আজ বৃহস্পতিবার, জুন ১১, ২০২৬ ইং
loading....
শিরোনাম:
- জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতায় বিভাগীয় পর্যায়ে প্রথম শ্রীপুরের সন্তান সাকিন
- শ্রীপুরে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক র্যালি ও লিফলেট বিতরণ
- শ্রীপুরে দু-দল গ্রামবাসীর সংঘর্ষে আহত ৩, দোকানঘর ও বাড়িঘর ভাঙচুর
- শ্রীপুরে ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত
- শ্রীপুরে কোরবানির জন্য কেনা গরু চুরি
- শ্রীপুরে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি গ্রেপ্তার
- শ্রীপুরে ধর্ষণ মামলার ৩ আসামী গ্রেফতার
- শ্রীপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেল আরোহী নিহত, আহত ১
- শ্রীপুরে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সপ্তাহের উদ্বোধন
- সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা, জনদুর্ভোগ
মাগুরানিউজ.কমঃ
আকবর হোসেন- মাগুরার অতিচেনা সংগ্রামী এক মানুষ। মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বীরোচিত ভূমিকার কারণে মাগুরার পাশাপাশি রাজবাড়ী, ঝিনাইদহ, ফরিদপুর, কুষ্টিয়ায় তাঁর বাহিনী ‘আকবর বাহিনী’ হিসেবে পেয়েছিল স্বতন্ত্র স্বীকৃতি। একাত্তরে তাঁর বাহিনী এসব অঞ্চলে হানাদারদের বিরুদ্ধে কমপক্ষে ২৭টি সশস্ত্র যুদ্ধ অংশ নেয়। রণকৌশল, অস্ত্র সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ, যোদ্ধা নির্বাচন- সবকিছুই নিজ বিচক্ষণতায় নির্ধারণ করেছেন শ্রীপুরের ‘আকবর বাহিনী’প্রধান আকবর হোসেন মিয়া। জীবন সায়াহ্নে এসে আজও সেসব বীরত্বগাথা তাঁর স্মৃতিতে সদা দীপ্যমান।
মহান মুক্তিযুদ্ধের এই বীর সেনানীর বাড়ি মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার টুপিপাড়া গ্রামে। ১৯৩২ সালে তাঁর জন্ম। সে হিসাবে মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বয়স ছিল ৩৯ বছর। স্বাধীনতা-পূর্বকালে তিনি ছিলেন পাকিস্তান এয়ার ফোর্সের গ্রাউন্ড কমব্যাট ইনস্ট্রাক্টর। পূর্ববাংলার প্রতি পশ্চিমাদের বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে ১৯৫৪ সালের ৮ আগস্ট চাকরি ছেড়ে দেন। নিজ জেলায় ফিরে জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। বলিষ্ঠ নেতৃত্বের যোগ্যতাবলে ১৯৬৪ সালে তিনি শ্রীপুর থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হন। ১৯৬৫ সালে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন নিজ ইউনিয়ন শ্রীকোলের। রাজনীতি ও জনপ্রতিনিধিত্বের পথ ধরেই সক্রিয়ভাবে অংশ নেন ছেষট্টির ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানসহ সব আন্দোলন-সংগ্রামে।
আকবর হোসেন বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের আহ্বান হিসেবে নিয়ে নিজ এলাকায় মুক্তিবাহিনী গড়ার তাগিদ অনুভব করি। প্রাথমিক পর্যায়ে খালিয়া খড়িচাল গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য স্থাপন করি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। পালিয়ে আসা ইপিআর, পুলিশসহ ডিফেন্সের অনেকে এসে যোগ দেন এই ক্যাম্পে। আসতে থাকে এলাকার যুবকসহ সর্বস্তরের মানুষ। এ সময় অস্ত্রসংখ্যা ছিল ২৪টি। তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক ওলিউল ইসলামের মাধ্যমে কিছু অস্ত্র ট্রেনিং ক্যাম্পের জন্য পাওয়ার পর মনোবল বেড়ে যায়। এর মধ্যে খবর আসে রাজবাড়ীর রামদিয়ায় চান খাঁর নেতৃত্বে নিরীহ জনসাধারণের ওপর জুলুম-নির্যাতন চলছে। ৮০ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি বহর নিয়ে সেখানে আক্রমণ চালাই। এতে চান খাঁসহ ১০ থেকে ১২ জন বিহারি প্রাণ হারায়। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হয় চারটি অস্ত্র। ফেরার পথে কাওয়াখোলা সৈয়দ আলী বিশ্বাসের বাড়ি ও পাংশার এক শান্তি কমিটির নেতার বাড়ি থেকে আরো আটটি রাইফেল উদ্ধার হয়। পরদিন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে চান খাঁর বাড়িতে চালানো অভিযানের খবর প্রচারিত হলে আমাদের মনোবল আরো বেড়ে যায়। ২১ আগস্ট শ্রীপুর থানা দখল করে শ্রীপুরকে মুক্ত অঞ্চল ঘোষণা দিই। এ অভিযানে আমাদের সঙ্গে যোগ দেন কমপক্ষে ৪০০ সাধারণ যুবক। পরে যাঁদের মধ্য থেকে অনেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধে অংশ নেন। ২৩ আগস্ট স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এই খবর প্রচার হয়।’
আকবর হোসেন বলেন, ‘হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে আমার বাহিনীর প্রায় এক হাজার মুক্তিযোদ্ধা কমপক্ষে ২৭টি সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নেয়। যার মধ্যে নাকোল, গোয়ালপাড়া, ইছাখাদা, মিনগ্রাম, শৈলকূপা, হরিন্দি, মাশালিয়া, চতুড়িয়া, সড়ইনগর, আলফাপুর, বিনোদপুরের যুদ্ধ অন্যতম। এসব যুদ্ধে বিপুলসংখ্যক পাকিস্তানি সেনা পরাস্ত ও নিহত হয়। উদ্ধার হয় অস্ত্র ও গোলাবারুদ।
আলফাপুরে আমাদের আক্রমণে কুমার নদে ডুবে ৫০ জন পাকিস্তানি সেনা মারা যায়। ইছাখাদা রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণে ২৭ রাজাকারসহ বেশকিছু সেনা নিহত হয়। মাশালিয়া-চতুড়িয়ার যুদ্ধে মারা যায় ১৪ হানাদার সেনা। শৈলকূপা যুদ্ধে স্থানীয় জনতার সহায়তায় ৫৭টি অস্ত্র উদ্ধার হয়। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে উদ্ধার হওয়া অস্ত্র-গোলাবারুদ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নতুন নতুন দল গঠন করে ছড়িয়ে দেওয়া হয় মাগুরাসহ আশপাশের মহকুমা ও জেলাগুলোতে। রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি থানা ভবন, ওয়্যারলেস স্টেশন, রামদিয়া, সোনাপুর বিহারি ক্যাম্প ও মাগুরা শহরের আনসার ক্যাম্পে অবস্থানকারী হানাদার বাহিনীর ওপর আকবর বাহিনী আক্রমণ চালায়। মাগুরাসহ ঝিনাইদহের গাড়াগঞ্জ থেকে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পর্যন্ত এলাকা মুক্তাঞ্চল হিসেবে পুরোপুরি আমাদের দখলে ছিল।’
আকবর হোসেন বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের মূল ক্যাম্প স্থাপিত হয় খামারপাড়ায় কুমার নদের দক্ষিণে। এ ছাড়া খালিয়া-খড়িচাল, রাধানগর, নহাটা পালপাড়া, কুরুন্দিসহ পৃথক এলাকায় গড়ে ওঠে আরো কিছু ক্যাম্প। প্রাপ্তবয়স্ক মুক্তিসেনার পাশাপাশি ১৩-১৪ বছরের পাঁচ শতাধিক কিশোর এসব ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নেয়। ক্যাম্পে ঢোকার জন্য গোপন পাসওয়ার্ড সংরক্ষণ করা হতো। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আকবর বাহিনীর বীরত্বে ভীত হয়ে যশোরের পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্প থেকে আমাকে রাজাকারদের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রধান বানিয়ে নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।’
মুক্তিযোদ্ধা আকবর হোসেন জানান, তাঁর বাহিনীর সহ-অধিনায়ক ছিলেন শ্রীপুরের মোল্যা নবুয়ত আলী। এ ছাড়া শ্রীপুরের আবদুর রহিম জোয়ার্দার, মোল্যা মতিয়ার রহমান, নাজায়েত খন্দকার, সুজায়েত খন্দকার, নুরুল ইসলাম মোল্যা, মাঝাইলের সৈয়দ মারুফ ওরফে মাক্কু ভাই, বেলনগরের বদরুল আলম মোল্যা, খালিয়ার হাফিজ মাস্টার, হাবিলদার শাহজাহান, কাশিয়ানীর নান্নু মিয়া, নাকোলের আবদুল আজিজ, শ্রীকোলের আনছার উদ্দিন, কমান্ডার আয়েনউদ্দিন, সিরাজুল ইসলাম অ্যাডভোকেটসহ আরো অনেকে ছিলেন এই বাহিনীর সাহসী সহযোদ্ধা।
আকবর বাহিনী সাহসিকতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কাছ থেকে প্রশংসাসংবলিত স্বীকৃতি পেয়েছে। আকবর হোসেন জানান, সাহসিকতার জন্য তৎকালীন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ৮ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর আবুল মঞ্জুর, মেজর এস এন হুদা আকবর বাহিনীকে স্বীকৃতি দেন। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি আতাউল গনি ওসমানীর নির্দেশে ১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ডেপুটি চিফ কমান্ডার এ কে খন্দকার আকবর বাহিনীকে স্বীকৃতি দিয়ে সনদ প্রদান করেন।
এ ছাড়া ২০১১-১২ সালের জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের অষ্টম শ্রেণীর ‘বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়’ পাঠ্য বইয়ে মুক্তিযুদ্ধে এই বাহিনীর বীরত্বের কথা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অক্টোবরের শেষ দিকে মুজিব বাহিনীর সদস্যরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। এ সময় তাঁরা তোফায়েল আহমেদের লেখা একটি চিঠি আকবর হোসেনকে হস্তান্তর করেন। চিঠিতে তোফায়েল আহমেদ লেখেন- ‘আকবর ভাই, আপনি দেশের জন্য যে অবদান রেখে যাচ্ছেন তা অতুলনীয়। মুজিব বাহিনীর ছেলেদের আপনার অধীনে রাখবেন ও আপনাকে থানাপ্রধান হিসেবে ঘোষণা দিয়ে আপনার অধীনে কাজ করার জন্য ছেলেদের নির্দেশ দিয়েছি।’
পরিশেষে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘নিজে কিছু পাওয়ার জন্য যুদ্ধ করিনি। স্বীকৃতি, খেতাব এসবের জন্য কারো কাছে যাইনি। দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি, স্বাধীন দেশ পেয়েছি- এটাই বড় কথা।’


