মাগুরানিউজ.কমঃ
মাগুরার বড় গরু বিক্রেতাদের এবার মাথায় হাত। কোরবানি ঈদের পরের দিন মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেও তারা এসব গরুর অধিকাংশ বিক্রি করতে পারেননি। এতে জেলার চারটি উপজেলার প্রায় দেড় হাজার ব্যবসায়ী ও খামারির প্রায় ১০ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।
জানা গেছে, জেলার ব্যবসায়ীদের রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বড় পশুর হাটগুলোতে আনা বিশাল আকৃতির গরুগুলো অবিক্রীত থেকে যাওয়ায় তারা চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। এসব গরুর দাম বড় অঙ্কে হাঁকা হলেও শেষ মুহূর্তে অনেক বিক্রেতা তা একপ্রকার পানির দরে বেচে দেন। ‘স্টেরয়েড হরমোনসহ নানা রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে গরু মোটাতাজা করা হয়েছে’- গণমাধ্যমে এমন খবর প্রকাশিত হওয়ায় পশুর হাটে এর প্রভাব পড়ে। বিশাল আকারের গরু দেখার দর্শক থাকলেও ক্রেতার আগ্রহ ছিল ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর দিকে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর গাবতলী পশুর হাটে বিশাল আকৃতির একটি গরু বিক্রি করতে যান রামনগরের গরু ব্যবসায়ী লিয়াকত হোসেন। গরুটির দাম সাত লাখ টাকা হাঁকা হলেও রোববার রাতে তা মাত্র এক লাখ ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। লিয়াকত জানান, ওই গরুটির কেনা দাম, ট্রাকভাড়া, খাবার ও শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে তার সাড়ে তিন লাখেরও বেশি খরচ হয়ে গেছে। তার মতো, ৫০ জনেরও বেশি ব্যাপারী লাভের আশায় ওই হাটে বড় গরু নিয়ে এ রকম বিপাকে পড়েন বলেও জানান লিয়াকত।
শেষ মুহূর্তে অনেক বিক্রেতা ২৫-৩০ হাজার টাকা দাম কমিয়ে দিয়েও এসব মোটা গরু বিক্রি করতে পারেননি বলে জানা গেছে। হাটভেদে লাখ টাকারও বেশি দামের গরু ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন বলে তারা জানান।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ‘স্টেরয়েড, ডেক্রামিথাসন, বিটামিথাসন ও হাইড্রোকর্টিসনের মতো মারাত্মক হরমোন গরু মোটাতাজাকরণে ব্যবহার হচ্ছে’- ঈদের আগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে এমন খবর প্রকাশিত হয়। এসব গরুর মাংস স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বলেও ওই সব খবরে জানানো হয়। ফলে সাধারণের মধ্যে এই ধারণাই সৃষ্টি হয় যে, বড় গরু মানেই হরমোন দেওয়া পশু। আর এতেই হাটগুলোতে বড় বড় গরু নিয়ে আসা ব্যবসায়ীরা বিপুল লোকসানের মুখে পড়েন।
বিগত বছরগুলোয় বড় গরুতে বেশি মুনাফা হলেও এবার অবস্থা ভিন্ন। হাটের জৌলুসও বাড়াত এসব পশু। কোন গরুটির দাম সবচেয়ে বেশি, তা-ও মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার করা হতো; কিন্তু এবারে ঘটেছে উল্টো ঘটনা। মিডিয়ার জনবান্ধব ভূমিকার কারণে এ বছর কোরবানির পশু ক্রেতারা সচেতন হয়েছিলেন।
গরু ব্যবসায়ী মহিদুল ইসলাম জানান, তিনি ২০টি গরু নিয়েছিলেন চট্টগ্রামের মিরসরাই হাটে। বিক্রি করেছেন মাত্র ৯টি, তাও কম দামে। এতে তার লোকসান হয়েছে প্রায় ২ লাখ টাকা।
মাগুরার চারজন বড় গরুর ব্যাপারী জানান, রাজধানীর গাবতলী, উত্তরার আজমপুর, বনানী, কমলাপুর, আগারগাঁও, শনির আখড়া এবং নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জ ও খান সাহেব স্টেডিয়াম পশুর হাটে বড় গরুর কোনো ক্রেতা ছিল না। অনেকেই এসব বিশাল আকৃতির গরু দেখতে আসেন, ছবি তোলেন, কিন্তু কেনেন না। এতে আমাদের মতো শত শত ব্যবসায়ী পুঁজি বাঁচিয়ে বাড়ি ফিরতে পারেননি।
তারা আরো বলেন, পশুর হাটে যেসব বিক্রেতা বড় গরু নিয়েছিলেন তাদের অনেকেই কান্নাকাটি করেছেন। পানির দরে বিক্রির চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে এসব পশু ফিরিয়ে এনেছেন তারা।
মাগুরা সদরের বাসিন্দা আবদুর রউফ শ্রীপুরের লাঙ্গলবান্দ হাট থেকে হাসিলসহ ৬০ হাজার টাকায় একটি বড় গরু কিনেছিলেন। অথচ স্থানীয়রা বলছেন, এর বাজারমূল্য কমপক্ষে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা।
তবে এ বছর দেদার বিক্রি হয়েছে মাঝারি ও ছোট গরুগুলো। বিক্রেতারাও বেশ খুশি। কারণ, ভালো দাম পেয়েছেন তারা।
এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মাগুরার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. কানাই লাল স্বর্ণকার জানান, বড় আকৃতির গরু কৃত্রিমভাবে রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে মোটাতাজা করা হয়েছে। এই গরু বিক্রি না করেও উপায় থাকে না। কারণ, বিষাক্ত রাসায়নিকের ব্যবহারে মারাত্মক শারীরিক জটিলতা তৈরি হওয়ায় এসব গরু একপর্যায়ে এমনিতেই মারা যায়। তা ছাড়া, বড় আকৃতির একেকটি গরু ফিরিয়ে নিতেও খরচ হয় আট থেকে ১০ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে শেষ মুহূর্তে এক প্রকার পানির দরেই এসব গরু বিক্রিতে বাধ্য হন ব্যবসায়ীরা।
তিনি আরো জানান, গরু মোটাতাজা করতে স্টেরয়েড, ডেক্রামিথাসন ও বিটামিথাসনের মতো মারাত্মক হরমোন ব্যবহার করা হয়, তা এতটাই মারাত্মক যে গোশত রান্নার পরও এর প্রতিক্রিয়া নষ্ট হয় না।
তাই এসব মানুষের কিডনি, লিভারসহ বিভিন্ন স্পর্শকাতর অঙ্গে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এতে মানুষের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গিয়ে বিভিন্ন প্রাণঘাতী রোগের সৃষ্টি করে।


