মাগুরানিউজ.কমঃ
পুলিশের কড়া নিরাপত্তার মধ্যেও মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলার বালিদিয়া ইউনিয়নের বড়রিয়া গ্রামের লোকজন চরম আতঙ্কে রয়েছেন। তারা পুনরায় প্রতিপক্ষের হামলার আশঙ্কা করছেন।
এর আগে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় একটি মামলা হলেও কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। ধ্বংসস্তুপে পরিণত হওয়া এই গ্রামটি এখন পুরুষ শূন্য। গ্রামে কাজী ও সরদার গোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধের জের ধরে পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
গ্রামের বাড়িঘরে লোকজন নেই, তালাবদ্ধ। কিছু ঘরবাড়ি পাহারা দিচ্ছেন বৃদ্ধ নারী শিশু ও আত্মীয়স্বজনেরা। সর্বত্র আতঙ্ক ও উৎকন্ঠা বিারজ করছে। শিশু-বৃদ্ধদের চোখে মুখে ভয়ের ছাপ। সাংবাদিক পরিচয় দিলেও তারা সামনে এসে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন না। অনেকেই সংসারের বাকি মালপত্র ও গবাদিপশু নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়েছেন।
গৃহস্থালি সামগ্রীর সবকিছু লুট ও বিনষ্ট হয়েছে। বাড়ির নলকূপ থেকে শুরু করে পানি খাওয়ার পাত্রটি পর্যন্ত নিয়ে গেছে প্রতিপক্ষের লোকজন। পাশের গ্রামের স্বজনদের পাঠানো রান্না করা খাবার খেয়ে বৃদ্ধ নারী-শিশুরা কোনমতে দিন পার করছেন। আসবাপত্র, মূল্যবান গৃহস্থালী সামগ্রী খাল-পুকুরসহ বিভিন্ন জায়গায় আছড়ে ফেলা হয়েছে। সর্বত্র পোড়া পোড়া গন্ধ। পুরুষরা এলাকা ছেড়ে যাওয়ায় ক্ষেত-খামার, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা কর্মকান্ডে স্থবিরতা নেমে এসেছে। শিক্ষার্থী শিশুদের বইপত্র নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তারা পড়তে পারছে না। গবাদি পশুও খাবার পাচ্ছে না।
পূর্ব বিরোধের মামলা তুলে না নেওয়ায় সোমবার সকাল পৌনে ৮টার দিকে বড়রিয়া গ্রামের আতিয়ার কাজী গ্রুপ ও শাহজান সরদার গ্রুপের হামলা-পাল্টা হামলায় ৩০টি বসত ঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। এসব ঘরে থাকা অন্তত অর্ধকোটি টাকার সম্পদ লুট ও বিনষ্ট হয়েছে। ঘরে অগ্নিসংযোগও করা হয়েছে। রেহাই পায়নি গাছ-পালাও। হামলা-পাল্টা হামলায় উভয়পক্ষের অন্তত ২৫জন আহত হয়েছেন।
পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ৩৩ রাউ- ফাঁকা গুলিবর্ষণ করেছে। মাগুরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ঘটনাস্থল পরিদর্শণ করেছেন।
সরেজমিন ঘটনাস্থলে গিয়ে জানা গেছে, বড়রিয়া গ্রামের বাসিন্দা আতিয়ার কাজীর যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ছেলে সাহাবুর রহমান কাজীর বিয়ে হয় একবছর আগে। গ্রাম্য দলাদলির কারণে প্রতিবেশি শাহজান সরদারের লোকজনকে দাওয়াত না দেওয়ায় তারা ক্ষুব্ধ হন। বিয়ের আগের রাতে বাড়ির সামনের কাপড়ের তোরণ কে বা কারা পুড়িয়ে দেয়। এই ঘটনায় আতিয়ার কাজী প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে শাহজান সরদার ও তার লোকজনকে আসামি করে মামলা করেন। মামলাটি এখন আদালতে বিচারাধীন।
গত রোববার সকালে শাহজান সরদারের লোকজন আতিয়ার কাজীর বাড়িতে এসে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য বলেন। এ নিয়ে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে তারা আতিয়ার কাজী ও তার পরিবারের ১২ জনকে কুপিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করেন। এই পরিবারের নারী ও বৃদ্ধসহ সাত সদস্য এখন মহম্মদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন।
গত দিনের এই ঘটনার জের ধরে শাহজান সরদারের লোকজন সোমবার সকাল পৌনে ৮টার দিকে আতিয়ার কাজী ও তার ভাইদের বাড়িঘরে হামলা চালায়। তারা ব্যাপক ভাংচুর ও লুটপাট করে। এই খবর ছড়িয়ে পড়লে বড়রিয়া পাশ্ববর্তী মৌশা ও নিখোড়হাটা গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ এগিয়ে এসে সরদার বংশের লোকদের বাড়িঘরে ব্যাপক হামলা ও লুটপাট চালায়।
হামলা-পাল্টা হামলায় শাহজান সরদার, কাইউম সরদার, মইন সরদার, মুজিবর সরদার, ইমদাদ সরদার, রকিব সরদার, জাহাঙ্গির সরদার, মার্কিন সরদার, আরজু সরদার, আবজাল কাজি, আতিয়ার কাজি, আনোয়ার কাজি ও আকরাম কাজির ৩০টি ঘর সম্পূর্ণ মাটিতে মিশে গেছে।
এসব ঘর থেকে অন্তত অর্ধকোটি টাকার সম্পদ লুট ও বিনষ্ট করা হয়েছে। আগুন দেওয়া হয়েছে শাহজান সরদারের একটি ঘরে। রেহাই পায়নি গাছ-পালাও।
হামলায় উভয়পক্ষের অন্তত ২৫জন আহত হয়েছেন। গুরুতর আহত সামাদ (৩২), লাল মিয়া (৪৮), ডলার (২৮), রমজান (১৭) ও ইফিলকে (৩৫) মহম্মদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে অবস্থাসম্পন্ন এসব পরিবারের ঘর থেকে মোটরসাইকেল, টিভি, ফ্রিজ, আসবাবপত্র, ক্রোকারিজ, জামা-কাপড় থেকে শুরু করে স্বর্ণালঙ্কার ও মূল্যবান জিনিসপত্র লুট ও নষ্ট করেছে প্রতিপক্ষের লোকজন। মূল্যবান জিনিসপত্র খালের পানিতে ফেলে নষ্ট করা হয়েছে। হামলার সময় বাড়িতে থাকা নারী-শিশুদের উপর শারীরিক নির্যাতন চালানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। হামলা-পাল্টা হামলায় প্রায় অর্ধকোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হয়েছে বলে অনেকেই বলেছেন।
এ ঘটনায় বিবদমান দুটি পক্ষই পরস্পরকে দায়ী করেছে। এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। পুনরায় হামলার জন্য প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে। এলাকায় চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেককেই পরিবার-পরিজন ও মূল্যবান মালপত্র নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিতে দেখা গেছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় দুই প্লাটুন পুলিশ ও ব্যাটালিয়ন আনসার মোতায়েন করা হয়েছে।
এই ঘটনায় শতাধিক লোককে আসামি করে আনোয়ার কাজী বাদী হয়ে মহম্মদপুর থানায় একটি মামলা করেছেন। তবে পুলিশ এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করতে পারেনি। হামলার প্রতিশোধ হিসেবে পাল্টা হামলা হতে পারে বলে জোর গুজব রয়েছে।
মাগুরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান ঘটনাস্থলে অবস্থান করছেন। তিনি বলেছেন, ‘পরিস্থিতি এখন কিছুটা শান্ত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ তৎপর রয়েছে।



