মাগুরার বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিজুর রহমানের অন্যরকম যুদ্ধ

মাগুরানিউজ.কমঃ 

Magura-6-1418103237 (1)

যে হাতে একদিন গর্জে উঠেছিল অত্যাচারীর বিরুদ্ধে হাতিয়ার।/ আজ সেই হাতেই ধরেছি তুলি,/ আঁকি কত ছবি এই বাংলার, / কঠিন কোমলে গড়া এ দেহ মন, / তাই করি কতকিছু থাকি যতক্ষণ। এই হচ্ছে বীর মুক্তিযোদ্ধা চিত্রশিল্পী আজিজুর রহমানের লেখা কবিতার চরণ।

নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ও সৃজনশীল চিন্তায় উদ্বুদ্ধ করতে তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। এ লক্ষে তিনি সদর উপজেলার রাউতড়া গ্রামে নিজ অর্থে পৈত্রিক ৬ শতক জমিতে প্রতিষ্ঠা করেছেন মোস্তফা আজিজ আর্ট স্কুল। ২৯ বছর ধরে বিনা বেতনে এলাকার ছেলেমেয়েদের পিতৃ স্নেহে চিত্রাংকন, সংগীত, নৃত্য শিক্ষা দেয়ার মাধ্যমে বাঙ্গালী সংস্কৃতির প্রসার ঘটিয়ে যাচ্ছেন।

শুধু তাই নয়, তার বিদ্যালয়ের ছেলে মেয়েরা  যেন জাতির বীরত্বগাথা মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে পারে সেজন্য তিনি তাদের মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো গল্প আকারে উপস্থাপন করেন। তিনি শিক্ষার্থীদের দূর্নীতি করবো না, দূর্নীতি সইব না এই শ্লোগানটি উচ্চারণ করান বার বার।

চিত্রশিল্পী মুক্তিযোদ্ধা আজিজসহ এই স্কুলে আরো ৫ জন শিক্ষক স্বেচ্ছাসেবার ভিত্তিতে জাতি গঠনে অবদান রেখে চলেছে। স্থানীয় ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকরা সবাই ওই স্কুলটিকে তাদের জন্য আর্শিবাদ হিসেবে মনে করেন। এলাকার প্রাইমারি ও মাধ্যমিক পর্যায়ের ২০০ ছেলে-মেয়ে তাদের সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশের জন্য প্রতি শুক্রবার এখানে সমবেত হয়। যে কারণে এ এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে একটি সাংস্কৃতিক আবহ। এই স্কুল থেকে ছবি আঁকা শিখে বর্তমানে ঢাকা, রাজশাহী চারুকলাসহ দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন অনেকে।

এলাকাবাসি জানান, মুক্তিযোদ্ধা আজিজ সম্পুর্ণ নিজ চেষ্টা ও ব্যক্তিগত অর্থে এলাকায় মোস্তফা আজিজ আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠা করে বিনা বেতনে নিজ হাতে ছেলে-মেয়েদের চিত্রাংকন সহ নানা সৃজনশীল শিক্ষা দিয়ে আসছেন। যার ফলে এলাকার ছেলে-মেয়েরা ছোট বেলা থেকেই ভাল চেতনাবোধ সম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে উঠছে। এ স্কুলটি প্রতিষ্ঠা না হলে এলাকার ছেলে-মেয়েদের প্রায় ১৫ কিলোমিটার দুরে জেলা সদরে যেতে হতো চিত্রাংকন শিখতে। ফলে মুক্তিযোদ্ধা চিত্রশিল্পী আজিজুর রহমানকে তারা এলাকার আর্শিবাদ হিসেবে মনে করেন।

চিত্রশিল্পী আজিজ জানান, সাধারণ স্কুলের ছবি আঁকাসহ যে বিষয়গুলো ততটা গুরুত্ব দিয়ে শিখানো হয় না। এখানে ছেলে-মেয়েদের সে বিষয়গুলো গুরুত্ব সহকারে শেখানো হয়। ছবি আঁকা, সঙ্গীত, নৃত্যর পাশাপাশি এখানে বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, পহেলা বৈশাখসহ জাতীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলো উদযাপন করা হয় জাঁকজমকপূর্ণভাবে। আজিজ তার নিজ অর্থে ওই স্কুলে তৈরি করেছেন একটি শহীদ মিনার। এখানে প্রতি একুশে ফেব্রুয়ারিতে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।

আজিজুর রহমানের বর্তমান বয়স ৭৩ বছর। স্ত্রী ও তিন সন্তানের জনক। পৈত্রিক ১৫ বিঘা জমি তার উপার্র্জনের একমাত্র মাধ্যম। যা থেকে তিনি সংসার চালিয়ে সংসারের খরচ নির্বাহ করে চালিয়ে যাচ্ছেন আর্ট স্কুল। ছোট বেলায় প্রাইমারি স্কুলে পড়া অবস্থায় আঁকা আঁকিতে বেশ পারদর্শী ছিলেন। যে কারণে তিনি সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিনিয়ত ছবি আঁকা চালিয়ে যান। ছবি আঁকাতে তার প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষা নেই। তবে পার্শ্ববর্তী ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার ছেলে দেশের বিখ্যাত, প্রয়াত স্কেচ শিল্পী মোস্তফা আজিজের কাছে শিখেছেন ছবি আঁকার নানা কলা কৌশল।

পাশাপাশি তিনি ছড়া, কবিতা, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, ছোট গল্প ইতিহাস বিষয়ক লেখালেখিতে অভ্যস্ত। এ সব বিষয়ে তার রয়েছে বেশকিছু অসংখ্য পান্ডুলিপি। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে তা বই আকারে ছেপে প্রকাশ করতে পারেননি।

তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম। যুদ্ধের সময় আমার মৃত্যুও হতে পারতো। যেহেতু মারা যাইনি, বরং স্বাধীন দেশের মুক্ত আকাশে নিঃশ্বাস নিতে পারছি। সে কারণে দেশের কাছ থেকে কি পেলাম? সে ব্যাপারে আমার কোন আক্ষেপ নাই। বরং দেশকে কিছু দিতে হবে, এই চেতনা বোধ থেকেই ১৯৮৫ সালে নিজ গ্রামে শিক্ষাগুরু মোস্তফা আজিজের নামে এই আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠা করি।’

অর্থাভাবে প্রথমে টিনের চালা দিয়ে স্কুলটির যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে স্থানীয়দের সাহায্য সহযোগিতা ও নিজের অর্থে ৫ কক্ষের পাকা একটি টিন সেড ভবনে পরিণত হয়েছে। যেখানে একটি কক্ষ শিক্ষকদের অফিস ও অন্য চারটি কক্ষ ‘ক্লাস রুম’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

চিত্রশিল্পী আজিজ জানান, তার এ কর্মকান্ডের জন্য জেলার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায়ই তাকে ডেকে নিয়ে সম্মানিত করা হয়। অনেক সময় বিভিন্ন স্কুল কর্তৃপক্ষের আহবানে সাড়া দিয়ে ছাত্র ছাত্রীদের চেতনা বোধ জাগ্রত করতে মুক্তিযুদ্ধসহ নানা ইতিবাচক গল্প শোনানো ও ছবি আঁকা শেখাতে যেতে হয়।

এ কাজে তিনি বেশ স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন। তবে যেহেতু তিনি বিত্তবান ব্যক্তি নন, যে কারণে তার মৃত্যুর পর এই স্কুলটির যাতে মৃত্যু না ঘটে। তাই সরকারিভাবে বা ব্যক্তি পর্যায়ে কোন বিত্তবান ব্যক্তি যদি স্কুলটির পরিচালনা দায়িত্ব নিতেন, তাহলে স্বস্তিতে মরতে পারতেন বলে জানান।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

June ২০২৬
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
« May    
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০  

ফেসবুকে আমরা

বিভাগ

দিনপঞ্জিকা

June ২০২৬
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
« May    
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০  
%d bloggers like this: