিংহ দেখার জন্য দলে দলে লোক ছুটে আসতে লাগল। কিন্তু মানুষরূপী সিংহটি মানুষের মাঝে এসে চুপচাপ খাঁচার মধ্যে পড়েছিল। আর নিরবে অশ্রু বিসর্জন করছিল। কয়েকদিন পরে খাঁচার মধ্যে মানুষরূপী সিংহটি মারা যায়।
মরা সিংহটি কয়েকদিন যাবত রাখা হয়েছিল। কিন্তু যখন সিংহের লাশ থেকে গন্ধ বের হতে লাগল। তখন লোকে নদীর কিনারে পানির কাছে ফেলে রাখে। সিংহের লাশ নদীর পানির ছোয়া লাগার সাথে সাথে এক মরা যুবকের লাশে পরিণত হয়। এ লাশটি নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয় বলে শোনা যায়। মানুষরূপী সিংহটি মারা যাবার পরও লোকে আজকের নরসিংহাটি এলাকার মানুষের কাছে আসত এই কাহিনী শোনার জন্য। তখন লোকে ঐ এলাকার নাম দেয় নরসিংহ। কিন্তু দিন দিন মানুষ আসার চাপ বাড়তেই থাকে। তার ফলেই দোকান পাট গড়ে ওঠে। পরে একটা হাটে পরিণত হয়। তখন লোকে এ হাটের নাম দেয় নরসিংহহাটি। পরে নরসিংহহাটি থেকে নরসিংহাটি হয়। পরে এ হাটের বিলুপ্তি ঘটে।
লোক মুখে শোনা যায় যেখানে মানুষরূপী সিংহটি মারা যায় সেখান দিয়ে মানুষ গভীর রাতে যাতায়াত করার সময় কেউ কেউ নাকি সিংহটিকে এককালে দেখতে পেত। আবার চোখ অন্য দিকে ঘুরাতেই অদৃশ্য হয়ে যেত। এককালে এ সিংহের ভয়ে লোকে গভীর রাতে নরসিংহাটি দিয়ে চলতে ভয় পেত। আজও নরসিংহাটি গ্রামের অনেক বৃদ্ধ বিধাকে তাদের নাতি নাতিনকে রাতে নরসিংহ আসছে বলে ভয় দেখিয়ে ঘুম পাড়ায়। বর্তমানে নরসিংহাটি গ্রামের পাশে কাটাখালী নামে বিরাট হাট বসে প্রতি বুধবারে। এই হাট এলাকায় নাকি নরসিংহ মারা গিয়েছিল। নরসিংহ নিয়ে মানুষের গান রচনা করেছিল। তবে সে গান আজ আর কারও কন্ঠে শুনা যায় না। অনেক অনুসন্ধান করেও সে গানের কথা খুঁজে পায়নি। সম্ভবত কালের অকালে হারিয়ে গেছে নরসিংহকে নিয়ে লোক কবির রচিত গান।


