বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যের অহংকার!

মাগুরানিউজ.কমঃ

10848004_7388yu45136204115_3083618275506647627_n
পৌষের সকাল। ঘন কুয়াশা। একইসাথে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। প্রকৃতিতে তাপমাত্রা কমার রেকর্ড গড়ছে বারবার। তাই লেপ-কাঁথার উষ্ণতার সান্নিধ্যে পরম সুখ অনুভব করার নিরন্তর চেষ্টা রত গ্রামবাংলার বেশিরভাগ মানুষ। তবে এমন উষ্ণতা অনুভব করার সময় নেই মাগুরার শালিখার সোনাতন গোলদারের। তিনি ঘন কুয়াশার চাদর ভেদ করে বাঁক (বাঁশের তৈরি) কাঁধে ফেলে চলেছেন খেজুর বাগানে। উদ্দেশ্য, আগেরদিন বিকেলে সযতনে কেটে আসা গাছের রস সংগ্রহ। সঙ্গে আছে সোনাতনের সাত বছরের নাতি। আর কিছু পরেই বাড়িতে ব্যস্ততা বাড়বে সোনাতনের বউ পার্বতী গোলদারের। তার কাজ স্বামীর সংগ্রহ করা রস থেকে গুড় তৈরি করা। এই গুড় বিক্রি করেই চলে তাদের শীতকালীন সংসার খরচ।

এককালে যশোর জেলার গ্রাম্য মানুষের স্বাভাবিক কর্মতৎপরতা ছিলো আজকের সোনাতন গোলদারের মতো। পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৭৭ সালে বৃহত্তর যশোর জেলায় গৃহভিত্তিক সাত হাজারের বেশি গুড়ের কারখানা ছিলো। কিন্তু কালের বিবর্তনে খেজুরগাছের বিলুপ্তি আর অন্য লাভজনক পেশার কারণে যশোরে সোনাতন গোলদারদের এখন খুব কমই দেখা যায়। তাই যশোরের বিখ্যাত খেজুরের গুড় আর পাটালি আজ হয়ে গেছে ইতিহাসের অংশ।

খেঁজুরের গুড় আমাদের ঐতিহ্যের একটি অংশ। এর গুণগত মানের উপর নির্ভর করে আমাদের সুনাম। কিন্তু বর্তমানে বাজারে চিনি মিশ্রিত যে গুড় আর পাটালি পাওয়া যাচ্ছে তাতে আমাদের শুনাম ক্ষুণœ হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, ২০-৩০ বছর আগেও যে মানের পাটালি পাওয়া যেতো তা এখন আর পাওয়া যায় না।

স্বাধীনতার পর বৃহত্তর যশোর জেলার ঐতিহ্য খেঁজুর গুড়ের মান আর পরিমাণ সবদিক থেকে কমেছে। জেলা গেজেটিয়ার থেকে জানা যায়, ১৯৭০-৭১ সালে যশোর জেলায় (যশোর, ঝিনাইদহ, নড়াইল ও মাগুরা) ১১ হাজার ১৫৫ একর জমিতে খেজুরগাছের বাগান ছিলো। এর মধ্যে আট হাজার ৮৫৫ একর জমির খেজুরগাছ থেকে পাওয়া যেত রস। সে সময় প্রতি একর জমির খেজুরগাছ থেকে ২২ টন রস পাওয়া যেত। সেই হিসেবে ১৯৭০ সালে বৃহত্তর যশোর জেলায় রসের উৎপাদন ছিল দুই লাখ ৫৩ হাজার ৭২৫ টন। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থার জরিপ থেকে জানা যায়, ১৯৭৭ সালে বৃহত্তর যশোর জেলায় সাত হাজার ১৯৩টি গুড় তৈরির কারখানা ছিলো। পারিবারিকভাবে এসব কারখানা গড়ে ওঠে। অবশ্য বর্তমানে জেলায় কী সংখ্যক খেজুরগাছ আছে আর তা থেকে রসের উৎপাদনই বা কত তার কোন পরিসংখ্যান বনবিভাগ বা জেলার কোন সরকারি অফিস থেকে জানা সম্ভব হয়নি।

1379892_434933076612546_14516092_n

ঠিক কত আগে থেকে যশোরে খেজুরগাছের চাষ হয়েছে তা নির্ণয় করার সুযোগ নেই। তবে প্রাগৈতিহাসিককাল থেকেই এ অঞ্চলে খেজুরগাছ জন্মায় তা নিশ্চিত করে বলা যায়। আর গাছিরা (যারা খেজুরগাছ চেঁছে বের করে আনেন সুমিষ্ট রস) তাদের পূর্বপুরুষদের ধারাবাহিকতায় গাছ থেকে রস আর রস থেকে গুড় তৈরি করে। মণিরামপুরের সোনাতন গোলদার বলেন, বাবা আর দাদুকে দেখেছি গাছ ( খেজুর গাছ) কাটতে। তাদের কাছে গাছ কাটা শিখেছি। এখনো শীতকালে সেই কাজই করি। কিন্তু বর্তমানে আগের মতো আর খেজুরগাছ নেই। তাই রস-গুড় বেশি হয় না। তিনি আরো জানান, তাদের এলাকায় খেজুরগাছ লাগাতে কোন ধরনের পরিচর্যা করার দরকার হয় না। খেজুরের আটি (বীজ) থেকে গাছ জন্মায়। সেই গাছ এক সময় আপনা-আপনি বড় হয়। গাছি তোলে (গাছের পাতা ইত্যাদি পরিস্কার করে রস আহরণের ব্যবস্থা) গাছ। বেঁধে দেয় ঠিলে (কলসি)। সারারাত ধরে পড়তে থাকে রস। সেই রস সকালে সংগ্রহ করা হয়। পরে আগুনে জ্বাল দিয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় গুড় বা পাটালি।

ঐতিহাসিক সতীশচন্দ্র মিত্র তার ‘যশোর খুলনার ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, সুপ্রাচীনকাল থেকে যশোরের চাষীরা খেজুর গাছ কেটে রস বের করে গুড় ও চিনি তৈরি করে আসছে। তবে ইংরেজ আমলে কিছু উদ্যোগী সাহেব গুড়-চিনি তৈরিকে রীতিমত শিল্প হিসেবে দাঁড় করিয়ে ফেলেন। ঐতিহাসিকদের মতে,  পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের ধোবা নামক স্থানে ব্লেক (Blake) সাহেব প্রথম কুঠি স্থাপন করে চিনি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রায় একই সময় কলকাতার গ্লাডস্টোন উইলি অ্যান্ড কোং (Gladstone Wyllie & co.) যশোরের চৌগাছায় এসে কারখানা খোলেন। এই কোম্পানি এলাকার চাষীদের কাছ থেকে রস সংগ্রহ করে গুড় ও চিনি তৈরি করতো। ক্রমেই যশোরের কোটচাঁদপুর, কেশবপুর, ত্রিমোহিনী, ঝিকরগাছা ও নারিকেলবাড়িয়ায় এই কোম্পানির কারখানা গড়ে ওঠে।

52dfc683aa389-1

সতীশচন্দ্র মিত্র তার গ্রন্থে আরো উল্লেখ করেন, ১৮৬১ সালে নিউহাউস সাহেব চৌগাছার তাহিরপুরে একটি চিনির কল স্থাপন করেন। একইসঙ্গে কারখানাটিতে মদও তৈরি হতো। আর এই কারখানার কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হতো যশোরের খেঁজুরের রস। ১৯০৮ সালে প্রকাশিত বেঙ্গল এগ্রিকালচার ডিপার্টমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে যশোরের বিভিন্ন স্থানে বেশকিছু চিনি ও গুড় কারখানা ছিল। ১৯০০-’০১ সালে যশোরের ১১৭টি কারখানায় ১৫ লাখ টাকার চিনি উৎপাদন হয়েছিল। সে বছর দুইবঙ্গের (পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্ববঙ্গ) ২১ লাখ ৮০ হাজার ৫৫০ মণ উৎপাদিত চিনির মধ্যে শুধু যশোরেই উৎপাদন হয় ১৭ লাখ নয় হাজার ৯৬০ মণ। বিভাগীয় বন কর্মকর্তা সাইদুর রশিদ জানান, এই প্রকল্পের আওতায় যশোর সদর, মণিরামপুর, শার্শা, নড়াইল, ঝিনাইদহ, মাগুরা, কোটচাঁদপুর এবং সাতক্ষীরায় মোট ২১ লাখ খেজুরগাছ লাগানো হয়েছে। চারা লাগানোর ৫-৬ বছরের মধ্যে খেজুরগাছ থেকে রস পাওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, যশোরে আজ আগের মতো খেজুরের গুড়-পাটালি পাওয়া যাচ্ছে না। যতসামান্য যা পাওয়া যাচ্ছে তাতে নেই আগের সেই ঐতিহ্যের অহংকার। যা আছে তা কেবল নাম আর খোলস মাত্র।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

April ২০২৬
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
« Mar    
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০  

ফেসবুকে আমরা

বিভাগ

দিনপঞ্জিকা

April ২০২৬
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
« Mar    
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০  
%d bloggers like this: