যুদ্ধ বিধ্বস্ত আতংক নগরী মাগুরার বালিদিয়া

মাগুরানিউজ.কমঃ 

ggsags20141104154327jiku
চারদিক পোড়া গন্ধ। ছড়ানো ছিটানো ছাই কয়লার স্তুপ। কয়েক জায়গায় এখনো ধোঁয়া উঠছে। আগুনের শিখা নিভে গেলেও তার ধ্বংস চিহ্ন এখনো স্পষ্ট।  আগুনে বাড়ি-ঘর হারিয়ে পরিবারগুলো খোলা আকাশের নিচে আহাজারি করছে। কয়েক ঘণ্টা আগেও তাদের ছিল সাজানো সংসার। এখন সব জায়গায় শুধুই কয়লার স্তুপ। দেখলে মনে হবে যুদ্ধ বিধ্বস্ত কোন জনপদ।

এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র ধরে প্রতিপক্ষের লোকজনের ধরিয়ে দেওয়া আগুনে মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার বালিদিয়া গ্রামের চিত্র এখন এই রকমই। সোমবার রাতে বিবাদমান দুই পক্ষের সংঘর্ষের পর প্রকাশ্যে অগ্নিসংযোগে ১৭টি বসতঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ৫টি পাঠকাঠির গাঁদা সম্পূর্ণ ভষ্মীভূত হয়েছে।

মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলার বালিদিয়া ইউনিয়নে আধিপত্য বিস্তার ও নেতৃত্ব নিয়ে আওয়ামী লীগের বিবাদমান দু’গ্রুপের সমর্থকদের মধ্যে সোমবার দীর্ঘ ৫ ঘণ্টা সংঘর্ষের জের ধরে রাতে ১৭টি বাড়িতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে প্রতিপক্ষের লোকেরা।ggsags201411041543jh27

দেখা গেছে, ১৫টি পরিবারের সদস্যরা খোলা আকাশের নিচে মানবেতর অবস্থায় রয়েছেন। এক কাপড়ে অর্ধাহারে অনাহারে আছেন তারা। এসব পরিবারের পানি খাওয়ার একটা পাত্র পর্যন্ত নেই। স্বজনদের পাঠানো খাবার খেয়ে তারা বেঁচে আছেন। ক্ষেত খামার চাষ বাস সব বন্ধ। নষ্ট হচ্ছে ক্ষেতের ফসল। শিশুদের বই খাতা নেই, স্কুলে যাওয়া বন্ধ। গবাদি পশুগুলো রয়েছে অভুক্ত। মকবুল সর্দারের স্ত্রী রুকি বেগম (৬৫) বলেন, ‘যুদ্ধের বছরেও এমন সর্বনাশ হতি দেহি নেই।’

মহম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মতিয়ার রহমান জানান, গতকাল সোমবার দুপুরে সৃষ্ট সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে এনে ওই এলাকায় পুলিশ পাহারায় ছিলো। রাতের দিকে প্রতিপক্ষ একে অপরের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে মাগুরা থেকে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা ঘটনাস্থলে এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

আগুনে আমিনুর রহমান, মন্নু, আমিরুল, সামাদ, আলম, কাঞ্চন মোল্লা, আবু বক্কার মোল্লা, হাফিজুর রহমান, কামাল মোল্লা, জিল্লু সর্দার, পান্নু সর্দার, মন্নু সর্দারের বাড়িসহ ১৭টি বাড়ি পুড়ে ভস্মীভূত হয়েছে।

এলাকাবাসী জানায় বালিদিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা হাফিজুর রহমান মিনা ও অপর আওয়ামী লীগ নেতা ইউনুছ শিকদারের মধ্যে আধিপত্যা বিস্তার ও নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধের জের ধরে সোমবার উভয় গ্রুপের সমর্থকদের মাঝে এই সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে ৩০জন আহত, ২০টি বাড়ি ও ৪টি দোকান ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।

এসময় খবর পেয়ে মহম্মদপুর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে তাদের নিক্ষিপ্ত ইটপাটকেলের আঘাতে ৪পুলিশ আহত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ৮০ রাউন্ড রাবার বুলেট ও টিয়ার সেল নিক্ষেপ করে সংঘর্ষকারীদের ছত্রভঙ্গ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

এই ঘটনার জের ধরে সোমবার সন্ধ্যায় মফিজুর রহমান মিনা গ্রুপের আহম্মদ শিকদারের ছেলে জসিম (১১) বালিদিয়া হাটে বাজার করতে গেলে ইউনুস গ্রুপের মন্নু সিকদার তাকে গরম লোহার রড দিয়ে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় স্যাঁকা দেয়। তাকে আহত অবস্থায় মহম্মদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।

এই খবর ছড়িয়ে পড়লে উভয় গ্রুপের সমর্থকেরা দেশি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে রাতে পুনরায় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষ চলাকালে কাঞ্চন মোল্যার ২টি, আকুব্বর মোল্যার ২টি, হাফিজার মোল্যার ৩টি বসত ঘর, কামাল মোল্যার ১টি রাইস মিল ১টি দোকান, জিল্লু সর্দার, পান্নু সর্দার, মন্নু সর্দার, আমিরুল সর্দার, সামাদ মোল্যা ও আলম মোল্যার দোকানঘর আগুনে সম্পূর্ন ভষ্মীভূত হয়েছে। সংঘর্ষে চলাকালে অন্তত ১৫টি বসতবাড়ি ও দোকানে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর ও লুটপাট করা হয়।

ggsags20141104154327fd

আগুনে জিল্লু সর্দার, নবীর মোল্যা ও কাঞ্চন মোল্যার পাটকাঠির গাঁদা পুড়ে যায়। প্রায় আড়াই ঘণ্টা আগুন জ্বলার পর মাগুরা থেকে দমকল কর্মীরা এসে আগুন নিয়ন্ত্রনে আনেন। খবর পেয়ে মাগুরার ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট এসে আগুন নেভানোর চেষ্টা করলে হামলাকারিদের তোপের মুখে তড়িঘড়ি করে আগুন নেভানোর কাজে যোগ দিতে না পারায় সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি থেকে খুব বেশি রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। বাড়িঘরের সাথে পুড়ে গেছে বিভিন্ন বৃক্ষরাজি। রাতের ঘটনায়ও ১০ ব্যক্তি আহত হয়েছেন। এ নিয়ে ২৩ জনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আএমও) ডা. মকছেদুল মোমিন।

মঙ্গলবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বালিদিয়া গ্রামে পুরুষ লোকজন তেমন নেই। হামলা-মামলার ভয়ে অধিকাংশই বাড়ি ছাড়া। বৃদ্ধ নারী ও শিশুরা বাড়িঘর পাহারা দিচ্ছেন। তাদের চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ। কয়েকজনকে দেখা গেছে পুড়ে যাওয়া ভিটায় আবার বাঁশ, পোড়া টিন ও পলিথিন দিয়ে রাত্রি যাপনের জন্য মাথার উপর একটি ছাউনি দাড় করানোর চেষ্টা করছেন। প্রতিপক্ষের লোকজন এ ঘটনার বদলা নিতে যে কোন সময় আবার হামলা চালাবে এমন গুজব সর্বত্র। অনেকে বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে মূল্যবান মালপত্র, গৃহস্থালী সামগ্রী ও গবাদি পশু সরিয়ে নিয়েছেন।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কেউ আটক হয়নি। এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা রয়েছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

April ২০২৬
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
« Mar    
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০  

ফেসবুকে আমরা

বিভাগ

দিনপঞ্জিকা

April ২০২৬
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
« Mar    
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০  
%d bloggers like this: