মাগুরানিউজ.কমঃ
একসময় কেবল ‘ব্যাঙের ছাতা’ নামে পরিচিতি থাকলেও ঢাকার মতো ধীরে ধীরে মাগুরায়ও কদর বাড়ছে পুষ্টি গুনাগুণ ও ওষুধি গুণ সমৃদ্ধ খাবার মাশরুমের। একদিকে যেমন এ জেলার অনেক বেকার যুবক-যুবতী এখন মাশরুম চাষ করে স্বাবলম্বী তেমনি এখন এখানকার অধিকাংশ দোকানে বিক্রি হয় মাশরুম ও মাশরুমজাত বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য।
মাগুরার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোখলেসুর রহমান জানান, সবজি জাতীয় হালাল খাবার হওয়ায় মাশরুম খাদ্য হিসেবে অতুলনীয়। মাশরুমকে ‘সবজি মাংস’ও বলা হয়ে থাকে।
“প্রতি ১০০ গ্রামে (শুকনো মাশরুম) ২০-৩০ গ্রাম প্রোটিন পাওয়া যায়। এছাড়াও মাশরুমে ভিটামিন সি, বি কমপ্লেক্স, পটাশিয়াম, সোডিয়াম, ফসফরাস ও কমমাত্রায় ক্যালসিয়াম ও লৌহ রয়েছে। লৌহ কম থাকাতেও সহজলভ্য অবস্থায় থাকে বলে রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বজায় রাখতে মাশরুম সহায়তা করে।”
তিনি আরও জানান, মাশরুম খুব নিম্নশক্তি সম্পন্ন খাবার। এতে কোলেষ্টরল নেই, চর্বির পরিমাণও কম (২-৮%) কিন্তু শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় ফ্যাটি এসিড ও লিনোলোয়িক এসিড এতে পর্যাপ্ত রয়েছে। এছাড়াও মাশরুমে পরিমিত কার্বোহাইড্রেট ও যথেষ্ট আঁশ (৮-১০%) থাকে। এতে কোনো স্টার্চ নেই।
“শর্করার পরিমাণ কম বিধায় বহুমূত্র রোগীদের জন্য মাশরুম আদর্শ খাবার। কম চর্বি, কোলোস্টেরকমুক্ত এবং লিনোলেয়িক এসিড সমুদ্ধ হওয়ায় মাশরুম হৃদরোগীদের জন্য খুব উপকারী।”
মাগুরায় মাশরুমের হালহকিকত
শুধু খাদ্য গুনাগুণই নয় ব্যাপক চাহিদা ও চাষে লাভের হার বেশি বলে মাগুরার অনেক যুবক-যুবতী এখন আগ্রহী মাশরুম চাষে। কথা হয় তাদেরই একজন আবুল হাসেমের সঙ্গে।
তিনি জানান, চাহিদা বাড়ায় এবং অল্প পুঁজিতে এর বাণিজ্যিক চাষাবাদ শুরু করা যায় বলে অন্যদের মতো তিনিও আগ্রহী হয়েছেন মাশরুম চাষে।
“মাশরুম চাষ করতে কোনো আবাদী জমি কিংবা বেশি মূলধন লাগে না। ঘরের মধ্যেই অল্প জায়গায় বাঁশের তাক করে মাশরুম চাষ শুরু করেছিলাম। কৃষি অফিস থেকে মাশরুমের বীজ প্যাকেট কিনে এনে শুধু পানি দিয়েছি। ৭ থেকে ১০ দিন পরই মাশরুম উৎপন্ন হয়।”
মাশরুম চাষী আবুল হাসেম জানান, বছর দুয়েক আগে অল্প করে শুরু করলেও এখন বড় পরিসরে তার উৎপাদিত মাশরুম সৌদি আরবেও রপ্তানি হচ্ছে। এছাড়াও মাগুরা শহরের অনেক হোটেল রেস্টুরেন্টে এখন মাশরুমের তৈরি বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য এবং কাঁচা ও শুকনা মাশরুমছাড়াও মাশরুমের তৈরি চপ ও স্যুপ বিক্রি হয় এবং অল্প সময়ে এগুলো বেশ জনপ্রিয়তাও লাভ করে।
তিনি আরও জানান, ব্যাপক প্রচারনার মাধ্যমে মাশরুমের গুণাবলী জনমানুষকে জানানো গেলে ও বেকার যুবক-যুবতীদের সহজশর্তে দিয়ে মাশরুম চাষে উদ্বুদ্ধ করা গেলে দেশের প্রোটিন ঘাটতির অনেকটাই মাশরুমের দ্বারা পূরণ করা সম্ভব হবে।
চাষপ্রণালী
মাগুরার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোখলেসুর রহমান জানান, আমাদের দেশের আবহাওয়ায় গ্রীষ্মকালে যে কোনো চালা ঘরের নিচে এবং বারান্দায় মাশরুম চাষ করা যায়। বর্ষাকালে পানি প্রবেশ করে না অথচ বাতাস চলাচলের সুবিধা আছে এমন ঘরে এর চাষ করতে হয়। শীতকালে ভেজা স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার ঘরে এর চাষ হয়ে থাকে।
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশে বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে ঝিনুক মাশরুমের চাষই বেশি প্রচলিত। তাই চাষীদের জন্য সরকারি সব কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং মাশরুম উন্নয়ন ও সম্প্রসারন কেন্দ্র/উপকেন্দ্রের পক্ষ থেকে স্পন ভর্তি সাবষ্ট্রেটসহ উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত পিপি ব্যাগ সরবরাহ করা হয়। সরবরাহকৃত এসব ব্যাগ থেকেই চাষীরা ফসল উৎপাদন করে থাকেন।
১০-২০ টাকা দামের এ প্যাকেট কিনে নিয়ে ব্যাগের দুপাশে অধর্চন্দ্রাকৃত্রির করে কেটে কাটা অংশটির খানিকটা চেছে ফেলে দিতে হবে। চাছার পর ব্যাগটি পরিষ্কার পানিতে ২১-৩০ মিনিট ডুবিয়ে রাখতে হবে। ব্যাগটি অত:পর পরিষ্কার ফ্লোর বা তারের জালির ওপর আধাঘন্টা সময় উল্টে রাখতে হবে যাতে ভেতরের বাড়তি পানি ঝড়ে যায়।
এবার চাষঘরে কাঠের ব্যাক বা বাঁশের মাচায় পরিমিত বিছিয়ে ব্যাগগুলো তার ওপর সারিবদ্ধভাবে রাখতে হবে। বাইরের তাপমাত্রা কম থাকলে ব্যাগের উপর পলিথিন ঢেকে দিয়ে ২/৩ দিন রাখতে হবে যাতে ব্যাগের ভেতরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এ সময় ঘরের আর্দ্রতা ৮০% এবং তাপমাত্রা ২৫-৩০০ সে. হওয়া দরকার। প্রয়োজনবোধে ব্যাগগুলোতে নিয়মিত পানি স্প্রে করতে হবে। পলিথিন দিয়ে ঢাকা থাকলে ৩/৪ বার ১০-১৫ মি. সময় ঢাকনা সরিয়ে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করে দিতে হবে।
২/৩ দিন পর ব্যাগের কাটা অংশ দিয়ে সাদা পিন সদৃশ অংশ দেখা যায়। আরো ২/৩ দিন পর মাশরুম বড় হলে সংগ্রহ করতে হবে।
অন্য দুপাশ থেকে অত:পর একইভাবে চেছে দিয়ে পানি স্প্রে করলে নতুনভাবে মাশরুম উৎপাদন হবে। একটি মাশরুমের ব্যাগ থেকে ৩/৪ বার ফসল তোলা যায়।


