মাগুরানিউজ.কমঃ
এখন সরিষার মৌসুম।মাগুরা জেলায় এবার ১২ হাজার হেক্টোর জমিতে সরিষার চাষ হয়েছে। সারিষার উপর নির্ভর করে এলাকার মৌ-চাষীরা ব্যাস্ত সময় পার করছেন মধু সংগ্রহের কাজে। জেলার বিভিন্ন স্থানে সরিষার ক্ষেতে মৌ চাষীদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মত। মৌ চাষ বৃদ্ধি পাওয়ার সরিষা ফুলের ভাল পরাগায়ন হবে। এ কারনে সরিষা চাষেও চাষীরা উৎসাহিত হচ্ছে। ফলে এবার জেলায় সরিষার উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে সাথে সাথে মৌচাষীদের কাছে জমি লিজ দিয়ে বেশ ভাল অর্থ উপার্জন করবে এমনটাই ভাবছে এলাকার চাষিরা।
মাগুরা জেলার ইছাখাদা, মালঞ্চি, বালিয়াডাঙ্গা, বেঙ্গা,বেরইল তেঘরিয়াসহ ৩৫ টি গ্রামের বির্স্তীর্ন সরিষা ক্ষেতে মোট ৪১ জন নিবন্ধিত খামারী ছাড়াও আরো অনেকে মৌ চাষকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। চাষীদের ধারনা এবার জেলায় প্রায় ১০০ মেট্রিক টন মধু সংগ্রহ হবে। যার বাজার মূল্য প্রায় ৩ কোটি টাকার বেশী।
এ চাষকে আরো সম্প্রসারিত করতে পারলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও মধু রফতানী করা সম্ভব। নানান জাতের মাছি থাকালেও মাগুরায় সাধারনত বানিজ্যিক ভাবে আফ্রিকান মেলি ফ্রা জাতের মৌ মাছি এখন বেশী চাষ হচ্ছে। কারন এ মাছি পরিমানে অনেক বেশী মধু সংগ্রহ করতে পারে। বিভিন্ন ফুল থেকে বছরের প্রায় ৮ মাস চাষীরা মধু সংগ্রহ করে থাকে। বর্তমানে প্রায় ৫০০টি পরিবার মৌ চাষের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। মৌচাষের সাথে দীর্ঘ দিন সম্পৃক্ত রজব আলী জানান, ১৯৯৬ সালে বিসিক থেকে প্রশিক্ষন নিয়ে তাদের দেয়া ১ টি মৌবক্স নিয়ে প্রথম মৌচাষ শুরু করেন। তার দেখাদেখি দিনদিন মৌচাষ বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে।
চাষীরা জানান, সরিষা মৌসুমে বেশী মধু উৎপাদন হওয়ায় উপযুক্ত সংরক্ষনের অভাবে অনেক কম দামে মধু বিক্রয় করতে বাধ্য হন। ফলে তারা আর্থিক ক্ষতির সম্মখিন হন। এছাড়া বর্ষ মৌসুমে সাধারনত মৌ মাছির নানা বিধ রোগ ব্যাধী হয়ে থাকে। ফলে প্রচুর মাছি মারা যায়। এ ব্যাপারে স্থানীয় ভাবে তারা কোন পরামর্শ বা সহযোগিতা পান না। চাষীদের তখন নিজস্ব ধারনা থেকে মাছিকে বাঁচিয়ে রাখার নানা কৌশল অবলম্বন করতে হয়। খামারীদের দাবী স্থানীয় ভাবে পরামর্শ পাওয়া যায় এমন সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করা। প্রশিক্ষনের পাশাপাশি সহজ শর্তে সুদ বিহীন ঋণ সুবিধা পেলে আরো পেলে আরো অনেক বেকার যুবক এ পেশায় এগিয়ে আসবে। বিসিক ইতিমধ্যে ১২টি ব্যাচে প্রায় ১৬৮ জন নারী-পুরুষ কে মৌচাষের উপর প্রশিক্ষন দিয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই ইতিমধ্যে মৌ চাষকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। কাঠ দিয়ে তৈরী এক ধরনের মৌবক্স যার মধ্যে ফ্রেম সাজিয়ে রাখা হয়।উক্ত ফ্রেমে রানী মৌমাছি ঢুকিয়ে দিলে অন্যান্য মৌমাছি ঢুকে চাক তৈরী করে মধু সঞ্চয় করে। এখান থেকে চাষীরা মধু সংগ্রহ করে ড্রামের ভিতরে বিশেষ ব্যবস্থায় রাখা চাক ঘুরিয়ে মধু সংগ্রহ করে।
মৌচাষি আবদুল জলিল বলেন, ‘প্রতিবছর ডিসেম্বর মাস থেকে আমাদের মধু সংগ্রহের কাজ শুরু হয়। এটি চলবে মার্চ পর্যন্ত। জেলায় প্রায় শতাধিক খামারি মধু সংগ্রহের কাজ করে। এ বছর মধু সংগ্রহের কাজে আমরা ৩৫০টি বাক্স ব্যবহার করছি।’
মৌচাষি আবদুল হালিম মিয়া জানান, ‘১০ বছর ধরে সরিষা থেকে মধু সংগ্রহের কাজ করছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘মধু সংগ্রহে যে মৌমাছি ব্যবহার করা হয়, এরা আমাদের দেশি মৌমাছি নয়। এফিসমেলিফ্রা জাতের অস্ট্রেলিয়ান মৌমাছি দিয়ে মধু সংগ্রহ করা হয়। মৌমাছিগুলো পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে আনা হয়।’
মৌ-শ্রমিক শাহাদাত হোসেন জানান, মধু সংগ্রহে সুপার চেম্বার, বুরট, নিউক্লিয়াস নামের বাক্স ব্যবহার করা হয়। বাক্সগুলো সরিষা খেতের কাছে রাখলে মৌমাছিরা মধু এনে বাক্সে জমা করে। প্রতিটি বাক্স থেকে তিন-চার কেজি মধু পাওয়া যায়। সপ্তাহে এক দিন মধু সংগ্রহ করা হয়। প্রতি কেজি মধু ১০০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি করা হয়। প্রতিটি খামারে তিন থেকে পাঁচজন শ্রমিক কাজ করেন। শ্রমিকেরা মাসিক এক থেকে পাঁচ হাজার টাকা করে বেতন পান।
মৌচাষী কল্যান সমিতির সভাপতি মো:মোখলেছুর রহমান জানান, মাগুরার চাষীরা মৌচাষে আগ্রহী হচ্ছে তবে কোথায় মধু বিক্রি করলে উপযুক্ত মূল্য পাওয়া যাবে, কি ভাবে সংরক্ষন, কৃষি লোন বাজারজাত করন সম্ভব তা তাদের অজানা। সরকার ও কৃষি বিভাগ এ ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহন করলে একদিকে কৃষকরা উপকৃত হবে অন্যদিকে মাগুরার মত ১শ মেট্রিক টন মধু উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের ৬৪ জেলায় ৬৪০০ মেট্রিক টন মধু উৎপাদনের মাধ্যমে বিদেশে রপ্তানী করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে সক্ষম হবে। সদর উপজেলার তেঘরিয়া গ্রামের মৌচাষী মোঃ ইসরাইল জানান,সরকারি কোন সাহায্য পাচ্ছিনা, পাচ্ছিনা কোন পরামর্শ। তবে ক্ষেতে মৌমাছি বসায় পরাগায়নের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে এতে তারা লাভবান হচ্ছে।
বিসিকের জেলা ম্যানেজার আনোয়ার সিদ্দিকী জানান, মধু চাষীদের ১২ টি প্রশিক্ষনের মাধ্যমে ১০০ পুরুষ ও ৬৮ জন মহিলাকে প্রশিক্ষন দেয়া হয়েছে। এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।





