মাগুরানিউজ.কমঃ
মাগুরায় এবার আমনের ভালো ফলন হলেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। উৎপাদনের পরিমাণ কমিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি তাদের। ধানের দরপতনে এ অঞ্চলের হাজার হাজার কৃষকের অবস্থা এখন বেসামাল। লোকসানে হতাশ আমন চাষিরা। ধানের বাজারে ধস এসব কৃষকের আনন্দ ম্লান করে দিয়েছে। বাজারে ন্যায্যমূল্য না থাকায় মলিন মুখেই আমন ধান কাটছেন কৃষকেরা। সোনালী আমন ধানের ক্ষেতের আইলে কৃষকের বিবর্ণ মুখ বড়ই বেমানান।
১০-১৫ দিন ধরে জেলার বিভিন্ন মাঠে পুরোদমে আমন ধান কাটা শুরু হয়েছে। দিন-রাত চলছে ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কাজ। বিভিন্ন জায়গা থেকে কৃষি শ্রমিকেরা ধান কাটতে এসব এলাকায় জড়ো হয়েছেন। কৃষকের পাশাপাশি শিশুরাও ধান কাটা উৎসবে মেতে উঠেছে। অস্থায়ী ঘর নির্মাণ করে কৃষি শ্রমিকেরা ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কাজ করে যাচ্ছেন। আগামী ১০-১৫ দিনের মধ্যে ধান কাটা শেষ হবে বলে কৃষকেরা জানিয়েছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলার চার উপজেলায় ৫৩ হাজার ২১৯ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধান চাষের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ২০ হাজার ৫১৫ হেক্টর, শ্রীপুর উপজেলায় ৯ হাজার ৯৮৩ হেক্টর, শালিখা উপজেলায় ১২ হাজার ৩২০ হেক্টর, ও মহম্মদপুর উপজেলায় ১০ হাজার ৪০১ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধান চাষের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। চাষ হয়েছে ৫৬ হাজার ২৭৫ হেক্টর জমিতে। যা লক্ষমাত্রার তুলনায় ৩ হাজার ৫৬ হেক্টর বেশি। চাষকৃত জমি থেকে ১ লাখ ৪২ হাজার ৬৬৮ মেট্রিক টন চাল উৎপানের লক্ষমাত্র নির্ধারণ করা হয়েছে।
জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে বিরি-৫৬, বিরি-৫৭, বিরি-৩৯ বিরি-৩৩, বিনা-৭, বিআর-১১, জিএস-১, গুটি স্বর্ণসহ বিভিন্ন জাতের উচ্চ ফলনশীল জাতের রোপা আমন ধান চাষ হয়েছে। এ বছর সময়মত বৃষ্টিপাত হওয়ায় কৃষকরা ভালোভাবে ধান চাষ করতে পেরেছে। প্রতি বিঘা জমিতে ধানের ফলন হয়েছে ১৮-২১ মণ।
মাগুরার শ্রীপুর, আড়পাড়া, মাগুরা সদর, মহম্মদপুর, শালিখা ও শত্রুজিৎপুর হাটে নিয়মিত যাতায়াত করেন এমন ব্যাপারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহ ধরে এসব হাটে বিভিন্ন জাতের আগাম মোটা ভিজা ধান প্রতিমণ ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। শ্রেণিভেদে চিকন ধান বিক্রি হচ্ছে ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা। গত বোরো মৌসুমের চেয়ে মোটা ধান মণপ্রতি ৩০০-৪০০ টাকা কমে বিক্রি হচ্ছে।
ভরা মৌসুমে ধানের দাম মাত্রারিক্ত কমে যাওয়ায় কৃষকদের মাঝে চরম হতাশা বিরাজ করছে। নিত্য পণ্যের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির ফলে দরিদ্র এসব কৃষকদের নাভিশ্বাস। আবার প্রতি মণ ধানে কৃষক গচ্চা দিচ্ছেন ২০০-৩০০ টাকা। এতে কৃষকের হাতে নগদ অর্থ না থাকায় গ্রামীণ অর্থনীতিতে চরম মন্দা দেখা দিয়েছে।
এদিকে ধানের দাম পড়ে যাওয়ায় পাইকারি বাজারে চালের দামে কোনো প্রভাব পড়ছে না। এতে খুচরা বাজারে কমছে না চালের দাম। বাজারে এখনো ২৮-৩৪ টাকার কমে কোনো মোটা চাল পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ ধানের দাম হিসেবে চালের দাম আরো কম থাকা উচিত।
কৃষকেরা বলেন, ধান উৎপাদনেরর জন্য, জমি পরিষ্কার, জমি চাষ, আইল তৈরি, কাঁদা বানানো, বীজ ক্রয়, বীজতলা তৈরি, চারা উত্তোলন-রোপণ, সেচ, সার, কীটনাশক, ধান কাটা, মাড়াই, পরিবহন ও বাজারজাতকরণসহ কৃষকের প্রতিটি ধাপে ধাপে অর্থ ব্যয় করতে হয়। এতে এক কেজি ধান মাঠ থেকে বাড়ি পর্যন্ত আনতে ১৫-২০ টাকা খরচই হয়ে যায়। এর সঙ্গে জমির ভাড়া ও কৃষকের নিজের শ্রমের মজুরি ধরলে এ ব্যয় আরো বেড়ে যায়। এ ছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ দুর্বিপাকতো রয়েছেই।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কৃষি উপকরণসহ শ্রমের দাম যে হারে বাড়ছে সে হারে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের দাম বাড়ছে না। এ অঞ্চলের অধিকাংশ কৃষকই দরিদ্র ও প্রান্তিক পর্যায়ের। তারা ঋণ করে ফসল উৎপাদন করেন। ফসল ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি করে দেনা শোধ করতে হয়। বাকিটা দিয়ে সারা বছরের খাবার ও পরবর্তী ফসল আবাদের খরচ যোগাতে হয়। মৌসুমি ফসল ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তারা একযোগে ফসল বিক্রির জন্য বাজারে আনতে বাধ্য হন। সরকারের সঠিক ক্রয়নীতি না থাকায় এ সময় বাজার নিয়ন্ত্রণ করে এক শ্রেণির ফড়িয়া ও দালালেরা। কৃষকের গোলা শূন্য হলে কৃষি দ্রব্যের দাম বাড়ে। আর এ দামের সুবিধা পায় মধ্যস্বত্বভোগীরা, বঞ্চিত হয় কৃষক।
মহম্মদপুর উপজেলা সদরের কৃষক আব্দুল সবুর বলেন, ধানের দরপতন অতীতের সকল সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। কৃষক ধান বাজারে নিয়ে পানির দরে বিক্রি করছেন। কৃষকের কাছে কোনো বিকল্প না থাকায় তারা বাধ্য হয়েই আবার মাঠে নামছে ফসল উৎপাদনের জন্য। ঘুরে ফিরে প্রতিবছর একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
মঘী গ্রামের ধান চাষী সুমন রহমান জানান, তার তিন একর জমিতে ২৪০ মণ ধান উৎপাদন হয়েছে। সার, কীটনাশক, সেচ ও অন্যান্য খরচ নিয়ে প্রতি মণ ধানে (চিকন) খরচ হয়েছে ৬১০ টাকারও বেশি। বর্তমান বাজারমূল্যে কয়েক হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।
আবদুর রহমান জানান, এবার ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে বাজারে ধানের ন্যায্যমূল্য নেই। উৎপাদন ব্যয় এ বছর কিছুটা বেশি। ন্যায্যমূল্য না পেয়ে কৃষকদের মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
সদরের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কামরুল হাসান জানান, এবার বাম্পার ফলন আশীর্বাদ হিসেবেই দেখছেন এ এলাকার কৃষক। কিন্তু ধানের দর কম হওয়ায় কৃষকের ভাগ্যে অভিশাপ নেমে এসেছে। সরকার উপযুক্ত মূল্য নির্ধারণ না করে দিলে কৃষকদের পথে বসতে হবে।
মাগুরার কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক কর্মকর্তা মোখলেছুর রহমান বলেন, এবার ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করবে। তবে ন্যায্যমূল্য না পেলে কৃষকেরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।


