মাগুরানিউজ.কমঃ
তিনি ছিলেন মানুষ মানুষের জন্য, বিস্তীর্ণ দুপারে, আমি এক যাযাবর, সাগর সঙ্গমেসহ আরো অনেক জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা। গায়ক, সুরকার ও কবি অনেক গুণে গুণান্বিত তিনি। আবার তিনি রাজনীতিকও। তবে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন মানবতাবাদী। আর মানবতাবাদীদের কাছে তার গান আজ স্লোগান। তিনি ভূপেন হাজারিকা। উপমহাদেশের প্রখ্যাত এই সংগীতশিল্পীর ৩য় মৃত্যুদিবস আজ। ২০১১ সালের ৫ নভেম্বর কিংবদন্তিতুল্য এই শিল্পীকে আমরা হারিয়েছি। মহান শিল্পীকে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
জয় নবজাত বাংলাদেশ,/ জয় জয় মুক্তিবাহিনী / ভারতীয় সৈন্যের সাথে রচিলে / মৈত্রীর কাহিনী। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে এই গানটি গেয়েছিলেন ভূপেন হাজারিকা। বাংলা ও বাংলাদেশের প্রতি অসম্ভব ভালবাসা ছিল তার। আনন্দবাজার পত্রিকায় এক মন্তব্যে বলা হয়, বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতের পরই সবচেয়ে জনপ্রিয় গান হিসাবে মনোনীত হয় ভূপেন হাজারিকার গান ‘মানুষ মানুষের জন্য’।
কিংবদন্তি এই কণ্ঠশিল্পীর জন্ম আসামে ১৯২৬ সালে। মাত্র ১২ বছর বয়সেই স্বীকৃতি পায় তার গান। তখন অসমীয়া ভাষায় নির্মিত একটি চলচ্চিত্রের জন্য ওই গানটি তিনি গেয়েছিলেন। পরবর্তীতে বাংলা এবং হিন্দি ভাষায় সংগীত পরিবেশন করে উপমহাদেশে নিজের আসন পোক্ত করেন। তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে দিগ্বিদিক। ভারতীয় চলচ্চিত্র ও সংগীতে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭৭ সালে ভারত সরকারের পদ্মশ্রী ও ২০০১ সালে পদ্মভূষণ খেতাব জয় করেন ভূপেন হাজারিকা।
ভূপেন হাজারিকা ছিলেন উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত। তিনি ছিলেন পিএইচডি ডিগ্রিধারী। নিজেকে তিনি ‘যাযাবর` ঘোষণা করেছিলেন। বাংলাভাষীদের কাছে তার জনপ্রিয়তা প্রবাদতুল্য। অসংখ্য জনপ্রিয় গানের কারিগর এই শিল্পীর দরাজ কণ্ঠে গাওয়া গানগুলো সব প্রজন্মের মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে।
শেষ জীবনে ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল বিজেপিতে যোগদান করেন ভূপেন হাজারিকা। রাজনীতির মাঠে অবশ্য খানিকটা বিতর্কেও জড়িয়ে পড়েন তিনি।
গান যে শুধু শোনারই জিনিস নয়, উপলব্ধির ও বোঝার উপকরন-এটা বুঝাতে সমর্থ হয়েছিলেন ভূপেন হাজারিকা। তার কিছু সৃষ্টি অবিস্মরণীয়। গভীর মন্দ্রস্বর ও কেতাদুরস্ত শব্দচয়ন এর জন্য তিনি পৃথিবী বিখ্যাত। ভূপেন হাজারিকা তার ব্যারিটোন কণ্ঠস্বর ও কোমল ভঙ্গির জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তার রচিত গানগুলি ছিল কাব্যময়। গানের উপমাগুলো তিনি প্রণয়-সংক্রান্ত, সামাজিক বা রাজনৈতিক বিষয় থেকে তুলে আনতেন। তিনি আধুনিকতার ছোঁয়া দিয়ে লোকসঙ্গীত গাইতেন।
বাংলাদেশ, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়। অসমীয়া ভাষা ছাড়াও বাংলা ও হিন্দি ভাষাতেও তিনি সমান পারদর্শী ছিলেন এবং অনেক গান গেয়েছেন। ভূপেন হাজারিকার গানে মানবপ্রেম, প্রকৃতি, শোষণ, নিপীড়ন, নির্যাতনের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদী সুর উচ্চারিত।
তার কিছু গানের শিরোনাম এরকম- ‘আজ জীবন খুঁজে পাবি’, ‘আমি এক যাযাবর’, ‘আমায় ভুল বুঝিস না’, ‘একটি রঙ্গীন চাদর’, ‘ও মালিক সারা জীবন’, ‘গঙ্গা আমার মা’, ‘ প্রতিধ্বনি শুনি’, ‘চোখ ছলছল করে’, ‘মেঘ থমথম করে’, ‘দোলা হে দোলা’ ইত্যাদি। জীবদ্দশায়ই ২০০৯ সালে গোয়াহাটিতে তার ভাস্কর্য তৈরি করে অল আসাম স্টুডেন্টস্ ইউনিয়ন।
ফাইবার গ্লাস ও অন্যান্য পদার্থ সহযোগে চমকপ্রদ `ড. ভূপেন হাজারিকা ভাস্কর্য` তৈরি করেন আসামের ভাস্কর্যশিল্পী বিরেন সিংহ। ভূপেন হাজারিকা তার সৃষ্টিশীল কর্মের জন্য যুগের পর যুগ স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। বিশেষ করে বাংলা ভাষাভাষি জনমানসে তিনি অমর হয়েই থাকবেন।


