মাগুরানিউজ.কম:
রাজীব মিত্র জয়-
নির্যাতনকারীদের শাস্তি দিতে পুলিশ অফিসার হতে চায় মাগুরার সেই নির্যাতিত দশ বছরের শিশু বিথি। নির্যাতনের বিচার এখনো সে পাইনি, তাই মনে ক্ষোভ আর ঘৃনা সাথে একবুক অনিশ্চয়তা নিয়ে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল ছেড়ে গতকাল শেল্টার হোমে চলে গেল দেশব্যাপী আলোচিত বর্বর নির্যাতনের শিকার মাগুরার শালিখার সেই হতদরিদ্র পরিবারের মা-হারা শিশু কাজেরমেয়ে বীথি।
গতকাল সকালে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে বেশ হাসিখুশিই দেখাগেলো সেদিনের সেই কংকালসার প্রায়মৃত বিথিকে। শরীরে আগের সেই গরম খুনতির স্যাঁকা ও নির্যাতনের দগদগে ঘাঁ নেই, তবে মনে রয়ে গেছে নির্যাতনের সব স্মৃতি। হাসপাতাল ছাড়ার আগে সে মাগুরা নিউজকে জানালো তার স্বপ্নের কথা। জানালো, ‘সমাজে যারা শিশুদের নির্যাতন করে নিজ হাতে তাদের শাস্তি দিতে চায় সে। আর এ জন্য সে লেখাপড়া শিখে বড় পুলিশ অফিসার হতে চায়।’
বিথি মাগুরা নিউজেকে আরো জানায়,তাকেনির্যাতনের বিষয়টি পুলিশ কিংবা অন্য কাউকে যেন না বলা হয় এজন্য বিচারক নুরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী নাতাশা বেগম সেদিন তার পায়ে ধরেছিল।যার কারণে তাকে উদ্ধারের ভয় পেয়ে সে কিছুই বলেনি।
হাসপাতালে উপস্থিত বিথির এক নিকটআত্নীয় সবুজ মিয়া জানান, খুবই দরিদ্র বিথির বাবা গোলাম রসুল। উপায় না পেয়ে মেয়েকে ওখানে রেখেছিলেন মেয়েটাকে একটু ভাল রাখার জন্য। আর যা হলো তা মুখে বলার মতো না।
তিনি আরো জানান, ওইদিন সাতক্ষীরা সদর থানা পুলিশ বিথির বাবা গোলাম রসুল বিশ্বাসকে মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলার বড় আমিনিয়া গ্রাম থেকে ডেকে এনে একটি অভিযোগ লিখে নিয়েছিল ঠিকই, কিন্ত মামলাটি রেকর্ড করেনি।
এরপর গত ৩০ আগস্ট দ্বিতীয় দফায় রাত ১১টা ১৫ মিনিটে বীথির বাবা সাতক্ষীরা থানায় উপস্থিত হয়ে তার মেয়ের ওপর বর্বর নির্যাতনের বিচার চেয়ে এজাহার দায়ের করেছিলেন। কিন্তু পুলিশ সেই এজাহারটিও মামলা হিসেবে রেকর্ড করেনি।
এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এমদাদুল হক শেখ বলেন, অভিযোগপত্র হাতে পেয়েছি। মামলা রেকর্ড করার ব্যাপারে পর্যালোচনা চলছে। কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে। ঘটনার তদন্তও চলছে। অপরাধীর শাস্তি তো হবেই।
ওসি এমদাদুল হক শেখ আরো জানান, লিখিত ওই অভিযোগে বিথির বাবা গোলাম রসুল উল্লেখ করেছেন, এক বছর দুই মাস আগে তার গ্রামের রুস্তম আলি বিশ্বাসের ছেলে, সাতক্ষীরা জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের কর্মচারি সোহরাব হোসেন ওরফে সাগর তার মেয়ে বীথিকে ভালকাজ ও পাশাপাশি লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাড়ি থেকে নিয়ে আসে। পরে সে বীথিকে সাতক্ষীরার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো: নুরুল ইসলামের ভাড়া বাড়িতে গৃহকর্মী হিসাবে রেখে দেয়। এর পর থেকে তার মেয়ের সাথে দেখা করতে দেয়া হয়নি। এমনকি ফোনে কথা বলার সুযোগও দেওয়া হয়নি। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে তিনি গত ১৭ এপ্রিল স্বশরীরে সাতক্ষীরাতে এসে অনেক চেষ্টার পর সাতক্ষীরার তৎকালীন চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিতাই চন্দ্র সাহা’র রুমে তার মেয়েকে দেখতে পান। কিন্তু সেখানে তেমন কথা বলার সুযোগ পাননি তিনি।
উল্লেখ্য, গত ১৯ অগাস্ট সাতক্ষীরা শহরের পলাশপোল এলাকায় সাতক্ষীরার বিচারিক হাকিম নুরুল ইসলামের ভাড়া বাসা থেকে নির্যাতিত বিথিকে উদ্ধার করা হয়। সে সময় উপস্থিত ছিলেন সাতক্ষীরা চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিট্রেট নিতাই চন্দ্র সাহা, সাতক্ষীরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, এএসপি (সদর সার্কেল) আনোয়ার সাঈদ, সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এমদাদুল হক শেখ, সাংবাদিক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। কঙ্কালসার শরীর নিয়ে বিথিকে দ্রুত ভর্তি করা হয় সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে। সেখানে পুলিশ হেফাজতে চলে বিথির চিকিৎসা।
এদিকে বিথি তার সিদ্ধান্তে কতৃপক্ষকে জানায়, সে আর কখনো তার বাবার কাছে ফিরে যেতে চায় না। কারণ হিসেবে সে উল্লেখ করেছে, তার মা বেঁচে না থাকায় তার বাবা ওই বিচারকের বাসায় কাজ করতে পাঠিয়েছিল তাকে। আর সে কারণেই তার এত নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে।
এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা সহকারী পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আনোয়ার সাঈদ জানান, পুলিশের পক্ষ থেকে আবেদন করার পর শিশু বিথিকে সুস্থ হওয়ার পর বাগেরহাট শিশু সংশোধনাগারে পাঠানোর সিদ্ধান্ত দেন আদালত।
হাসপাতালে বিথিকে কেমন আছো জানতে চাইলে বলে, ‘আমি খুব ভালো আছি। টেংরা মাছের ঝোল, গরুর মাংস, বিরানি খেতে ইচ্ছে হলেই পুলিশ আঙ্কেলরা খেতে দেয়। কিন্ত কাজের মেয়ে হিসেবে থাকার সময় কতবার ভালো খাবার খেতে ইচ্ছে হতো। কিন্তু খেতে চাইলেই তারা (ম্যাজিট্রেট নুরুল ইসলাম ও স্ত্রী নাতাশা) মারপিট করত।’
সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. সামছুর রহমান বলেন বিথি জানিয়েছে, খেতে চাইলেই ওরা মারপিট করত। কারণে অকারণে বিথিকে বিচারকের স্ত্রী নাতাশা প্রায়ই মারতো। হাত-পা বেধে রাখত। কাজ না পারলে গরম খুনতির স্যাকা দিত। গরম পানি তার শরীরে ঢেলে দিত। এভাবে সাতক্ষীরা বিচারক নুরুল ইসলামের বাসায় কেটেগেছে কমপক্ষে ৬ মাস বিথির ওপর নির্যাতন। খেতে না পেরে শরীর কঙ্কালসার হয়ে গিয়েছিলো।
হাসপাতাল ছাড়ার আগে সে মাগুরা নিউজকে আবারো জানালো তার স্বপ্নের কথা। ‘সমাজে যারা শিশুদের নির্যাতন করে নিজ হাতে তাদের শাস্তি দিতে চায় সে। আর এ জন্য সে লেখাপড়া শিখে বড় পুলিশ অফিসার হতে চায়।’
নির্যাতনের বিচার চেয়ে না পেলেও সামাজিক বিচার পেয়েছে শিশুটি। সাতক্ষীরার সচেতন নাগরিকরা বিচারের দাবীতে রাস্তায় নেমে একাধিক সভা-সমাবেশ করে শিশু নির্যাতনের বিচার চেয়েছে। তারা আন্দোলন করেছে। শিশু বীথী এজন্য যাওয়ার সময় সাতক্ষীরাবাসীকে ধন্যবাদ জানাতে ভুল করেনি।
বিথি নিজের ভাষায় ধন্যবাদ জানিয়েছে পুলিশ আংকেল ও সাংবাদিক আংকেলদেরকে। ধন্যবাদ জানিয়েছে মাগুরার লোকদের যারা তাকে দেখতে হাসপাতালে গেছে, আর মোবাইলের মাগুরা নিউজকে যারা আমার ছবি দেছে আর সবাইরে জানাইছে আমার খবর। ছলছল চোঁখে বিথিকে শুভকামনা জানিয়ে বিদায় জানালো সবাই।
আসুন আমরা বিথির স্বপ্নপুরনে সহযোগিতা করি।
লেখক- সম্পাদক মাগুরানিউজ।


