মাগুরানিউজ.কমঃ

মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলা সদরের চারশ’ বছরের পুরনো সরকারি সেচ খালটি দখলবাজদের কবলে পড়ে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে ভূষণা অঞ্চলের স্বাধীনচেতা জমিদার রাজা সীতারাম রায়ের সময়ে খালটি খনন করা হয়। স্থানীয়ভাবে মাধুর খাল নামে পরিচিত। ৪০০ বছরের পুরনো খালটি একসময় ২০ ফুটেরও বেশি প্রশস্থ ছিল, ছিল স্রোতস্বিনী। নৌকা চলত এই খালে। নৌকায় করে কৃষকরা ফসল ঘরে তুলত। ১ বৈশাখে খালপাড়ে মেলা বসত। আজো বসে।
কৃষকের পরম বন্ধু খ্যাত এই খাল এখন অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। এমএন (মধুমতি-নবগঙ্গা) প্রজেক্টের মূল খাল যা সদরের বাঐজানি গ্রাম হয়ে ঘোঁপ বাওড় হয়ে মধুমতি নদীতে পড়েছে। আবার বাঐজানি এলাকা থেকে শুরু (উত্তর-দক্ষিণ) হয়ে সদরের বৃহৎ ফসলি মাঠে কাতলাসুরির বিলে গিয়ে পড়েছে। প্রায় দুই কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই খালটি দখল হওয়ায় অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। নাব্যতা হারিয়ে সংকুচিত হয়ে কোথাও কোথাও ৩-৪ ফুটে এসে ঠেকেছে।
এ ছাড়া বাঐজানি থেকে আমিনুর রহমান কলেজ এলাকা হয়ে কাজি সালিমা হক মহিলা কলেজের পিছন দিয়ে কাতলাসুরির বিলে পড়ার আগ পর্যন্ত খাল দখল হয়ে গেছে। খালের মাঝখানে প্রায় দেড়শ’ফুট আড়াআড়ি জায়গায় বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেছেন মজনু শাহ নামের এক ব্যবসায়ী। মাগুরাসহ বিভিন্ন জেলায় তার ঢেউটিন, রড ও সিমেন্টের ব্যবসা রয়েছে। মাগুরা শহরের জামরুলতলা এলাকায় লাবনী স্টিল কর্নার নামে তার প্রধান ব্যাবসা কেন্দ্র।
তিনি সদরের কাজী সালিমা হক মহিলা কলেজ এলাকায় খালের মোট ৩০ শতাংশ জমির মধ্যে বহুতল ভবন তৈরির জন্য আরসিসি খুঁটির সাহায্যে পাঁচ ফুট দেওয়াল নির্মাণ করেছেন।
এদিকে খালের মধ্যে অবকাঠামো নির্মাণ করায় পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। খালের মূলধারা সংকুচিত হয়ে পড়ায় বর্ষা মৌশুমে কৃষকের জমির পানি নিষ্কাশন ও শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে পড়বে। খালের সঙ্গে সংযুক্ত পাঁচটি বিলের ১০ হাজার হেক্টর কৃষি জমিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হবে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বাঐজানি থেকে কাতলাশুরির বিল পর্যন্ত দেড় কিলোমিটার খালের দুই পারের শতাধিক পয়েন্টে স্থানীয় প্রবাভশালীরা দখল করে বাড়িঘর নির্মাণ করেছেন। খালের জমি ভরাট করে স্থাপনা তৈরি করায় গুরুত্বপূর্ণ সেচখালটি ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়েছে। কয়েক জায়গায় নাব্যতা হারিয়ে খালের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে।
সর্বশেষ ব্যবসায়ী মজনু খালের মাঝ দিয়ে হুতল ভবন নির্মাণ কাজ শুরু করেছেন। তিনি দাবি করেন, খালের পাশে ভরাট হওয়া ২৫ শতাংশ ক্রয়কৃত জমির ওপর তিনি ভবন তৈরি করেছেন।
সদরের কানাই নগর গ্রামের বাসিন্দা প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক স্বপন কুমার অধিকারী (৭৫) বলেন, ‘শৈশবে তিনি মাধুর খাল ২০-২৫ ফুট প্রশস্ত দেখেছেন। এখন তা কোথাও কোথাও ৩-৪ ফুটে গিয়ে ঠেকেছে।’
সদরের শ্যামনগরের বাসিন্দা ও প্রাক্তন ইউপি সদস্য আব্দুর রহমান বলেন, ‘সদরের এই সেচখালটি কৃষি ও কৃষকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্ষাকালে সদরের কাতলাশূর, ধোয়াইল, ফলিয়া, সিন্দাইন ও সূর্যুকুন্ড এলাকার প্রায় দশ হাজার হেক্টর আবাদি জমির জলাবদ্ধতা দূরকরে ও শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানি সরবরাহ করে খালটি। খালটি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় এ এলাকার কৃষিতে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।’
এসি ল্যান্ডের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মহম্মদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কামরুল হাসান বলেন, ‘এক বছর আগে আমি এখানে যোগ দিই। আমি যোগ দেওয়ার আগেই খালের দুপাড়ে অনেকেই স্থাপনা নির্মাণ করেছেন।’
ভূমি কার্যালয়ের জরিপ প্রতিবেদন পাওয়ার পর উচ্ছেদের জন্য মামলার অনুমোদন চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করা হবে বলে জানান তিনি।

