বিস্ময়কর এক জঙ্গি নারী সুজানা

মাগুরানিউজ.কমঃ 

Nice-1415520967

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে হত্যার পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে যে নারী আসামে গ্রেফতার হয়েছেন, তার নাম সুজানা বেগম। আসামের গুয়াহাটি ইন্টারস্টেট বাস টার্মিনাল থেকে এই নারীকে আটক করে ভারতীয় পুলিশ।

সুজানা নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) সদস্য। জেএমবি নেতা ডা. শাহনুর আলমের স্ত্রী এবং পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার খাগড়াগড়ে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় মোস্ট ওয়ান্টেড ১২ জঙ্গির একজন।     

ভারতীয় জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এনআইএ) বর্ধমানের খাগড়াগড়ে বিস্ফোরণের তদন্তে নেমে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে পারে অক্টোবরের শেষ দিকে। বর্ধমানের বিস্ফোরণের পর সেখানকার অবস্থাটি দাঁড়ায় কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরোনোর মতোই। তদন্ত যত এগিয়েছে ততই চমকের পর চমক দেখছে ভারতীয় গোয়েন্দারা। পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম ঘিরে বাংলাদেশের জঙ্গিদের নেটওয়ার্ক ও কর্মকাণ্ডে থ বনে যান তারা।

সুজানা আসাম থেকে আটক প্রথম নারী জঙ্গি। আসামে শুরু করতে যাওয়া জেএমবির নারী উইংয়েরও প্রধান তিনি। আসাম পুলিশের ডিআইজি এ জে বড়ুয়া জানান, সুজানা বেগম আসামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়েদের জোগাড় করে জঙ্গি ট্রেনিং দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তিনি এবং তার স্বামী শাহনুর আলম বর্ধমানের শিমুলিয়া মাদ্রাসা থেকে জঙ্গি ট্রেনিং নিয়েছিলেন।

সুজানার স্বামী শাহনুরের মাথার দাম এনআইএ পাঁচ লাখ টাকা ঘোষণা করেছিল। স্ত্রী ধরা পড়ার পর গোয়েন্দাদের মনে হচ্ছে, তারও মাথার দাম ধরা হলে স্বামীকে সে অনায়াসে পেছনে ফেলত। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা থেকে আসাম পুলিশের বড়কর্তারা মোটামুটি নিশ্চিত, সুজানা নিছকই বরপেটার চতলা গ্রামের ফেরার হাতুড়ে ডাক্তার শাহনুর আলমের স্ত্রী নয়। বরং জিহাদি সংগঠনে হয়তো শাহনুরের থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র সে। এমনকি শাহনুরকে সে-ই জিহাদের পথে টেনে এনেছিল বলে মনে করছেন তারা।

অথচ খাগড়াগড় বিস্ফোরণের তদন্তে নেমে এই সুজানাকেও প্রাথমিকভাবে সন্দেহের তালিকাতেই রাখেননি গোয়েন্দারা! বরং বর্ধমানের মঙ্গলকোটের শিমুলিয়া মাদ্রাসায় অনুদান পাঠানোর সূত্রে শাহনুরকেই খুঁজছিল এনআইএ। হঠাৎ পুলিশ খবর পায়, দেড় বছরের ছেলেকে নিয়ে বেঙ্গালুরু পালাচ্ছেন সুজানা। তার পরেই জাল বিছিয়ে গুয়াহাটির বাস টার্মিনাস থেকে পাকড়াও করা হয় তাকে। গ্রেফতারের পর সুজানাকে টানা জেরা করতে গিয়েই অবাক হয়ে যান পুলিশ ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বাহিনীর অফিসাররা। তখনই তারা জানেন, সুজানা শুধুই জিহাদে স্বামীর ছায়াসঙ্গী ছিলেন না; তার থেকে বেশিই ছিল।

কী রকম? পুলিশ সূত্রের খবর, সুজানা ওরফে সুরজিয়া নিজে কলেজশিক্ষিত। শাহনুর গিয়েছিল শিমুলিয়া মাদ্রাসায় পড়তে। সুজানা তখন ওই মাদ্রাসাতেই জিহাদি প্রশিক্ষণ দিতেন। সেখানেই শাহনুরের সঙ্গে তার আলাপ। পুলিশের ধারণা, হয়তো সুজানাই শাহনুরকে জিহাদের পথে টেনে এনেছিলেন।

জেরা করতে গিয়ে সুজানার আরো বেশ কয়েকটি ‘গুণ’-এর কথা জানতে পেরেছে তারা। জঙ্গি প্রশিক্ষণ দেওয়া বিভিন্ন মাদ্রাসায় হাওয়ালা মারফত টাকা পাঠাতেন শাহনুর। সুজানাই সেই হাওয়ালার খুঁটিনাটি তদারক করত। ইন্টারনেটে জিহাদের স্থানীয় নেটওয়ার্ক বাড়িতে বসেই নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। মাঝে মাঝে সুজানা নিজেই পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন ঘাঁটিতে যেতেন। শিমুলিয়া মাদ্রাসাসহ একাধিক জিহাদি ঘাঁটিতে তার নামেই নিয়মিত লক্ষাধিক টাকার অনুদান পাঠানো হতো।

সুজানাকে জেরা করে বেশ কিছু ই-মেইল আইডির সন্ধান পেয়েছে পুলিশ ও এনআইএ। সেই সমস্ত আইডি খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে বরপেটায় কোন পথে টাকা আসত, তার খোঁজও চলছে। গুয়াহাটির মুখ্য বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে তোলা হলে তাকে ১৪ দিনের পুলিশ হেফাজতে দেওয়া হয়।

সুজানার সঙ্গে আসামের বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের যোগাযোগ রয়েছে বলেও জানতে পেরেছেন গোয়েন্দারা। নিরীহ গৃহবধূর ছদ্মবেশে এই ধরনের জিহাদি নারীবাহিনী গড়ে ওঠা দেখেই গোয়েন্দারা কিছুটা অবাক। তারা বলছেন, এত দিন ধরে বিভিন্ন জঙ্গি ঘাঁটিতে পুরুষদেরই দেখা গিয়েছে। কিন্তু এই সংগঠনগুলো যে নারী বাহিনীও তৈরি করেছে, সে ব্যাপারে চোখ খুলে দিল খাগড়াগড়।

বিস্ফোরণের পরেই খাগড়াগড়ের বাড়িতে পুলিশকে আটকাতে রিভলবার উঁচিয়ে তেড়ে এসেছিল আলিমা ও রাজিয়া বিবি। জেরার সময়ে নানাভাবে পুলিশকে বিভ্রান্ত করত তারা। একই ভাবে গোয়েন্দাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল নদীয়ার খানসা বিবি। সুজানার মতো খানসার স্বামী জহিরুল শেখকে খুঁজছে পুলিশ। নদীয়ার থানারপাড়ায় জহিরুলের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে ৪১টি জিলেটিন স্টিক ও প্রচুর জিহাদি কাগজপত্রের পাশাপাশি একটি ডায়েরিও মেলে। তাতে লেখা ‘রক্ত’, ‘জিহাদ’, ‘হাতে তুলে নাও তরোয়াল, একে ৪৭’-এর মতো কথাকে গজল বলে চালানোর চেষ্টা করেছিল খানসা। সে-ও প্রমীলা জঙ্গি বাহিনীর সদস্য বলে গোয়েন্দাদের দাবি। খানসাকে ইতিমধ্যেই গ্রেফতার করা হয়েছে। গোয়েন্দা সূত্রের খবর, বর্ধমানের জঙ্গি ঘাঁটির শীর্ষ চরিত্র সাজিদের স্ত্রী ফাতেমাও এই প্রমীলা বাহিনীর সদস্য। তারও সন্ধান চলছে।

গোয়েন্দাদের সন্দেহ, এ রাজ্যের বহু জেলাতেই এমন সুজানা-খানসা লুকিয়ে রয়েছে। আপাতভাবে যাদের দেখে জঙ্গি বলে মনে না হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আসলে এরা শুধু জিহাদি মগজধোলাই নয়, অস্ত্র চালাতেও পুরুষদের সঙ্গে সমানে সমানে টক্কর দিতে পারে। আর ধরা পড়ে গেলে পুলিশ-গোয়েন্দাদের কথার জালে বিভ্রান্ত করতেও তারা রীতিমতো সিদ্ধহস্ত।

তথ্যসূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

June ২০২৬
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
« May    
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০  

ফেসবুকে আমরা

বিভাগ

দিনপঞ্জিকা

June ২০২৬
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
« May    
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০  
%d bloggers like this: