মাগুরানিউজ.কম:
মাগুরায় ‘হলুদ বিপ্লব’এখন দেশজুড়ে অনুসরনীয় হয়ে উঠেছে। হলুদের বহুমুখী ব্যবহার ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলো হলুদ প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করায় হলুদের কদর এখন আগের চেয়ে বেশি। এবার মাগুরার হাজার হাজার হলুদ চাষীদের জীবন রঙিন হয়েছে।
এক সময় মাঠ জুড়ে যেসব জমিতে ধান দেখা যেত সেখানে এখন শোভা পাচ্ছে হলুদ। হলুদ চাষের সাফল্যের খবর ছড়িয়ে পড়েছে মাগুরার এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে। মাগুরায় ‘হলুদ বিপ্লব’এখন অনুসরনীয় দেশজুড়ে। উৎপাদন খরচ কম ও লাভজনক হওয়ায় মাগুরায় ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়েছে হলুদ চাষ।
আগে শুধু বসত বাড়ির আশপাশে ছায়াযুক্ত পতিত জমিতে হলুদের চাষ হতো। এখন মাঠ জুড়ে পরিকল্পিতভাবে হলুদের আবাদ হচ্ছে। মাগুরার বিভিন্ন ফসলের মাঠের এ দৃশ্য এখন সবার কাছে অতি পরিচিত।
উৎপাদন খরচ কম ও লাভজনক হওয়ায় ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়েছে হলুদ চাষ। হলুদের ছোয়ায় মাগুরা সদরসহ তিনটি উপজেলার দশ সহস্রাধিক মানুষের জীবন নতুন করে সাজিয়েছে। ‘হলুদ বিপ্লব’ ভাগ্য ফিরিয়েছে এসব অভাবী মানুষের।
মাগুরা কৃষি সম্পসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যমতে, মাগুরা জেলায় এবার ৮৫৫ হেক্টর জমিতে হলুদের আবাদ হয়েছে। এক হাজার ৭১০ মট্রিক টন হলুদ উৎপাদন হবে।
হলুদ চাষীরা মাগুরা নিউজকে জানান, আট থেকে নয় মাস পর হলুদ পাওয়া যায়। অনেকেই আছেন যাদের পতিত জমি আছে কিন্তু চাষ করেননা- এমন জমি একর প্রতি ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকায় লিজ নিয়ে অনেকে হলুদের চাষ করছেন। আবার উৎপাদিত হলুদের তিন ভাগের এক ভাগ জমির মালিককে দিয়েও অনেকে হলুদ চাষ করেছেন।
হলুদ চাষের জন্য প্রথমবার বীজ কিনলেই চলে। পরে নিজের ক্ষেতের বীজ দিয়েই আবাদ করা যায়। হলুদে রোগবালাই নেই বললেই চলে, তাই কীটনাশকের খরচ নেই। গড়ে এক শতক জমিতে হলুদ চাষে খরচ পড়ে ৫০০টাকার মতো। ঐ জমিতে সাড়ে তিন থেকে চার মণ হলুদ পাওয়া যায়। প্রতি মণ হলুদ বিক্রি হয় এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকায়।
এভাবে কৃষকদের শতক প্রতি সাড়ে তিন থেকে সাড়ে চার হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয়। কৃষকেরা জানান, আগে বিক্রির জন্য হলুদ নিয়ে ক্রেতাদের পিছন পিছন ঘুরে বেড়াতে হতো। এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। এখন পাইকাররা বাড়ি বাড়ি এসে হলুদ কিনে নিয়ে যায়।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, মাগুরা জেলা সদর থেকে ছয় কিলোমিটার পূর্বে মহম্মদপুর-মাগুরা সড়কের পাশে ছায়া ঘেরা কয়েকটি গ্রাম। এর একটির নাম পুখরিয়া। এই গ্রাম ইতোমধ্যে হলুদের গ্রাম হিসেবে খ্যাতি পেয়েছে। এই গ্রামের মাঠগুলোয় এখন শুধু হলুদ আর হলুদ। এসব মাঠে কয়েক বছর আগেও সোনালী ধানের শীষ বাতাসে দোল খেত। এখন এখানে ধানের বদলে গাড়ো সবুজ রঙের হলুদ গাছের সমারোহ।
মাগুরারর আলোকদিয়ার পুখরিয়া গ্রামের হলুদ চাষী মুনতাজ মিয়া মাগুরা নিউজকে বলেন, তিনি অনেক বছর ধরে হলুদ চাষ করে আসছেন। আগে চাষ করতেন নিজের সারা বছরের নিজের বাড়ির খাবারের হলুদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য। আর এখন তিনি হলুদ আবাদ করছেন সবচেয়ে লাভজনক ফসল হিসেবে।
এ বছর তিনি পঞ্চাশ শতাংশ জমিতে তিনি হলুদ চাষ করেছেন। এবার হলুদ চাষে সব মিলিয়ে খরচ হয়েছে, ২০ হাজার টাকা। মৌসুম শেষে তিনি এক লাখ টাকার উপরে আয় করবেন বলে আশা করছেন। তার সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেকে হলুদ চাষে এগিয়ে এসেছেন বলে তিনি জানান।
একই গ্রামের হলুদ চাষী সুজন বিশ্বাস মাগুরা নিউজকে জানান, হলুদ বিক্রির লাভের টাকা দিয়ে তার সংসারে স্বচ্ছলতা এসেছে। এ বছর তিনি চল্লিশ হাজার টাকার জমি কিনেছেন বলে জানান।
মহম্মদপুর উপওজেলার নহাটা গ্রামের কৃষক আলী হোনেন মাগুরা নিউজকে বলেন, আগে আমাদের অনেক অভাব ছিল। পতিত জমি পড়ে থাকত। পতিত এসব জমিতে হলুদের আবাদ শুরু হওয়ার তার সংসারে অভাব দূর হয়েছে। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখাতে পারছেন বলে তিনি জানান।
মাগুরার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ পরিচালক পার্থ প্রতিম ঘোষ বলেন, এ এলাকায় প্রায় সব গ্রামে এখন ব্যাপক হারে হলুদের আবাদ হচ্ছে। প্রায় দশ হাজারেরও বেশি কৃষক প্রতি বছর হলুদ চাষে লাভবান হচ্ছেন। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদেরকে সার্বক্ষণিক পরামর্শ দেওয়া হয়।


