মাগুরানিউজ.কমঃ
প্রাণীজ আমিষের সিংগ ভাগ চাহিদা পূরণ করে মাছ। মাছ হচ্ছে সহজপ্রাচ্য পুষ্টিকর সুস্বাদু আমিষ প্রদানকারী জনপ্রিয় খাবার। খাবার টেবিলে মাছের যে কোন প্রকারের তরকারী না হলে খাবার পরিপূর্ণতা পায়না। খাবার যেন অপূর্ণাঙ্গ রয়ে যায়।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, আমাদের খাবার টেবিলে মাছের ডিশে দেশী মাছের যায়গায় বিভিন্ন বিদেশেী মাছ এবং হাইব্রীড মাছ স্থান করে নিয়েছে। আপত দৃষ্টিতে ব্যাপারখানা সুখকর হলেও ভবিষ্যতের জন্য এটা ভাল লক্ষণ নয়। দেশী মাছ, মুক্ত জলাশয়ের মাছ হারিয়ে যেতে বসেছে।
মাগুরার খাল-বিল পর্যন্ত শুকিয়ে মাছশূন্য হয়ে পড়েছে। ফলে এ অঞ্চলে দেশীয় প্রজাতির শৈল, বোয়াল, মাগুর, সিং, পাবদা, মলা, ঢেলা, কৈ, টেংরা, টাকি, পুঁটি, বাতাসি, বাইম, গজারসহ বিভিন্ন প্রকারের মাছ আর দেখতে পাচ্ছেন না বাসিন্দারা। জেলেপল্লীর মৎস্যজীবীরাও এখন মাছের আকালে পেশা বদল করতে বাধ্য হচ্ছেন। গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, অতীতে খাল-বিল, নদী-নালায় কোনো রকম পরিচর্যা ছাড়াই জন্ম নিয়ে বেড়ে উঠত নানারকম দেশি প্রজাতির অজস্র মাছ। কিন্তু এখন আর সেই দেশীয় মৎস্য সম্পদের প্রকৃত অভয়ারণ্য নেই কোথাও। তবে মৎস্য মন্ত্রণালয়ের আওতায় কেবল কাগজপত্রেই বিভিন্ন স্থানে নামকাওয়াস্তের অভয়ারণ্য ঘোষিত হয়। বাস্তবে দেশি প্রজাতির মাছের বংশবৃদ্ধি এবং বেড়ে ওঠার জন্য যে পরিমাণ নদী, জলাশয়, খাল-বিল, হাওরের প্রয়োজন তা ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে।
চৈত্র-বৈশাখের খরার পর আষাঢ়ে বৃষ্টি হলেই ডোবা, খাল-বিল ভরে উঠত মলা, দারকিনা, পুঁটি, টেংরা, গুলশা, ছোট খৈলসা, চান্দাসহ নানা রকম ছোট ছোট মাছে। এখন আষাঢ়ে বৃষ্টি হলে খাল-বিলে পানি জমে ঠিকই, কিন্তু দেশি মাছগুলোর দেখা মেলে না আর। টেপা মাছ, গজার, মাগুর, বোয়াল, ফাসা, চিংড়ি, কৈ, খৈলসা, পুঁটি এখন বিলুপ্তির পথে।
দেশি মাছ চাষের ব্যাপারে সরকারি কোনো সমন্বিত উদ্যোগ না থাকায় দিন দিনই চিরচেনা মাছগুলো বিলুপ্তির উপক্রম হয়েছে। সরকারি কিছু প্রদর্শনী হ্যাচারি-পুকুরে সীমিতভাবে দেশি জাতের শিং ও মাগুর মাছের চাষ হলেও তা মাছ চাষিদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। সব শ্রেণির মানুষের মধ্যেই দেশি মাছের চাহিদা থাকলেও বাজারে এর জোগান নেই। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা (আইইউসিএন) ২০০০ সালে এর ৫৪ প্রজাতিকে বিপন্ন ঘোষণা করেছে। তবে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত ও গবেষণা থেকে জানা যায়, দেশে বিপন্ন প্রজাতির মাছের সংখ্যা শতাধিক।
আইইউসিএন বিপন্ন প্রজাতির মাছগুলোকে চার ভাগে ভাগ করেছে? সংকটাপন্ন, বিপন্ন, চরম বিপন্ন ও বিলুপ্ত। সংকটাপন্ন মাছের মধ্যে আছে ফলি, বামোশ, টাটকিনি, তিতপুঁটি, আইড়, গুলশা, কাজুলি, গাং মাগুর, কুচিয়া, নামাচান্দা, মেনি, চ্যাং ও তারাবাইন। বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে- চিতল, টিলা, খোকশা, অ্যালং, কাশ খাইরা, কালাবাটা, ভাঙন, বাটা, কালিবাউশ, গনিয়া, ঢেলা, ভোল, দারকিনা, রানি, পুতুল, গুইজ্যা আইড়, টেংরা, কানিপাবদা, মধুপাবদা, পাবদা, শিলং, চেকা, একঠোঁট্টা, কুমিরের খিল, বিশতারা, নেফতানি, নাপিত কৈ, গজাল ও শালবাইন। অন্যদিকে চরম বিপন্ন প্রজাতির মাছের তালিকায় রয়েছে ভাঙন, বাটা, নান্দিনা, ঘোড়া মুইখ্যা, সরপুঁটি, মহাশোল, রিটা, ঘাউড়া, বাছা, পাঙ্গাস, বাঘাইড়, চেনুয়া ও টিলাশোল মাছের নাম।
মৎস্য অধিদফতরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আবদুল খালেক বলেন, দেশি মাছগুলো যাতে হারিয়ে না যায় এবং বিপন্নপ্রায় মাছগুলো পুনরুদ্ধারে হাওর, বাঁওড়, বিল ও নদীতে ৪৬৩টি অভয়াশ্রম তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া জলাধার পুনরুদ্ধার প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজও সচল রয়েছে। অধিদফতরের উদ্যোগে চাষিদের দেশি প্রজাতির মাছ চাষ সংক্রান্ত বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন মো. আবদুল খালেক।


