সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি মানবিক সমাজ গড়ে তোলার আহবান জানিয়েছেন মাগুরা জেলা আইনগত সহায়তা কমিটির চেয়ারম্যান, বিজ্ঞ জেলা দায়রা জজ শেখ মফিজুর রহমান। শনিবার মাগুরা সদর উপজেলার রাঘবদাইড় ইউনিয়নে অনুষ্ঠিত লিগ্যাল এইড বিষয়ক কর্মশালায় এ আহবান জানান তিনি।
শেখ মফিজুর রহমান বলেন, আত্মকেন্দ্রিক সুখ–ভোগ, আনন্দ–উল্লাস প্রকৃত সুখ বা আনন্দ নয়। প্রকৃত সুখ হচ্ছে সবাইকে সুখী করার অদম্য প্রচেষ্টা। একজনের সাফল্য প্রকৃত সাফল্য নয়। সবার মিলিত সাফল্যই প্রকৃত সাফল্য। শুধু নিজের মধ্যে শিক্ষার আলো, সত্যের আলো, ন্যায়ের আলো জ্বালিয়ে রাখলে হবে না। তাকে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। তাহলেই একটি সমাজ, জাতি ও দেশের মধ্যে ন্যায়, সত্য ও সুন্দর প্রতিষ্ঠা লাভ করবে।
তিনি বলেন, সমষ্টিকে বাদ দিয়ে বেশি দূর যাওয়া যায় না। সবার প্রাণে যদি আলোক শিখা জ্বলে তাহলে সেই আলোয় জগৎ ভরে ওঠবে। দরিদ্র অসহায় মানুষকে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দেয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একটি কল্যানকর রাষ্ট্রে পরিণত হবে। দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে হলেও অবশ্যই আমাদের সকলের উচিত সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে সহায়তা করা। আর এক্ষেত্রে শুধু তথ্য প্রদানের মাধ্যমেই একজন মানুষ বা একটি পরিবারের মুসকিল আসান হতে পারে।
সবাইকে বিজয়ের শুভেচ্ছা জানিয়ে জেলা দায়রা জজ বলেন, আমরা পৃথিবীতে ভাগ্যবান জাতি কেননা নিজের চাইতে দেশের ভাবনা আমাদের কাছে বড় হয়েছিল বলেই আমরা স্বাধীন হতে পেরেছি। “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি”— সোনার বাংলার প্রতি যদি আমাদের সত্যিকার ভালোবাসা থাকে তাহলে হাজারো সমস্যার মাঝেও আমরা সকলে দেশকে নিয়ে, দেশের সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের নিয়ে একটু ভাবতে পারি তাহলে আত্মকেন্দ্রিকতার সমাজ গড়ে না উঠে মুক্ত মানবিক সমাজ গড়ে উঠার পথ পাবে। আসুন আত্মপর না হয়ে পরার্থপর হই—অন্যের মঙ্গল কামনার মধ্যে দিয়ে, বৃহত্তর সংখ্যক মানুষকে ভালো রাখার চেষ্টা করার মধ্য দিয়ে আত্মকেন্দ্রিকতাকে অতিক্রম করি। একটি মানবিক সমাজ গড়ার প্রত্যয় ছড়িয়ে দিই সবার মাঝে।
মাগুরা জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির চলমান কার্যক্রমের অংশ হিসেবে মাগুরা সদর উপজেলার রাঘবদাইড় ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে শনিবার লিগ্যাল এইড বিষয়ক দিনব্যাপী কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাঘবদাইড় ইউপি চেয়ারম্যান আশরাফুল আলম বাবুল ফকির এর সভাপতিত্বে পরিষদ চত্বরে আয়োজিত কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা ও দায়রা জজ এবং লিগ্যাল এইড কমিটির চেয়ারম্যান শেখ মফিজুর রহমান।
বিশেষ অতিথি হিসাবে ব্যক্তব্য রাখেন- মাগুরার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সুনন্দ বাগচি, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ রোস্তম আলী, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ্যাড. আব্দুল মজিদ, পাবলিক প্রসিকিউটর এ্যাড. কামাল হোসেন, জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শামিম খান, ডা. সুব্রত বিশ্বাস, এ্যাড. সমর মজুমদার, সাংবাদিক এম এ হাকিমসহ অন্যরা।
সহকারী জজ জনাব রোমানা রোজী জানান, ‘লিগ্যাল এইড’ কার্যক্রম এখন মাগুরার গণমানুষের সামাজিক আন্দোলনে পরিনত হয়েছে। লিগ্যাল এইড সেবা প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছাড়িয়ে দিতে সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে জেলাজুড়ে বিরামহীন চলছে প্রশিক্ষিত ‘লিগ্যাল এইড’ স্বেচ্ছাকর্মী তৈরীর কার্যক্রম তথা কর্মশালা। চলতি ডিসেম্বর মাস দেওয়ানী আদালতের অবকাশকালীন সময়, তারপরও থেমে নেই মাগুরা জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির কার্যক্রম।
তিনি বলেন, ‘লিগ্যাল এইড মানে শুধু আইনি সহায়তা নয়, এটা একটি অধিকার। প্রতিটি মানুষকে আইনি সহায়তা দিতে সরকার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। গরীব, অসহায় ও নিঃস্ব মানুষ যেন আইনি প্রতিকার পেতে পারে ও আইনজীবী নিয়োগ করতে পারে, মামলা পরিচালনার খরচ নামমাত্র মূল্যে বা বিনামূল্যে পেতে পারে সেজন্যই আইনগত সহায়তা বা লিগ্যাল এইড।
তিনি আরো বলেন, ‘বিরোধ হলে শুধু মামলা নয়, লিগ্যাল এইড অফিসে আপসও হয়’। যদি কোনও ব্যক্তি তার মামলাগুলো আপস মীমাংসার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে চান, তাহলে তিনি জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে শরণাপন্ন হতে পারেন। সেখানে দ্রুত সময়ের মধ্যে তার বিরোধ বা মামলা নিষ্পত্তির জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন দায়িত্বে থাকা বিচারক।’
কর্মশালায় উপস্থিতির অধিকাংশই ছিলেন নারী। অনুষ্ঠানে বিজ্ঞ জেলা ও দায়রা জজ মহোদয়কে কাছ থেকে দেখতে পেরে স্থানীয় জনগণ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন এবং বিজ্ঞ জেলা ও দায়রা জজ মহোদয়কে “ন্যায়বিচারের ফেরিওয়ালা” হিসেবে অভিহিত করেন।
জেলা লিগ্যাল এইড অফিস থেকে প্রাপ্ত তথ্য জানা গেছে, চলমান কার্যক্রমের অংশ হিসাবে ইতিমধ্যে জেলার ৪টি উপজেলা ছাড়াও জানুয়ারী থেকে ডিসেম্বরের ৮ তারিখ পর্যন্ত ২৩টি ইউনিয়নে পর্যায়ক্রমে বিশেষ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিটি কর্মশালায় স্থানীয় ধারনক্ষমতা অনুযায়ী সর্বনিম্ন অংশগ্রহনকারীর সংখ্যা ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ ১০০০ জন।


