মাগুরানিউজ.কমঃ

বিশেষ প্রতিবেদক-
দেশের দুই শীর্ষ দৈনিকে প্রকাশিত দুটি সংবাদ প্রতিবেদন আজ দিনভর মাগুরা শহরে আলোচিত প্রধান দুটি বিষয়। অনলাইনের কল্যানে ব্যাপকতাও বেড়েছে বিস্তর। মাগুরায় শতাধিক ‘অবৈধ’ ইটভাটা ও ‘মাগুরায় গায়েবি’ প্রকল্প শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন দুটি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়গুলি নিয়ে কতৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষনের পাশাপাশি বস্তনিষ্ঠ উপস্থাপনের জন্য দৈনিক কালের কন্ঠের শামীম খান ও সমকালের অলোক বোসকে সাধুবাদ জানিয়েছেন বিশিষ্ঠজনেরা।
প্রকাশিত প্রতিবেদন দুটি অনলাইন অবলম্বনে মাগুরা নিউজের পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো।
মাগুরায় ‘গায়েবি’ প্রকল্প
সরকারের দুই কোটি টাকা জলে
শামীম খান, মাগুরা –
মাগুরায় সাত গ্রামে পুকুর খনন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কাজ শেষের আগেই বরাদ্দের অর্ধেক টাকা তুলে নিয়েছেন ঠিকাদার। পুকুরের চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া, ফুটপাত ও প্রবেশদ্বার তৈরির কথা থাকলেও তা ঠিকমতো করা হয়নি। তা ছাড়া যেসব এলাকায় সুপেয় পানির অভাব, শুধু সেসব এলাকায়ই এ ধরনের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়ে থাকে। কিন্তু মাগুরায় পর্যাপ্ত নলকূপ রয়েছে। তার পরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এমন প্রকল্প বাগিয়ে নিয়ে সরকারের দুই কোটি ২০ লাখ টাকা নষ্ট করেছেন।
জানা গেছে, স্থানীয় জনস্বাস্থ্য ও প্রকৌশল অধিদপ্তর কর্তৃক জেলার সাত গ্রামে সাতটি পুকুর খনন প্রকল্প হিসাবে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দুই কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে খনন কার্যক্রম শুরু হয়, যা চলতি বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা।
স্থানীয় জনস্বাস্থ্য ও প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাগুরা দপ্তর থেকে জানা যায়, এলাকায় সুপেয় পানি সরবরাহই এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। পাশাপাশি রয়েছে পুকুরের গভীরে পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে পানির স্তর ঠিক রাখা এবং ভূগর্ভস্থ পানির চাপ কমাতে উপরিভাগের পানি ব্যবহারে এলাকার মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা। প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি পুকুরের পানির গভীরতা হবে পাঁচ মিটার থেকে ৭ দশমিক ৫ মিটার। চারপাশে কাঁটাতারের বেড়ার পাশাপাশি পুকুরের অপব্যবহার রোধে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত করতে থাকবে একটি ফটক। চারপাশে থাকবে হেঁটে চলার ইটের রাস্তা। থাকবে পুকুরপার রক্ষার জন্য বেষ্টনী। পুকুরের আকার সর্বনিম্ন এক হাজার ৫০০ বর্গমিটার থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার বর্গমিটার হতে হবে।
প্রকল্পের আওতায় থাকা পুকুরগুলো হচ্ছে মাগুরা সদরের বনগ্রাম, জাগলা, শিবরামপুর, রায়গ্রাম পুকুর, শ্রীপুরের খামারপাড়া, কল্যাণপুর ও রাজাপুর পুকুর। এসব পুকুর কার্যত জেলা পরিষদের। এ কারণে গোটা কার্যক্রম তদারকি করার জন্য পুকুর এলাকায় জেলা পরিষদের স্থানীয় সদস্যসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিদের দিয়ে একটি তদারকি কমিটি করা হয়েছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, যেসব জেলায় স্যালাইন তথা লবণাক্ত পানির আধিক্য রয়েছে, সেসব এলাকায় এ প্রকল্পের কাজ হওয়ার কথা। সে হিসাবে বাগেরহাটে এ ধরনের পুকুরের সংখ্যা ১৬৫। মাগুরায় স্যালাইন ওয়াটারের আধিক্য নেই। এখানকার মানুষ নলকূপের মাধ্যমে সুপেয় পানি পানে অভ্যস্ত। এ কারণে তারা এই পুকুরের পানি পান করবে—এমন সম্ভাবনা একেবারেই নেই।
সরেজমিন তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, মাগুরায় পর্যাপ্ত নলকূপ থাকায় খনন করা পুকুরের প্রকৃত লক্ষ্য বুঝতে পারছে না স্থানীয় লোকজন। ফলে এসব পুকুরে মাছ চাষের পাশাপাশি গোসলসহ অন্য ব্যাবহারিক কাজ সারছে তারা। অথচ এসব পুকুরে মাছ চাষ কিংবা অন্য ব্যাবহারিক কাজ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, মাগুরা সদরের শিবরামপুরের পুকুরটির খননকাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। সেই পুকুরে পলাশ নামের স্থানীয় এক যুবক মাছের পোনা অবমুক্ত করেছেন। একই চিত্র দেখা গেছে রাজাপুর, কল্যাণপুর, খামারপাড়া পুকুরেও। শ্রীপুরে রাজাপুরের পুকুরে মাছ চাষ করছেন মোজাহার আলী নামের এক ব্যক্তি। একই উপজেলার কল্যাণপুর পুকুরে মাছ চাষ করছেন সাহেব আলী।
রাজাপুরের সচেতন ব্যক্তি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অনেকেই পুকুরে ময়লা-আবর্জনা ফেলছে। মাছের খাবার দিয়ে বিষাক্ত করছে পানি। আমরা কোনো দিনই পুকুরের পানি পান করি না।’
সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স জাকাউল্লাহ অ্যান্ড বিল্ডার্সের তত্ত্বাবধায়ক আসিফ আল আসাদ বলেন, ‘কাজেই কোনো অনিয়ম হয়নি।’ মাগুরা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পংকজ কুমার কুণ্ডু বলেন, ‘ঠিকাদারি জবাবদিহির ক্ষেত্রে আমাদের কথা বলার সুযোগ কম।’
শ্রীপুর জনস্বাস্থ্য ও প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী আবুল হাসনাত কাজল বলেন, ‘সাতটি পুকুরের মধ্যে শ্রীপুরের তিনটির কাজ ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ হয়েছে। সদরের চারটি পুকুরের কাজ গড়ে ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ইতিমধ্যেই বরাদ্দের ৫০ শতাংশ টাকা তুলে নিয়েছেন।’
মাগুরায় শতাধিক অবৈধ ইটভাটা
দূষণ বাড়ছে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
অলোক বোস, মাগুরা –
প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্লিপ্ততার কারণে মাগুরায় ফসলি জমি ও আবাসিক এলাকায় একের পর এক গড়ে উঠেছে শতাধিক অবৈধ ইটভাটা। কোনো প্রকার নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে টিনের চিমনি ব্যবহার করে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এসব ইট ভাটায় জ্বালানি হিসেবে প্রকাশ্যে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। অন্যদিকে ইট তৈরির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে ফসলি জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি। অবৈধ এসব ইটভাটার কারণে শুধু পরিবেশের বিপর্যয় ও ফসলের উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে তাই নয়, আবাসিক এলাকায় গড়ে ওঠা ইট ভাটার ধুলোবালিতে শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমাসহ নানা অসুখে আক্রান্ত হচ্ছেন এলাকার সাধারণ মানুষ।
জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী গত বছর জেলার চার উপজেলায় ইটভাটা ছিল ৯৬টি। এ বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৫টিতে। তবে জেলার কোনো ইটভাটারই নেই হালনাগাদ লাইসেন্স। আবার মাত্র দুটি ছাড়া বাকি কোনো ভাটার নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন। জেলার মোট ১০৫টি ভাটার মধ্যে ২৮টিতে জ্বালানি হিসেবে পোড়ানো হচ্ছে কয়লা। বাকি ৭৭টি ভাটায় ইট পুড়ছে সরকার নিষিদ্ধ কাঠ দিয়ে।
কছুন্দি, হুলিনগন, গয়েশপুর এলাকার ভুক্তভোগী বাসিন্দা আমির হোসেন, জবেদা বেগম, রবিউল ইসলাম, বাবলু মিয়াসহ অনেকে জানান, ইটভাটার ধোয়া ও ২৪ ঘণ্টা মাটিটানা ট্রাক চলাচলের কারণে ধুলায় তাদের ক্ষেতের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ধুলাবালিতে বাড়িঘরের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। প্রতিদিন তাদের খাবারের সঙ্গে মিশছে ধুলাবালি। যে কারণে তারা শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমাসহ নানা অসুখে আক্রান্ত হচ্ছেন। স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি তাদের ছেলেমেয়েদের স্কুলে যাওয়া পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে। ইটভাটা মালিকরা প্রভাবশালী হওয়ায় তারা প্রতিবাদ করতে সাহস পান না। ভাটা মালিকরা এ ব্যাপারে কথা বলতে রাজি হননি। এমএমএমবি ব্রিকসের ম্যানেজার মিঠুন চক্রবর্তী বলেন, তারা যা করছেন, তা অনিয়ম। মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য এ কাজ করছেন। প্রশাসন তাদের অবৈধ কাজের জন্য অবশ্য নোটিশ জারি করেছে।
শহরের নান্দুয়ালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপার জেলা সভাপতি এটিএম আনিচুর রহমান বলেন, আবাসিক এলাকা ও ফসলি জমিতে গড়ে ওঠা অবৈধ ইটভাটা মালিকদের বিরুদ্ধে প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
মাগুরা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু তালহা বলেন, ফসলি জমিতে ইটভাটা স্থাপন ও জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কাটার ক্ষেত্রে কৃষি বিভাগের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে এ ধরনের অনিয়ম বন্ধে তাদের কোনো ক্ষমতা নেই। তারা শুধু ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আনেন।
মাগুরায় পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো কার্যালয় নেই। তবে এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক ড. আশরাফুল আলম বলেন, অবৈধ ইটভাটার কার্যক্রম বন্ধে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অবৈধ ইটভাটা বন্ধে জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ধারাবাহিকভাবে মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হচ্ছে।

