মাগুরানিউজ.কম:

বিশেষ প্রতিবেদকঃ
ফাগুনের বিকেল। মিষ্টি রোদ। অনেকগুলি গোলাপী রঙের টিনের ঘর। সামনে উঠান। সেই উঠান জুড়ে বসে আছে-নানা বয়সের নারী। সঙ্গে আছে তাদের ছোট-ছোট ছেলে-মেয়েরা। আরও আছে কয়েকজন কিশোরী। আর তাদের সবার উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখছেন মাঝবয়সী একজন লোক। সবমিলিয়ে ছোট-খাটো আলোচনা সভার মতো। তবে এটা কোনো গতানুতিক আলোচনা সভা বা সেমিনার নয়। তথ্যের সম্ভার নিয়ে আসা তথ্য আপার উঠান বৈঠক। আর মুগ্ধ হয়ে যে ব্যক্তির বক্তব্য শুনছেন তিনি মাগুরার জেলা প্রশাসক ড. আশরাফুল আলম।
আজ মাগুরা সদরের জগদল ইউনিয়নের আলোচিত ‘পিংক ভিলেজ’ বা ‘গোলাপী গ্রাম’এ এই উঠান বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকী উদ্যাপন উপলক্ষে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং জাতীয় মহিলা সংস্থার অধীনে বাস্তবায়নাধীন তথ্য আপা প্রকল্পের আওতায় জেলার বিভিন্ন গ্রামে মহিলাদের বাল্যবিবাহ, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদসহ বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতামূলক এ উঠান বৈঠক অনুষ্ঠান হচ্ছে।
মাগুরার আলোচিত ‘পিংক ভিলেজ’ বা ‘গোলাপী গ্রাম’ এখন অনুসরনীয় হয়ে উঠেছে। গোলাপী রঙ ব্যবহার করা হয়েছে নারী ক্ষমতায়নকে সামনে আনার জন্য। এটি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে প্রতিটি ঘরের মালিক করা হয়েছে ওই পরিবারের নারী সদস্যকে। এমনটাই মন্তব্য প্রকল্পের স্বপ্নদ্রষ্টা মাগুরা সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবু সুফিয়ানের।
আবু সুফিয়ান বলেন, প্রচলিত গুচ্ছগ্রামগুলো থেকে প্রায়ই একটি অভিযোগ পাওয়া যায় ঘরের মান ভালো নয়, ঘরে থাকা যায় না। কিছুদিন যাওয়ার পরে মানুষ আর থাকতে চাই না। বিষয়টি নিয়ে বিশ্লেষণ করে দেখা গেল মানুষ আসলে মাটির ঘরে থাকতে চায় না। সামাজিক মর্যাদাসহ নানা কারণে ইটের ঘরের প্রতি মানুষের ঝোঁক। তাই এ কাজটি করতে সক্ষম হয়েছি।
মাগুরা সদর উপজেলার জগদল ইউনিয়নে মাধবপুর গুচ্ছগ্রামে ঠায় হয়েছে ১৫টি ভূমিহীন পরিবারের। তবে অন্যান্য যেসব ভূমিহীনের ঠায় হয়েছে তাদের চেয়ে নিজেদের ভাগ্যবান মনে করছেন এখানকার বাসিন্দারা। কারণ এই গুচ্ছগ্রামটি প্রথাগত নকশায় তৈরি হয়নি। বাড়ির নকশা থেকে শুরু করে অনেক কিছুতেই আনা হয়েছে পরিবর্তন। কাগজ কলমে গুচ্ছগ্রাম মনে হলেও স্থানীয়ভাবে এটি পরিচিতি পেয়েছে ‘পিংক ভিলেজ’ বা ‘গোলাপী গ্রাম’ নামে।
রঙিন টিনের আধাপাকা বাড়ি, সোলার লাইট, পরিবেশবান্ধব চুলা, ঘরের সঙ্গে পাকা টয়লেট, শিশুদের জন্য খেলার জায়গা- সবই আছে এই গুচ্ছগ্রামে। মাগুরা সদর উপজেলার জগদল থেকে কাটাখালি যাওয়ার পথে নজর কাড়ে এই পিংক ভিলেজ। আশেপাশের এলাকার অনেকেই আসেন ঘুরতে।
সদর উপজেলা পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, গুচ্ছ ২য় পর্যায় (সিভিআরপি) প্রকল্পের আওতায় মাধবপুরে ১৫টি দুই রুমের ঘর তৈরি করা হয়েছে। প্রতি ঘরের জন্য বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। যেখানে মূল নকশা অনুযায়ী মাটির মেঝের উপর ১২টি আরসিসি খুঁটি দিয়ে টিনের ঘর তৈরির কথা ছিল। সেখানে মাটির মেঝের পরিবর্তে সিসি ঢালাইসহ পাকা মেঝে করা হয়েছে। আরসিসি খুঁটির পরিবর্তে দেয়া হয়েছে ইটের দেয়াল। মূল নকশায় ঘরে দুই রুমের মাঝে ছিল বাঁশের বেড়া। পরিবতির্ত নকশায় দুই রুমের মাঝেও দেয়া হয়েছে ইটের দেয়াল। আর উপরে সাধারণ টিনের পরিবর্তে মাপ ঠিক রেখে দেয়া হয়েছে রঙিন টিন। পরিবর্তন আনা হয়েছে টয়লেটেও। সিরামিক প্যান ও আলাদা হাউজসহ বসানো হয়েছে পাকা টয়লেট।
প্রকল্প কর্মকর্তা মো. নুরুজ্জামান জানান, নকশা পরিবর্তন করা হলেও ঘরের স্থায়িত নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত জিনিসপত্রের মানের সঙ্গে কোনো আপস করা হয়নি। পুরো ভবন ঘিরে আরসিসি লিংটেল ও ডিপিসি ঢালাই দেয়া হয়েছে। জানালা দরজায় ব্যবহার করা হয়েছে মজবুত প্লেন শিট। প্রকল্পের বাইরেও কিছু সুবিধা পেয়েছে এই গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দারা। মূল রাস্তার সঙ্গে যুক্ত করতে ৫ ফুট প্রস্থ ও ৩৭৫ ফুট দৈর্ঘ্যের ইটের সলিং রাস্তা করা হয়েছে পরিষদের তহবিল থেকে। সাধারণ টিআর বরাদ্দ হতে প্রতিটি পরিবারের জন্য একটি করে মোট ১৫টি সোলার স্থাপন করা হয়েছে। তিনটি টিউবওয়েলের সঙ্গে বসানো হয়েছে তিনটি সোলার স্ট্রিট লাইট। সৌন্দর্য ও পরিবেশ রক্ষায় প্রতিটি বাড়িতে দেয়া হয়েছে চারটি করে ফলের গাছ। মোট ৪৮ শতক জমির ওপর ১৫টি ঘর নির্মাণের পাশাপাশি ৬ শতক পরিমাণ খোলা জায়গা রাখা হয়েছে খেলার মাঠ হিসেবে। যেখানে শিশুরা খেলা করার পাশাপাশি গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দারা সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠান করতে পারে।

