মাগুরানিউজ.কমঃ
মাগুরা জেলা শহর থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরে মধুমতি-নবগঙ্গা নদী তীরের জনপদ মহম্মদপুর।
এই মহম্মদপুর ছিল একটি রাজ্যের রাজধানী। রাজ্যের নাম ছিল ভূষণা (বর্তমান ফরিদপুর-মাগুরা)। এ রাজ্যের রাজা ছিলেন সীতারাম রায়।
মোঘলদের বিরুদ্ধে রাজা সীতারামের বীরত্বের ইতিহাস আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। রাজা সীতারাম ছিলেন মুর্শিদাবাদের নবাব সরকারের একজন আমলা। যিনি আমলা থেকে জমিদারি এবং পরে স্বীয় প্রতিভা বলে রাজা উপাধি লাভ করেন।
রাজা উপাধি লাভের পর সীতারাম রাজার মতোই রাজ্য বিস্তার করতে থাকেন এবং সেনাবল বৃদ্ধি করে তিনি পার্শ্ববর্তী জমিদারদের ভূ-সম্পত্তি দখল করেন। তিনি নবাব সরকারের রাজস্ব প্রদান বন্ধ করে স্বাধীন, সার্বভৌম রাজার মতোই জমিদারিতে প্রত্যাবর্তন করেন নিজস্ব শাসনব্যবস্থা।
জমিদারি সুরক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে সীতারাম এ স্থানটিতে গড়ে তোলেন অসংখ্য দুর্ভেদ্য দুর্গ, কাঁচারি বাড়ি পরিখা পরিবেষ্টিত রাজপ্রাসাদ, পূজা-অর্চনার জন্য দেবালয় নির্মাণ, জনহিতার্থে খনন করেন বেশ কিছু বিশালাকার জলাশয়।
মহম্মদপুরে রাজা সীতারাম রায় নির্মীত অসংখ্য নান্দনিক কারুকার্য খচিত স্থাপনা রয়েছে। এসব প্রত্নস্থান যা স্থানীয়ভাবে রাজবাড়ী নামে পরিচিত। যা সপ্তদশ-অষ্টদশ শতাব্দীতে পত্তন হওয়া উন্নত এক জনপদের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে আজও দেদীপ্যমান।
রাজা নেই, রাজ্য নেই, নেই পাইক-পেয়াদা। হাতিশালে হাতি নেই কিংবা ঘোড়াশালে ঘোড়া। তবু কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কয়েকটি স্থাপনা। প্রত্নতাত্বিক এসব স্থাপনা সময়মতো সংক্ষণের উদ্যোগ না নেওয়ায় আজ ধ্বংশের দ্বারপ্রান্তে।
রাজপ্রাসাদের মূল্যবান জিনিসপত্র টেরাকোটা খুলে বিক্রি করে দিয়েছে এক শ্রেণীর অসাধু লোকজন। সীতারামের বিশাল সম্পত্তির বড় অংশ এখন ভূমি খেকোদের দখলে।
আশার কথা, সরকার দেরিতে হলেও সীতারামের স্থাপনাগুলো সংস্কার ও অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ শুরু করেছে। দূর থেকে প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থীরা নান্দনিক স্থাপনাগুলো দেখতে আসেন। এলাকাবাসীর দাবি, সীতারাম রাজার স্থাপনাগুলো সংস্কার করলে এটি অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র হতে পারে।
আনন্দনাথ রায় লিখিত ফরিদপুরের ইতিহাস ও উইকিপিডিয়া থেকে জানা যায়, মুকুন্দরাম-সত্রাজিতের পতনের পর ভূষনা রাজ্যে দেখা দেয় ভীষণ বিশৃঙ্খলা। মগ দস্যুদের অত্যাচারে রাজ্য হয়ে পড়ে জনশূণ্য, এবং এক পর্যায়ে জঙ্গলাকীর্ণ প্রায়।
ঠিক ওই সময়েই আবির্ভাব ঘটে রাজা সীতারামের [১৬৫৮-১৭১৪]। তিনি মগ দস্যু বিতাড়ণে আর দেশের স্বাধীনতা সুরক্ষায় অসাধারণ ভূমিকা রেখেছেন।
সীতারামের নির্মাণ করা দূর্গসহ নানান কীর্তির ধংসস্তুপ আজো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ভূষণা রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে তৎকালীন ভূষণা রাজ্যের রাজধানী বর্তমান মাগুরার মহম্মদপুরে।
সীতারামের পিতা উদয় নারায়ণ ছিলেন ভূষনা রাজ্যের ফৌজদারের অধীনে সামান্য এক সাজোয়াল। তার মাতার নাম ছিল দয়াময়ী।
ভূষনার পার্শ্ববতী গোপালপুর গ্রামে বসবাস করতেন তারা। ১৬৬০ সালে মীর জুমলা যখন বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় নিয়ে আসেন, তখন সীতারামের বাবা উদয়নারায়ণও সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন।
১৬৬৪ সালে শায়েস্তা খান বাংলার গভর্নর হন। এসময় উদয়নারায়ণ তার অধীন মোঘল সৈন্যবাহিনীতে তহসিলদার পদে উন্নীত হন এবং ভূষণায় স্থানান্তরিত হন। কয়েক বছর পর কাছেই মধুমতি নদীর তীরের হরিহরনগরে নিজ আবাস গড়ে পরিবারকে সেখানে নিয়ে আসেন উদয়নারায়াণ।
সুবা বাংলার রাজধানী ঢাকায় বেশ আসা-যাওয়া ছিল তরুণ সীতারামের। ওই সময়ে কুখ্যাত দস্যু বক্তার খাঁকে পরাজিত করে বিশেষ সুনাম অর্জন করেন তিনি।
এতে করে ওই সময়ে গজিয়ে ওঠা ছোটখাট দস্যুরা সীতারামের ভয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। এসব খবর শুনে খুশী হন তৎকালীন বাংলার নবাব শায়েস্তা খাঁ।
সে সময় করিম খাঁ নামে এক পাঠান বিদ্রোহীর অত্যাচারে সাতৈর পরগণায় চরম অরাজকতা দেখা দেয়। বিষয়টা সুবাদারের জন্য বড় চিন্তার কারণ হয়ে দেখা দেয়।
শায়েস্তা খাঁ সীতারামকে কয়েক হাজার পদাতিক আর অশ্বারোহী সৈন্য দিয়ে পাঠালেন করিম খাঁর বিরুদ্ধে। সীতারামের বীরত্বে করিম খাঁর বাহিনী নাস্তানাবুদ হয় এবং করিম খাঁ নিহত হন।
এ সাফল্যে শায়েস্তা খাঁ সন্তুষ্ট হয়ে সীতারামকে নলদী পরগণার জায়গীর দিয়ে সম্মানিত করেন। এই একটি পরগণার কর্তৃত্ব থেকে একসময় আশপাশের ৪৪টি পরগণা নিজের আওতায় নিয়ে আসেন তিনি।
এর আগে নলদী পরগণার জায়গীরদার হওয়ার পর থেকেই সীতারাম শুরু করেন নিজের একটি শক্তিশালী বাহিনী গড়ার কাজ।
১৬৮৪ সালে পিতা-মাতার মৃত্যুর পরগয়ায় তীর্থযাত্রা করেন। ১৬৮৮ সালে দিল্লিতে মোঘল দরবারে হাজির হন।
শায়েস্তা খাঁর সুপারিশ আর মোঘল দরবারে গিয়ে সাক্ষাতের ফলে মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব সীতারামকে ‘রাজা’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এছাড়া তাকে সুন্দরবন পর্যন্ত দক্ষিণবঙ্গ এলাকার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
চারণ কবিরা এসময় সীতারামকে নিয়ে গান বাঁধেন, ‘ধণ্য রাজা সীতারাম, বাংলা বাহাদুর/ যার বলেতে চুরি-ডাকাতি হয়ে গেল দূর/ বাঘ-মানুষে একই সাথে সুখে জল খায়/ রামীশ্যামী পুটলি বাঁধি গঙ্গাস্নানে যায়।’
রাজা উপাধি এবং রাজ্যের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও সীতারামের কোনও রাজধানী ছিল না। জনশ্রুতি থেকে জানা যায়, রাজধানীর জন্য সীতারাম খুঁজে বের করলেন খাল-বিল আর জলাভূমি বেষ্টিত একটি জঙ্গলাকীর্ণ এলাকা, যা ছিল তৎকালীন সিদ্ধ পুরুষ দরবেশ মহম্মদ খাঁর এলাকা। তার নামানুসারে ওই এলাকাটি পরে মহম্মদপুর হিসেবে পরিচিতি পায়।
দরবেশ সাহেবের কাছ থেকে রাজা সীতারাম ওই স্থানটি চেয়ে নিলেন। গড়লেন বিশাল দূর্গ যা ছিল দুই মাইল বিস্তৃত পরিখা দ্বারা পরিবেষ্টিত। রাজা দূর্গের চারপাশে ও ভেতরে খনন করলেন বেশ ক’টি দিঘি, এগুলোর মধ্যে উল্লেযোগ্য হল- রামসাগর, সুখসাগর ও কৃষ্ণসাগর।
দূর্গের প্রবেশদ্বারের সামনেই ছিল রামসাগর, এসব জলাশয় পেরিয়ে শত্রুপক্ষের দূর্গে প্রবেশ ছিল প্রায় অসম্ভব।
রাজা সীতারাম তার দূর্গ ছাড়াও রাজ্যজুড়ে অনেকগুলো দিঘি খনন করেছিলেন। এসব দিঘির কয়েকটিকে ঘিরে তার সৈন্যদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালিত হত। এক্ষেত্রে সীতারামের কৌশলটি ছিল অসাধারণ।
প্রকাশ্যে সৈন্য সংগ্রহ করলে নবাবের সন্দেহ হতে পারে, এজন্য পুকুর খননের নামে চলত মজুর সংগ্রহ। পরে এদের মধ্য থেকে সৈন্য হিসেবে উপযুক্তদের বাছাই করা হতো। দিনে চলতো দিঘি খনন, রাতে তাদের সামরিক প্রশিক্ষণ।
রাজা সীতারাম এসময় ঢাকার জনার্দণ [যিনি নবাবের কামান তৈরি করতেন] কামারের জ্ঞাতিগোষ্ঠীকে নিয়ে আসেন মহম্মদপুরে। তাদের দিয়ে তৈরি করালেন বড় বড় কামান। সীতারামের রাজ্যের বিস্তৃতি ভাটি অঞ্চল জুড়ে অর্থাৎ উত্তরে পদ্মার পাড় থেকে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর (বর্তমান সুন্দরবন তথা বাগেরহাট জেলা) পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
সকল প্রস্তুতি শেষে এক সময় রাজা সীতারাম নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর ফৌজদার তরফ খাঁকে জানিয়ে দিলেন যে দিল্লীর বাদশা বা নবাবকে তিনি আর খাজনা দেবেন না। শুধু তাই নয়, মোঘলদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের জের ধরে একসময় সীতারামের নির্ভরযোগ্য সেনাপতির হাতে নিহত হন ফৌজদার তোরাব খাঁ।
এসময় মুর্শিদ কুলি খাঁ তার ভগ্নিপতি বক্স আলী খাঁকে তোরাব খাঁর শূন্য পদে স্থলাভিষিক্ত করেন।
কথিত আছে, রাজা সীতারামকে বন্দি করে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রেরণ করা হয় মোঘল অশ্বারোহী বাহিনীর সেনাপতি পীর খানকে। এদিকে সীতারামের সৈন্যরা পীর খান মনে করে হত্যা করে সম্রাটের নিকটাত্মীয়কে।
এ ঘটনায় ক্ষিপ্ত নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ আরো সৈন্য প্রেরণ করেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সীতারামের শত্রু ভুষণার পার্শবর্তী জমিদাররাও।
সুবা বাংলার মোঘল সেনাপতি সংগ্রাম সিং ও বক্স আলী খান বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে পদ্মার তীর ফরিদপুরের কাছে ভূষণার যুদ্ধে পরাজিত হন সীতারামের কাছে।
এরপর মোঘল বাহিনী ভূষণায় সীতারামের দূর্গ অবরোধ করে।
নাটোর রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা রঘুনন্দনের সেনাপতি দয়ারাম রায়ও সৈন্য সামন্ত নিয়ে এ যুদ্ধে মোঘলদের পক্ষে অংশ নেন। সম্মুখ সমরে মেনা হাতিকে হারানো প্রায় অসম্ভব- একথা মাথায় রেখে এসময়ে দয়ারাম কূট-কৌশলের আশ্রয় নেন।
তার প্ররোচনায় এক অন্তর্ঘাতমূলক ঘটনায় সীতারামের সেনাধ্যক্ষ মেনা হাতি নিজের লোকের হাতে নিহত হন। দয়ারাম তার কর্তিত মস্তক মুর্শিদাবাদে পাঠান।
মেনা হাতির মৃত্যুর ফলে শক্তিশালী মহম্মদপুর দুর্গ প্রায় মোঘলদের হাতে চলে আসে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ভূষণা ছেড়ে সীতারাম মহম্মদপুরের দিকে অগ্রসর হন। সীতারাম দূর্গ থেকে নিজের পরিবারসহ বেসামরিক নাগরিকদেরকে নিরাপদে সরিয়ে নেন।
একের পর এক যুদ্ধে মোঘল আর স্থানীয় প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে লড়তে লড়তে এবং নির্ভরযোগ্য লোকদের হারিয়ে ক্রমশ দুর্বল হয়ে এসেছিলেন সীতারাম। এরই ধারাবহিকতায় প্রচন্ড যুদ্ধের একপর্যায়ে মহম্মদপুর দুর্গের পতন হয়।
রাজা সীতারাম সপরিবারে বন্দি হন। দয়ারাম তাকে শিকলবন্দি করে মুর্শিদাবাদে নিয়ে যান। সেখানে ১৭১৪ সালে মুর্শীদ কুলী তাকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করেন। মাত্র ৫৬ বছর বয়সে এ বীরের জীবনাবসান ঘটে।
যুগে যুগে স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় আরো এক ‘চির উন্নত শির’ রাজা সীতারাম ইতিহাসের গৌরবজনক স্থানে নিজের নামকে এভাবে অমর করে রাখলেন।



