জীবনমুখী রায় ।। আলোচিত মাগুরার মূখ্য বিচারিক হাকিম

মাগুরানিউজ.কমঃ 

এ্যাড. রাজীব মিত্র জয় –

সদাচরণের জন্য সহায়ক এক অভিনব রায় দিয়েছেন মাগুরার মূখ্য বিচারিক আদালতের হাকিম।পারিবারিক বিরোধের জের ধরে সৃষ্ট সহিংসতার একটি মামলার রায়ে ইব্রাহিম হোসেন (২০) নামে এক যুবককে বই পড়া, গাছ লাগানোসহ সদাচরণের জন্য সহায়ক ব্যতিক্রমী এ রায় দিয়েছেন আদালত। অভিযুক্ত আসামিকে এজন্য যেতে হবে না কারাগারের চার দেয়ালের ভেতর, সাজা খাটবেন তিনি নিজের বাড়িতেই। এজন্য মানতে হবে বিশেষ কয়েকটি শর্ত।

মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারী) বিকালে মাগুরার মূখ্য বিচারিক আদালতের হাকিম মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান চাঞ্চল্যকর এই রায়টি দিয়ে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে প্রবেশন অফিসার মেহেতাজ আরা সালমার হাতে তুলে দেন।

দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ইব্রাহিম মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার হরেকৃষ্ণপুর গ্রামের মৃত হান্নান মোল্যার ছেলে। সে মহম্মদপুর আদর্শ টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সৈয়দ আমীর আলী জানান, ২০১৭ সালে ১৫ সেপ্টেম্বর একটি পারিবারিক বিরোধের জের ধরে হরেকৃষ্ণপুর গ্রামে সায়লা আক্তার নামে এক নারী আহত হন। এ ঘটনায় সায়লার ছেলে মোহাম্মদ রকি মহম্মদপুর থানায় একই গ্রামের ইব্রাহিম, কামাল ও চায়না বেগমকে আসামি করে মামলা করেন। ওই মামলার সাক্ষ্য প্রমাণাদিতে চায়না বেগম নির্দোষ প্রমানিত হন। মামলার তদন্তকালে অপর আসামি কামাল হোসেন একই কারণে চার্জশিট থেকে অব্যহতি পান। অন্যদিকে ৬ মাসের কারাদণ্ড ভোগের পরিবর্তে সংশোধনের জন্য ইব্রাহিমকে দন্ডবিধির ৩২৪ ধারার পরিবর্তে প্রবেশন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে ১ বছর সময়কালের জন্য ৭টি শর্তে প্রবেশন মঞ্জুর করেন হাকিম জিয়াউর রহমান।

এই প্রবেশনকালীন সময়ে বিচারক ইব্রাহিমকে যে ৭টি শর্ত পূরণের শর্ত দিয়েছেন সেগুলো হলো- প্রবেশনকালীন সময় দোষী সাব্যস্ত আসামি কোনরূপ অপরাধের সঙ্গে জড়িত হবেন না বা একই ধরণের অপরাধ আর করবেন না, শান্তি বজায় রাখবেন এবং ভাল ব্যবহার করবেন, আদালত এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তলব করলে যথাসময়ে উপস্থিত হবেন, কোনরূপ মাদক বা নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন করবেন না, কোন খারাপ সঙ্গীর সঙ্গে আর মিশবেন না, প্রবেশনকালীন সময়ে আসামি মহান মুক্তিযুদ্ধের ওপর ২টি বই জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলো ও রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের লেখা একাত্তরের চিঠিসহ ইসলাম ও নৈতিকতার ওপর আরো ২টি বই পড়বেন এবং আগুনের পরশমনি সিনেমা দেখবেন, প্রবেশনকালীন সময় আসামি পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল হিসাবে ২টি বনজ ও ৩টি ফলজ গাছ লাগাবেন।

আইনজীবী সৈয়দ আমীর আলী আরও জানান, সাজাপ্রাপ্ত ইব্রাহিম কোন শর্ত ভঙ্গ করলে বা তার আচরণ সন্তোষজনক না হলে তার প্রবেশন আদেশ বাতিল করা হবে এবং অপরাধের জন্য নির্ধারিত দণ্ডাদেশ ৬ মাসের কারাদণ্ড ভোগ করবেন। প্রবেশনার কর্মকর্তা প্রতি তিনমাস অন্তর শর্ত প্রতিপালন ও অগ্রগতি সম্পর্কে রিপোর্ট দাখিল করবেন।

অভিনব হলেও এমন রায় আইনসম্মত, বলছেন আইনজীবীরা। তারা বলছেন, এমন রায়ের মাধ্যমে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি কারাগারে গিয়ে অপরাধীদের সংস্পর্শ থেকে দূরে থেকে আদালতের দেওয়া শর্ত মেনে নিজেকে সংশোধন করে নিতে পারবেন।

এ রায়টিকে জীবনমুখী রায় বলে আখ্যায়িত করেছেন বিশিষ্টজনেরা। আদালত কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে জেলখানার অপরাধীদের সংস্পর্শ থেকে বাঁচিয়েছেন। জীবনের স্রোতে ফিরে যেতে সহযোগীতা করেছেন।

মাগুরা জেলা আইনজীবী সমিতির সিনিয়র সদস্যরা এ রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলেন, মূখ্য বিচারিক আদালতের হাকিম মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান এ রায়ের মধ্যদিয়ে শুধু প্রবেশন সংক্রান্ত হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুসরণ করেননি, তিনি কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে জেলখানার অপরাধীদের সংস্পর্শ থেকে বাঁচিয়েছেন।

এই মামলার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রবেশন অফিসার মেহেতাজ আরা সালমা বলেন, ছেলেটির বয়স অল্প। পড়াশোনা করছে। আশা করছি বিচারকের আরোপিত সব শর্তই ছেলেটি পালন করবে। আমি নিজেও তাকে সেই সহায়তা দেব।

রায়ের প্রতি মামলার আসামি পক্ষের আইনজীবী আবদুল মান্নানও সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, এই রায়ের মাধ্যমে ছেলেটি নিজেকে সংশোধনের পাশাপাশি চরিত্র গঠনের সুযোগ পাবে। কিন্তু কারাগারে পাঠানো হলে সংশোধন হওয়ার পরিবর্তে অভ্যাসগত অপরাধীদের সঙ্গে মিশে পুরাদস্তুর অপরাধী হওয়ার আশঙ্কা থাকত।

উল্লেখ্য, গত বছরের ১০ এপ্রিল সুনামগঞ্জ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের এক রায়ে ১ বছরের কারাদণ্ডাদেশ পাওয়া এক আসামিকে কারাগারের বদলে বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে থাকার সাজা দেওয়া হয়েছিল। ২০১৮ সালে বিভিন্ন মামলায় কারাদণ্ডাদেশ পাওয়া ১২ আসামিকে কারাগারের বদলে বাড়িতে থেকে সংশোধন হওয়ার সুযোগ দেন রাজশাহীর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা –

প্রয়োগের নজির তেমন না থাকলেও প্রবেশন অর্ডিন্যান্স আগে থেকেই আছে। সুপ্রিম কোর্টের জে-০১/২০১৯ নম্বর সার্কুলারে বর্ণিত নির্দেশনা অনুসরণ করেই এই আদেশ দেওয়া হয়েছে। গত বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট আইনটি কার্যকর করতে সারাদেশের বিচারকদের নির্দেশনা দিয়ে একটি পরিপত্র জারি করেন। পরিপত্রে বলা হয়, প্রবেশন মঞ্জুর করার সময় সংশ্লিষ্ট বিচারক বা ম্যাজিস্ট্রেটকে আদালতে প্রবেশন কর্মকর্তার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। সে ক্ষেত্রে এই আইন অনুযায়ী কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করা না হলে আদালত তার যৌক্তিক কারণ লিখিত আকারে রাখবেন।

লেখক- সম্পাদক, মাগুরা নিউজ।

April ২০২৬
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
« Mar    
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০  

ফেসবুকে আমরা

বিভাগ

দিনপঞ্জিকা

April ২০২৬
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
« Mar    
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০  
%d bloggers like this: