নবগঙ্গার জন্য শোকগাঁথা

মাগুরানিউজ.কমঃ

mn-মাজহারুল হক লিপু

মাগুরা শহরের ঠিক মাঝখান দিয়েই চলেছে নবগঙ্গা নদি। আমার বাড়ি থেকে বের হলেই দেখা যায় নদিটাকে। বাবার কাছে শুনেছি একসময় আমাদের এই ঘাটে জাহাজ আসত। নিয়মিত লঞ্চ যাতায়াত করত বিভিন্ন এলাকায়। আমাদের শৈশবে লঞ্চ চলতে দেখিনি ঠিকই তবে শৈশবের স্বর্ণালী দিনগুলি কেঁটেছে এ নদিকে ঘিরে। সম্প্রতি ওপারের মানুষের শহরে আসার সুবিধার্থে একটি সেতু তৈরি করা হচ্ছে নদির উপর। নদি শাসন করে চলছে এর নির্মাণ কাজ। প্রতিদিন দেখছি নির্মাণ কাজ চলছে আর নদিটা যেন কেমন প্রাণহীন হয়ে যাচ্ছে।

আমি নদির দিকে তাকালেই অনিবার্যভাবে আবার শৈশবকে দেখতে প্ইা। সেই কবে এই নদিতে সাঁতার শিখেছিলাম ভালো মনেও নেই আমার। গোসলের জন্য দুপুরে গিয়ে অপেক্ষা করতাম বন্ধুদের জন্য। একে একে আসত সবাই। তারপর দল বেঁধে নদিতে ঝাঁপ দেওয়া। আমাদের মধ্যে যারা একটু বড় তারা সাঁতরে ওপারে চলে যেত। আমরাও বিস্ময়ে অপেক্ষা করতাম কবে নদিটা পার হয়ে ওপারে যাব। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গোসল করতে করতে লাল হয়ে উঠত চোখ। হঠাৎ দেখতাম রক্তচক্ষু নিয়ে উপরে দাঁড়িয়ে আছেন বড় ভাই। মা তাকে পাঠিয়েছেন আমাকে ধরে নিয়ে যেতে। কতদিন যে মা-বাবার হাতে পিটুনি খেয়েছি তার হিসাব নেই। আবার পরদিনই একই কাজ করেছি। নদিতে পাড়ার নারি-পুরুষ নির্বিশেষে অনেকেই আসত। কেউ গোসল করত, কেউ কাপড় কাঁচত। এর ফাঁকেই চলত নানা গল্প। আমার মা কখনো নদিতে গোসল করতে যাননি। তবে নদির ঘাটে কবে কাকে নিয়ে কি গল্প হয়েছে তা ঠিকই জানতেন।

বর্ষায় নদি ভরে যেত পানিতে। প্রায় রাস্তায় উঠে যেত পানি। মা তখন আমাদেরকে নদিতে গোসল করতে যেতে দিতেন না। পাড়ার ছেলেরা ব্যস্ত থাকত বড়শি দিয়ে মাছ ধরতে। সারাদিন কেটে যেত নদিতে মাছ ধরা দেখতে দেখতে অথবা মাছ ধরতে ধরতে। রাতে নদিতে সৃষ্টি হত এক অদ্ভুত সৌন্দর্য্যের। সমস্ত নদিতে শত শত বাতি জালিয়ে জেলেরা মাছ ধরত। মনে হত নদিতে যেন শত শত জোনাকি খেলে বেড়াচ্ছে।

আমাদের ঘাটের পাশেই খেয়াঘাট। ওপারের মানুষেরা প্রতিদিন শহরে আসে নৌকায়। আবার কাজ শেষে নৌকায় ফেরে। আমরাও ছোটবেলায় শখ করে নৌকায় ওপারে যেতাম আবার ফিরে আসতাম। এখনো আমাদের কোন অতিথি বেড়াতে এলে আমরা অতিথিকে নিয়ে নৌভ্রমণে বের হই।

একথা সত্যি বাবার কাছে যে প্রমত্তা নবগঙ্গার কথা শুনেছি তা আমরা দেখিনি। কিন্তু আমরা যে নবগঙ্গা দেখেছি তাকে অন্তত নদি বলা যেত। দীর্ঘদিনের অবহেলায় নদিটা তার সেই যৌবন হারিয়ে ফেলেছে। এখন আর গোসল করার মত একটা ঘাটও নেই। নিয়মিত পৌরসভার আবর্জনা ফেলা হয় নদির পাড়ে। নর্দমা থেকে আসে নোংরা পানি। নদিটাকে রক্ষা করার কোন পদক্ষেপ আজ পর্যন্ত দেখা যায়নি। ধীরে ধীরে সরু হয়ে যাচ্ছে নদিটা। দুপাড়ে এখন ফসলের ক্ষেত।

এরই মধ্যে হঠাৎ করে সেতু তৈরির উদ্যোগে নেয়া হলো। মাত্র কয়েকশ গজ পরেই একটি বিশাল সেতু রয়েছে। ওপারের মানুষের পারাপারের জন্য ঐ সেতু অথবা খেয়াই যথেষ্ট। তারপরও সময়ের চাহিদা মেটাতে আরেকটি সেতু দরকার। প্রতিদিন সেতু তৈরির কাজ দেখি আর বুকের মধ্যে কেমন করে ওঠে। খেয়া নৌকার মাঝিদের দিকে তাকাই আর মনে হয় দুদিন পর এদেরকে চলে যেতে হবে এই পেশা ছেড়ে। বাপ-দাদার এই পেশা আর থাকবেনা তাদের। আমার ছেলেবেলার সেই নদি এখন নেই। তবু ঘাট ছিল, নৌকা ছিল মাঝি ছিল অন্তত। আমি প্রায়শই নদির ধারে দাঁড়াতাম। আমার শৈশবকে দেখতে পেতাম। এখন নবগঙ্গার সামনে দাঁড়াই ,সেতুর কাজ দেখি আর কেন যেন মনে হয় এবার আর থাকবেনা নদিটা। কফিনের শেষ পেরেকটা ঠুকে দেওয়া হচ্ছে এবার। জানিনা আমার এ আশংকা সত্যি কিনা।

লেখক: সমাজবিজ্ঞানের প্রভাষক ও সংস্কৃতিকর্মী।

 

(মতামত একান্তই লেখকের নিজস্ব)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

June ২০২৬
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
« May    
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০  

ফেসবুকে আমরা

বিভাগ

দিনপঞ্জিকা

June ২০২৬
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
« May    
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০  
%d bloggers like this: