মাগুরানিউজ.কমঃ
‘তুই ভালো করে লেখা পড়া করিস। আমার লাইসেন্স বার হলে আমি ড্রাইভার হয়ে যাবো। আমাদের আর টাকার অভাব থাকবে না।’ বড় ভাইয়ের এ কথাগুলো স্মরণ করে এভাবেই বিলাপ করছিল সাথি। চার দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর রোববার সকাল ৮টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে সাথির ভাই মুরাদের মৃত্যু হয়।
এর আগে গত ৭ জানুয়ারি যশোরে মিনিবাসে দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে দগ্ধ হন হেলপার মুরাদ হোসেন মোল্যা (২০)।
মাগুরায় গ্রামের বাড়িতে মুরাদের লাশ আসার পর কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে স্বজনরা। অশ্রুসিক্ত চোখে সাথি (১৩) আরো জানায়, তার ভাই তাকে বলেছিল, ‘ইট কিনে পাকা ঘর বানাবো। আমরা পয়সার অভাবে পড়ালেখা করতে পারি নাই। তোর কোন পয়সার চিন্তা নাই। তুই অনেক পড়া লেখা করবি।’
মুরাদের গ্রামের বাড়ি মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার মৌশা গ্রামে। সে ওই গ্রামের তোরাব মোল্যার ছেলে। সরেজমিন আজ বিকেলে মুরাদের গ্রামের বাড়ি গিয়ে জানা যায়, তিন ভাই, এক বোন, বাবা, দাদা ও মাকে নিয়ে তাদের সংসার।
পিতা তোরাব মোল্যা বছরের কয়েক মাস অন্যের জমিতে শ্রমিকের কাজ করেন। বাকি কয়েক মাস ঢাকায় রিকশা চালান। মা নূরজাহান অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেন। সাত শতক জমির ওপর একটি ঝুপড়ি ঘরই তাদেরর শেষ স্বম্বল।
পেটের দায়ে বড়ভাই সামাদ মোল্যা ও মুরাদ ৮-১০ বছর বয়সেই জীবিকার তাগিদে ঘর ছাড়ে। তারা বাস চালকের সহকারি (হেলপার) হিসেবে কাজ করে। বড়জন চালকের লাইসেন্স পেয়েছে। আর মুরাদের আবেদন বিআরটিসিতে প্রক্রিয়াধীন। ছোট ভাই দুখু আর বোন সাথিকে তাদের মা নূরজাহান বাড়িতে থাকেন। সাথি স্থানীয় কানুটিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী।
মুরাদ বোনের পড়ালেখার ব্যাপারে সচেতন ছিল। তার পড়ালেখার খরচের জন্য সে প্রতিমাসে আলাদা করে টাকা পাঠাতো। যত কষ্টই হোক ছোট বোনকে সে পড়া-লেখা শিখিয়ে মানুষ করবে এ প্রত্যাশা ছিল তার। গত বুধবার সন্ধ্যায় মোবাইল ফোনে বোনের সঙ্গে তার সর্বশেষ কথা হয়। কিন্তু রাজনীতি তার সব আশা কেড়ে নিলো। লাগাতার অবরোধ চলাকালে দুর্বৃত্তের দেওয়া আগুনে পুড়ে মৃত্যু হলো মুরাদের। সে সঙ্গে তার সব স্বপ্নও পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
মুরাদের দাদা খালেক মোল্যা জানান, বুধবার (৭ জানুয়ারি) ভোর ৪টার দিকে যশোরের নিউমার্কেট এলাকার খাজুরা বাসস্ট্যান্ডে পার্কিং করা মিনিবাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এ সময় বাসের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা মুরাদ হোসেন দগ্ধ হয়।
প্রথমে তাকে যশোর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে ওইদিন সন্ধ্যায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। রোববার সকালে তার মৃত্যু হয়। তার শরীরের ৩৭ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল। তার গাড়িটি যশোর-মাগুরা রুটে চলাচল করত বলে তিনি জানান।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ময়না তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে তার লাশ সন্ধ্যা ৬টার দিকে মৌশার গ্রামের বাড়িতে আসে। পরে পাশ্ববর্তী গোরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়।
লাশ ঘিরে স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে পরিবেশ। মুরাদের বাবা-মা , দাদা ও ভাইবোন সবাই বিলাপ করতে থাকেন । তারা এই ঘটনার বিচার দাবি করেন।

