‘রাখী বন্ধন উৎসব’। ভালবাসা ও ঐক্যের অপূর্ব চিত্র- রীতা সেন

raksha bandhan

রীতা সেন : এই পৃথিবীর সমস্ত কিছুই একে অপরের সঙ্গে এক নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ । মানব সংসারের এই বন্ধনের ভিত্তি হল স্নেহ,প্রেম ,মায়া । বিভিন্ন উৎসব এই বন্ধন কে আরো সজ়ীব করে তোলে। ভারত বর্ষের সব উৎসবেরই মূল মন্ত্র হল মিলনের মন্ত্র, ঐক্যের সুর। রাখী বন্ধন হল সেই রকমই একটি পারিবারিক মিলনের উৎসব।

শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমার দিনে রাখী বন্ধন উৎসব পালিত হয়।এই দিনে বোন তার ভাই এর হাতে হাতে রাখী বেঁধে দেয়।এই বন্ধনের মধ্যে থাকে ভাই এর প্রতি বোনের আন্তরিক শুভকামনা, ভাই এর মনে থাকে বোনকে কে রক্ষা করার দায়ীত্ববোধ।এই রাখী বন্ধন এক বন্ধন শক্তির প্রতিরূপ ,যে শক্তি সকল প্রকার বাধা বিঘ্নতা, প্রতিবন্ধকতা, কাটিয়ে ভাই বোন কে জীবণ যুদ্ধে জয় লাভ করার নীরব শপথ করায়।

এই মাঙ্গলিক উৎসবের পিছনে আছে অনেক পৌরাণিক গল্পকথা ও ঐতিহাসিক কাহিনী। তারমধ্যে একটি হল মহাভারত থেকে।মহাভারতে কথিত আছে যে শ্রীকৃষ্ণ একবার রথের চাকার আঘাতে আহত হয়েছিলেন,তখন দ্রৌপদী তাঁর নিজের শাড়ী ছিঁড়ে কৃষ্ণের রক্তাক্ত হাতে বেঁধে দেন।দৌপদীর এই সেবা শ্রীকৃষ্ণ কে মোহিত করে এবং তিনি দ্রৌপদীর প্রতি এক নিবিড় স্নেহের বন্ধন অনুভব করেন।এই ঘটনার পর থেকে শ্রীকৃষ্ণ ও দ্রৌপদীর মধ্যে এক পরম শ্রদ্ধা ও স্নেহ এর বন্ধন সৃষ্টি হয়।এর পর বহু বছর কেটে যায়। রাজা ধৃতরাষ্ট্র এর সভায় দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণের গল্প আমাদের সবার জানা।সেখানে আমরা দেখেছি যে অসম্মানিত, অপমানিত দ্রৌপদী কে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন কৃষ্ণ,তিনি তাঁর বসন কে বর্ধিত করে দ্রৌপদী কে অপমানের হাত থেকে রক্ষা করেন। অনেকের বিশ্বাস যে মহাভারতের দ্রৌপদী আর কৃষ্ণের এই স্নেহের বন্ধনই হিন্দু সমাজে রাখী বন্ধন এর মূল সূত্র।

রাখি নিয়ে ঘটে যাওয়া বিশেষ একটি ঘটনা বলি- আলেক্সান্ডার ও রাজা পোরুস এর মধ্যকার ঘটনার কথা আমরা সবাই জানি।আমরা জানি পরাজিত হবার পরও রাজা পোরুস এর ব্যক্তিত্ব দেখে আলেক্সান্ডার তাকে তার রাজত্ব ফিরিয়ে দেন। কিন্তু আমরা জানিনা যে রাজা পোরুস সুযোগ পেয়েও আলেকজেন্ডার কে একবার হত্যা করেননি ।যুদ্ধ শুরুর আগে আলেক্সান্ডার এর স্ত্রী রোশানক রাজা পোরুসকে একটি রাখিসুত্র পাঠান এবং তাকে অনুরোধ করেন যে তিনি যেন যুদ্ধক্ষেত্রে তার স্বামীর কোন ক্ষতি না করেন।বোন ভাইয়ের দীর্ঘায়ুর জন্যে প্রার্থনা করবে আর ভাই সারাজীবন বোনকে রক্ষার প্রতিজ্ঞা করবে,এমনটাই রাখির নিয়ম। যুদ্ধ হিন্দু এই বীর যোদ্ধা রাখির মর্যাদা পূর্নভাবে রক্ষা করেন।(তথ্যসূত্র-Indian cultures quarterly,volume 25)

ভারতবর্ষে রাজপুত চিতরের বিধবা রাণী কর্ণবতী কর্ণবতী দিল্লীর মুঘল সম্রাট হুমায়ূনের কাছে কে রাখী উপহার পাঠান।এই উপহার সম্রাট কে মোহিত করে ও তিনি রানী কর্ণবতীর সঙ্গে স্নেহের সম্পর্কে আবদ্ধ হন ।

আমরা বাঙ্গালী রা রাখী বন্ধন উৎসবটিকে একটু আলাদা দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে দেখি। বাংলায় রাখী বন্ধন প্রবর্তণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ভারতবর্ষ তখন বৃটিশ দের অধীনে শাসিত।১৯০৫ সালে ২০ জুলাই ভাইসরয় লর্ড কার্জন এর সিদ্ধান্তে ঘোষিত হয় যে বাংলা কে দুই ভাগে ভাগ করা হবে।এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলার শক্তিকে খর্ব করা,ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের উৎসস্থল বাংলাতে হিন্দু-মুসলিম বিরোধ তৈরি করে আন্দোলনকে অস্তমিত করে দেয়া।ঠিক করা হয়েছিল যে হিন্দু ও মুসলিমের প্রাধান্য অনুসারে সমগ্র বাংলাকে পূর্ব আর পশ্চিম বাংলায় বিভক্ত করা হবে।

১৯০৫ সালে ১৬ অক্টবরে এই সিদ্ধান্ত কার্যকরী হয়।সমগ্র বাংলা এই বিভাগের প্রতিবাদে সচ্চার হয়ে ওঠে।শুরু হয় বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন।এই আন্দোলন এর অন্যতম ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।তিনি বাংলার সব মানুষ কে আহবান জানান এর প্রতিবাদে সামিল হবার জন্য।এই দিনটিতে তিনি রাখী বন্ধন উৎসব পালন করেন বাঙ্গালীদের নিয়ে। রবীন্দ্রনাথ প্রবর্তিত রাখী হিন্দু সমাজে প্রচলিত অনুষ্টানের থেকে তাই কিছুটা ভিন্ন। এটা কেবল মাত্র ভাই বোনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়,তিনি জাতী, ধর্ম, নির্বিশেষে সকল মানুষ কে আবহান জানান একে অপরের হাতে হলুদ রঙের রাখী বেঁধে দিতে।এই অনুষ্ঠানের মধ্যে ধ্বনিত হয়েছিল ঐক্যের সুর, আর বিভেদের তীব্র প্রতিবাদ।রাখী বন্ধনের মধ্য দিয়ে অসংখ্য বাঙ্গালীর মধ্যে জাগ্রত হয়েছিলো মিলনের সুর,জাতীয়তাবোধ।কবির সঙ্গে তারা যোগদান করেছিলো প্রতিবাদী শোভাযাত্রায়।কবির রচিত গান গেয়ে তারা বঙ্গভঙ্গ এর বিরূদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিলো… ” বাংলার মাটি বাংলার জল বাংলার বায়ু বাংলার ফল/ পুন্য হউক পুন্য হউক পুন্য হউক হে ভগবান………।।

এই ভাবে রাখী বন্ধন উৎসব বিভিন্ন রূপে একটি পারিবারিক মিলন বন্ধনের উপযুক্ত উদাহরণ সরূপ আমাদের জীবনে,আমাদের মনে,আমাদের দেশে যুগ যুগ ধরে পালিত হয়ে আসছে। এখন বর্তমানে আমাদের জীবনে রাখী বন্ধন উৎসব শুধুমাত্র দিদি-ভাই এর মধ্যেই পরিসীমিত নেই-দাদু-নাতনী,দিদি বোন,বান্ধবী-বান্ধবী এবং রাজনৈতিক জগতেও তারা নিজেদের মধ্যে ভালোবাসার এবং মিলনের ঐক্য

বন্ধনের এই সুত্রটি বেঁধে নিজের সর্ম্পককে আর দৃঢ় করে তুলছে। এমনই সব অসাধারণ ঐতিহ্য আর আচার নিয়ে সনাতন সংস্কৃতি।

লেখক-

অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা, শিশু শিক্ষা কর্মী।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

April ২০২৬
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
« Mar    
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০  

ফেসবুকে আমরা

বিভাগ

দিনপঞ্জিকা

April ২০২৬
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
« Mar    
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০  
%d bloggers like this: