কামারুজ্জামানের ফাঁসি। কি ঘটেছিল সেই দিন সোহাগপুরে?

মাগুরানিউজ.কমঃ 

10987475_356346777888520_8130170171431719745_n

শেরপুর জেলা শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে নালিতাবাড়ি উপজেলার কাকরকান্দি ইউনিয়নের সোহাগপুর গ্রাম। ১৯৭১ সালের ২৫ জুলাই দিনটি সোহাগপুরের মানুষের জন্য ছিল না কোন স্বাভাবিক দিন। ৪৪ বছর আগে পাখির মতো নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয় ১শ ৮৭ জন নিরীহ মানুষকে। পুরুষ শূন্য হয়ে পড়ে গ্রামটি। শিশুরাও রেহাই পায়নি এ হত্যাযজ্ঞ থেকে। সেই পুরুষ শূন্য হয়ে পরা গ্রামটি নাম পায় বিধবা পল্লী নামে। সেই সোহাগপুর বিধবা পল্লীতে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে বেঁচে আছেন এখনো ৩৪ জন বিধবা মা। যাদের সাদা শাড়ি এনে দিয়েছে আমাদেরকে সবুজ জমিনের উপর স্বাধীনতার লাল সূর্য।

কি ঘটেছিল সেই দিন সোহাগপুরে?

১৯৭১ সালের ২৫ জুলাই মঙ্গলবার। তখনও পুবাকাশে সূর্য ওঠেনি। কেউ কেউ ঘুম থেকে উঠে সবে লাঙ্গল-জোয়াল নিয়ে তৈরি হচ্ছিলেন মাঠে যাবার জন্য। রাজাকার কামারুজ্জামানের পরিকল্পনা ও পরামর্শে আলবদর, রাজাকারসহ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিশাল একটি দল পুরো সোহাগপুর গ্রামটিকে তিনদিক থেকে ঘিরে ফেলে।সোহাগপুর গ্রামে কোনো মুক্তিযোদ্ধা ছিল না। তবে পার্শ্ববর্তী গ্রাম বারুয়াজানীর ঘরে ঘরে ছিল মুক্তিযোদ্ধা। তাই ওই গ্রামবাসী কখনো ভাবেনি পাকবাহিনী দ্বারা তারা আক্রান্ত হবে। অনেকটা শান্তিতে দিন যাচ্ছিল তাদের। পাক-হায়েনাদের কাছে একটি খবর ছিল মুক্তিযোদ্ধারা কৃষকের ছদ্মবেশে সোহাগপুর গ্রামে আশ্রয় নিয়েছে। এই ভুল সংবাদের ভিত্তিতে গ্রামের নিরীহ মানুষ কিছু বুঝে ওঠার আগেই হায়েনার দল বৃষ্টির মতো নির্বিচারে গুলি ছুঁড়তে থাকে। এখানেই শেষ নয়, বর্বর হানাদার বাহিনীকে দেখে নিরীহ গ্রামবাসী যখন ঘরে এসে আত্মগোপন করে তখন তাদেরকে ঘর থেকে বের করে স্ত্রী-সন্তানদের সামনেই নির্মম নির্যাতন করে হত্যা করে। ওইদিন এভাবে হত্যা করা হয় ১৮৭ জনকে, যার মধ্যে ১২০ জন ছিলেন পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ। পাক হানাদাররা চলে গেলে যারা বেঁচে ছিল তারা এসে প্রিয়জনদের লাশ মশারী, ছেঁড়া শাড়ি, আর কলাপাতা দিয়ে পেঁচিয়ে কোনমতে দাফন করে।

কেমন ছিলেন সেই বিধবারা?

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের বিজয়ের পর সোহাগপুর গ্রামটির আরেক নাম হয়ে যায় বিধবা পল্লী নামে। স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত এই পল্লীর বিধবাদের দিকে সাহায্যের হাত কেউ বাড়িয়ে দেয় নাই। ১৯৯৬ সালে তৎকাালীন কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী সর্বপ্রথম তার নিজ তহবিল থেকে বিধবাদের জন্য সাহায্যের হাত বাড়ান। ব্র্যাকের সহযোগীতায় প্রতিজনকে ২টি করে ছাগল,শাড়ি, চাউল ও ডালসহ ১২শ টাকা করে আমরণ ভাতা প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে জোট সরকার ক্ষমতায় এলে অজ্ঞাত কারনে এসব সুযোগ সুবিধা বন্ধ হয়ে যায় বিধবাদের। এর মাঝে কেটে যায় আরো কয়েক বছর।

এরপর স্থানীয় সাংবাদিকদের লেখনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বিধবাপল্লী নজরে পড়ে যৌথ বাহিনী ও জেলা প্রশাসনের। যৌথ উদ্যোগে কৃষি সমন্বয়ক পাওয়ারটিলার,মাড়াইকল,­মাশরুম ও বনায়নসহ তিনটি প্রকল্প চালু করা হয়। এরপর সর্বশেষ গত ২০১০ সালের ৪ ডিসেম্বর বিধবাপল্লীতে স্থানীয় এমপি ও কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরীর সহযোগীতায় মোট ৬১ জন বিধবা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের মাঝে ভাতা প্রদান করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর ড. আতিউর রহমান। এসময় ট্রাস্ট ব্যাংকের সহায়তায় ৩৭ জন বিধবাকে আজীবন ১ হাজার টাকা করে ভাতা এবং বাকী ২৪ জন শহীদ পরিবারকে ৫ বছর পর্যন্ত ১ হাজার টাকা করে মাসিক ভাতা প্রদান করা হয়। একইসাথে ৬১ জন বিধবা ও শহীদ পরিবার সদস্যদের মাঝে এককালীন আরো ৭ হাজার টাকা এবং প্রত্যেককে একটি করে শীতের চাদর ও সোলার চার্জার বাতি দেয়া হয়।

কামরুজ্জামানের ফাঁসির রায়ের আপিল রিভিউর পর সোহাগপুর:

আপিল রিভিউতে ফাঁসির আদেশ বহাল থাকায় তৃপ্তির উচ্ছ্বাসে ভাসছে সীমান্তবর্তী নালিতাবাড়ী উপজেলার সোহাগপুর বিধবা পল্লী। ৭১ সালের ২৫ শে জুলায়ের সেই দিনের কথা স্মরণ করে হাসিনা বেওয়া, রিতন বেওয়া ও দিলমনি রাকসাম সোমবার বিকেলে বলেন, ৪৩ বছর ধরে কাঁদতে কাঁদতে তাঁদের চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। পাক বাহিনী ও আলবদর-রাজাকাদের সোহাগপুরে নৃশংসতা ও তাদের স্বামী সন্তানদের হত্যার নায়ক কামারুজ্জামানের ফাঁসির আদেশ বহাল হোক-এমনটাই ছিল প্রাণের দাবি। এখন তা পূরণ হওয়ায় তাঁরা বেজায় খুশি।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

June ২০২৬
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
« May    
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০  

ফেসবুকে আমরা

বিভাগ

দিনপঞ্জিকা

June ২০২৬
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
« May    
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০  
%d bloggers like this: