মাগুরানিউজ.কমঃ
‘বাংলাদেশ’, ‘ওরে সালেকা ওরে মালেকা’ কিংবা ‘আলাল ও দুলাল’ এই গানগুলোর সুরের মূর্ছনায় যিনি আমাদের বার বার মুগ্ধ করেছেন, তিনি আজম খান৷
মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী কয়েক দশক তরুণদের বিনোদনের মূল খোরাক ছিল আজম খানের পপ সংগীত৷ আর এ কারণেই তাকে বলা হয় বাঙালির ‘পপগুরু’৷
মানুষের মনের কোঠায় তিনি পপগুরু বা পপসম্রাট হিসেবেই জায়গা করে নিয়েছেন৷ তিনি ছিলেন একাধারে গীতিকার, সুরকার ও গায়ক৷ বাংলাদেশে পপ সংগীতের অন্যতম পথপ্রদর্শক তিনি৷ তার পপ আঙ্গিকের সংগীত বাংলাদেশের যুব সমাজের কাছে পেয়েছে বিপুল সমাদর৷ পশ্চিমা ধাঁচের পপগানে দেশজ বিষয় সংযোজন করে আজম খান বাংলা পপ গানের জগতে এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে আবির্ভুত হোন।
১৯৮২ সালে ‘এক যুগ’ নামে আজম খানের প্রথম অডিও অ্যালবাম বাজারে আসে। তার একক অ্যালবাম সংখ্যা ১৭ এবং দ্বৈত ও মিশ্র অ্যালবাম ২৫টির বেশি। বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে কনসার্ট পরিবেশন করেন আজম খান৷ এসব কনসার্টে শুধু প্রবাসী বাঙালিই নয়, বহু বিদেশী সংগীতানূরাগীরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তিনি৷ বাংলা সংগীতের নানা ধারার গান পপ আঙ্গিকে গেয়েছেন আজম খান৷ তার জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে – বাংলাদেশ, ওরে সালেকা ওরে মালেকা, আলাল ও দুলাল, অনামিকা, অভিমানী, আসি আসি বলে ইত্যাদি।
গানের জগত ছাড়াও আজম খান অভিনয় জগতে ‘গড ফাদার’ নামক একটি বাংলা সিনেমায় ভিলেনের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। এ ছাড়াও তিনি বেশ কিছু বিজ্ঞাপন চিত্রেও মডেল হয়েছিলেন।
খেলাধুলাতেও সমানভাবে পারদর্শী ছিলেন তিনি। ১৯৯১—২০০০ সালে তিনি গোপীবাগ ফ্রেন্ডস ক্লাবের পক্ষ হয়ে প্রথম বিভাগ ক্রিকেট খেলতেন।
আজম খান একজন মুক্তিযোদ্ধাও ছিলেন। একাত্তরে মাত্র ২১ বছর বয়সে যুদ্ধে অংশ নেন আজম খান৷ মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকায় সংঘটিত কয়েকটি গেরিলা অভিযানে তিনি অংশ নেন। মূলত বাবার অনুপ্রেরণায় তিনি মুক্তিযুদ্ধে যাবার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। আজম খান ছিলেন দুই নম্বর সেক্টরের একটা সেকশনের ইনচার্জ। তার নেতৃত্বে সংঘটিত ‘অপারেশন তিতাস’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অপারেশনের লক্ষ্য ছিল ঢাকার কিছু গ্যাস পাইপলাইন ধ্বংস করে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল (বর্তমান রুপসী বাংলা হোটেল) এবং হোটেল পূর্বাণীর গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটানো। যুদ্ধে তিনি তার বাম কানে আঘাতপ্রাপ্ত হোন। যা পরবর্তীতে তার শ্রবণক্ষমতায় বিঘ্ন ঘটায়। যুদ্ধের মাঠেও থেমে থাকেনি তার সংগীত সাধনা। তার গাওয়া গান প্রশিক্ষণ শিবিরে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণ যোগাতো।
আজম খানের জন্ম ১৯৫০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় আজিমপুরের এক সরকারি কোয়ার্টারে৷ তার আসল নাম মোহাম্মদ মাহবুবুল হক খান৷ বাবা আফতাব উদ্দিন খান ছিলেন সরকারের সচিবালয়ের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, মা জোবেদা বেগম একজন সংগীত শিল্পী।
বাংলাদেশের পপগানের গুরুখ্যাত কিংবদন্তি এ শিল্পীর আজ চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী। চার বছর আগে এই দিনটিতে তিনি চিরতরে চলে যান। দীর্ঘদিন ক্যান্সারে ভুগে এই গুণী শিল্পী ২০১১ সালের ৫ জুন ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।


