মাগুরানিউজ.কমঃ
শিক্ষক স্বল্পতা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও আবাসন সমস্যাসহ নানা ধরণের সংকটে ভুগছে মাগুরার সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ সরকারি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ। এতে কলেজটিতে অনার্স পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
অপরদিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রেগুলেশন অনুযায়ী শিক্ষক স্বল্পতার কারণে মাস্টার্স কোর্স চালুর অনুমোদন মিলছে না। যে কারণে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণেচ্ছু সাধারণ শিক্ষার্থীরা পড়ছে বিপাকে।
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ইসলামী ইন্টারমিডিয়েট কলেজ নামে ১৯৪০ সালে এ প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু হয়। পরে ১৯৫৭ সালে কলেজটি স্নাতক পর্যায়ে যাত্রা শুরু করে। ১৯৭৯ সালে কলেজটি সরকারীকরণ করা হয় এবং নাম পরিবর্তন হয়। পরবর্তিতে ১৯৯৭-১৯৯৮ শিক্ষাবর্ষে কলেজটিতে বাংলা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা, প্রাণিবিদ্যা ও পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স চালু হয়। ২০০৬-২০০৭ সালে কলা, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য এই তিনটি অনুষদে- ইংরেজি, অর্থনীতি, দর্শন, ইসলামি শিক্ষা, ইসালামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, রসায়ন, উদ্ভিদ বিজ্ঞান, গণিত, হিসাব বিজ্ঞানসহ মোট ১৪টি বিষয়ে অনার্স চালু হয়।
বর্তমানে মাধ্যমিক, স্নাতক ও অনার্সে অধ্যায়নরত কলেজের ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ৫ হাজার ৩১৭ জন। যার গোটা শিক্ষা কার্যক্রম চলছে মাত্র ৪৬ জন শিক্ষক দিয়ে। বাংলা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, আরবি ও ইসলামি শিক্ষা বিভাগ, পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে দুইজন, গণিত, রাসায়ন, হিসাব বিজ্ঞান, অর্থনীতি, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে তিনজন করে শিক্ষক দিয়ে চলছে বিভাগগুলোর গোটা শিক্ষা কার্যক্রম।
এ ছাড়া অন্যান্য বিষয়গুলিতেও রয়েছে শিক্ষক স্বল্পতা। আর পরিসংখ্যান ও কম্পিউটর বিভাগে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী থাকলেও এ দুই বিভাগে কোনো শিক্ষক নেই। শিক্ষক স্বল্পতার কারণে অনেক সময় জেলার বিভিন্ন বেসরকারি কলেজের শিক্ষকদের এনে অতিথি শিক্ষক হিসেবে পাঠ দান করানো হয়। মাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ের জন্য ২৩ টি কর্মচারী পদ থাকলেও ১০টি পদ দীর্ঘ দিন ধরে শূন্য রয়েছে। কলেজটিতে শিক্ষক, কর্মচারী সংকটের পাশাপাশি একাডেমিক ভবন, শিক্ষক ডর্মেটরি, ছাত্রাবাসসহ নানা আবাসন সমস্যা রয়েছে। ১৪টি বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু হলেও এ জন্য নির্মিত হয়নি কোনো বাড়তি একাডেমিক ভবন। মাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ে পুরাতন ভবনগুলোতেই চলছে অনার্সসহ গোটা শিক্ষা ব্যবস্থা।
বাংলা তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ইসতিয়াক আহমেদ জানান, ক্লাসরুম ও শিক্ষক স্বল্পতার কারণে নিয়মিত ক্লাস হয় না। প্রতিদিন তিনটি করে ক্লাস হওয়ার কথা থাকলেও মাত্র একটি ক্লাস হয়।
বিবিএ’র তৃতীয় বর্ষের ছাত্র মেহেদী হাসান মিঠু বলেন, ক্লাসরুম সংকটের কারণে বিশেষ করে অনার্স পর্যায়ের ছাত্র-ছত্রীরা পড়েছেন বিপাকে। অধিকাংশ সময় স্নাতক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাস কোর্সের শিক্ষার্থীদের সাথে গাদাগাদি করে এক সঙ্গে ক্লাস করতে হয়। অনেক শিক্ষার্থী ক্লাস রুমে জায়গা না পেয়ে বারান্দায় দাড়িয়ে ক্লাস করতে বাধ্য হতে হয়। ক্লাসরুম সংকটের কারণে পাস ও অনার্স পর্যায়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের ক্লাস অনেক সময় বন্ধ থাকে। কলেজ ক্যাম্পাসে ছাত্রদের জন্য একটি কমন রুম থাকলেও ব্যবহারে অনুপযোগী হওয়ায় তা থাকে তালাবদ্ধ। ছাত্রীদের জন্য নেই কোনো কমন রুম।
তিনি আরো বলেন, বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের একটি বিজ্ঞানাগার থাকলেও সেখানে নেই কোনো আধুনিক যন্ত্রপাতি। নামে মাত্র একটি লাইব্রেরি থাকলেও লাইব্রেরিয়ান ও সহকারী লাইব্রেরিয়ানের দুটি পদই শূন্য। কলেজে কোনো ক্যান্টিন না থাকায় টিফিনের জন্য শিক্ষার্থীদের বাইরে যেতে হয়। শিক্ষকদের জন্য নেই কোনো আবাসন ব্যবস্থা। ছাত্রদের জন্য একটি মাত্র হোস্টেল থাকলেও ছাত্রীদের কোনো হোস্টেল নেই। ফলে গ্রাম পর্যায় থেকে আসা শিক্ষার্থীদের শহরে উচ্চমূল্যে বাসা ভাড়া করে থাকতে হয়। এ ক্ষেত্রে ছাত্রীরা নানা ধরনের ভোগান্তির শিকার হয়।
বাংলা প্রথম বর্ষের (পুরাতন) ছাত্রী সুবর্ণা খাতুন ও মঞ্জু খাতুন জানান, মহিলা হোস্টেল না থাকায় তাদেরকে প্রতিদিন শ্রীপুর উপজেলার ছাবিনগর গ্রাম থেকে এসে ক্লাস করতে হয়। যানবাহন সমস্যার কারণে বাড়ি থেকে কলেজে আসতে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় লাগে। এ জন্য তাদের প্রতিদিন ৫০টাকার উপরে খরচ হয়।
একই বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র সদরের রাঘবদাইড় গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম ও শ্রীপুর উপজেলার বরিশাট গ্রামের এনামুল হক জানান, একটিমাত্র ছাত্রাবাসে পর্যাপ্ত সিট না থাকায় তাদের প্রতিদিন দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে কলেজে আসতে হয়। এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি পড়াশুনারও ব্যাঘাত ঘটে।
কলেজ ছাত্রলীগের আহ্বায়ক মুক্তারুল কাইয়ুম হিল্লোল বলেন, বিগত দিনে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনসহ অধিকার আদায়ের সকল আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল মাগুরা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ। কিন্তু দীর্ঘ দুই যুগ কলেজে কোনো ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয় না। পাশাপাশি দীর্ঘকাল ধরে কলেজটিতে খেলাধুলা ও সংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নেই বললেই চলে।
অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক নূর ইসলাম বলেন , এ কলেজটিতে শিক্ষার্থী ভর্তির চাপ অনেক বেশি। আশপাশের জেলার কলেজগুলোতে অনার্সে সিট খালি থাকলেও এখানে কোনো ডিপার্টমেন্টেই সিট খালি থাকে না। প্রচুর সম্ভাবনা থাকা সত্বেও এ কলেজটি নানা সংকটে ভুগছে। বর্তমানে এ কলেজটিতে মাস্টার্স কোর্স চালু করা খুবই জরুরি। নানা কারণে এ জেলার অনেক শিক্ষার্থীর পক্ষেই বাইরে গিয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করা সম্ভব হয়ে উঠে না। যে কারণে তারা উচ্চ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বারবার আবেদন করলেও অবকাঠামোগত সমস্যা ও শিক্ষক সংকটের কারণে মাস্টার্স কোর্স চালু হচ্ছে না বলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ লিখিতভাবে জানিয়েছে।
তবে তিনি মনে করেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এ সংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্তা ব্যক্তিরা একটু নজর দিলেই মাস্টার্স কোর্স চালু সময়ের ব্যাপার মাত্র।
কলেজ অধ্যক্ষ প্রফেসর এলিয়াছ হোসেন শিক্ষক স্বল্পতা, ক্লাস রুম সংকট, আবাসন সমস্যাসহ সকল সমস্যার কথা স্বীকার করে বলেন, এ সব সমস্যার সমাধানের জন্য আমরা বিভিন্ন সময়ে সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে অবহিত করেছি। আশার ব্যাপার হচ্ছে অচিরেই একাডেমিক ভবন ও হোস্টেলসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় ভবন নির্মাণ কাজ শুরু হবে।



