খেজুরের রস সংগ্রহে মাগুরার গাছিরা পার করছেন ব্যস্ত সময়

মাগুরানিউজ.কমঃ

52dfc683aa389-1

খেজুরের রস সংগ্রহে মাগুরার গাছিরা পার করেছেন ব্যস্ত সময়। মাটির ভাড় (ঠিলে) সংগ্রহ, ‘দা’ ধার, ‘গাছি দড়া’, নলি ও খিল তৈরিতে ব্যস্ত সময় কাটছে তাদের। বৌ-ঝিদেরও নেই অবসর। চলছে পিঠা-পায়েস তৈরির সরঞ্জাম জোগাড়ের তোড়জোড়।

দেশে খেজুরের কোনো উন্নত জাত নেই। এ নিয়ে তেমন কোনো গবেষণাও কোনোদিন হয়নি। ইরাক, ইরান, সৌদি আরবে যে উন্নত জাতের খেজুর গাছ জন্মে, তা থেকে কেবল খেজুরই উৎপাদন হয়। তবে ‘শুষ্কং কাষ্ঠং’ এরকম একটি বৃক্ষ থেকে সুমিষ্ট রসও যে বের করে আনা যায়, এ গবেষণাটি আমাদের এ অঞ্চলে কে, কবে প্রথম করেছিল, তা এখন আর জানা যায় না।
এখানে খেজুর গাছ থেকে মূলত রস সংগ্রহ করা হয়। খেজুর গাছের ৫-৬ বছর বয়স থেকে শুরু করে ২৫-৩০ বছর বয়স পর্যন্ত রস দেয়। মাঝ বয়সী গাছ থেকে বেশি রস পাওয়া যায়। অন্য গাছের তুলনায় দোআঁশ ও পলি মাটিতে জন্মানো গাছে বেশি রস হয়। রস আহরণের জন্য সাধারণত আশ্বিন মাস থেকে গাছ প্রস্তুত (গাছ কাটা) করা শুরু হয়। রস পাওয়া যায় ফাল্গুন পর্যন্ত। রসের মান ও পরিমাণ যেমন প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে, তেমনি গাছির দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ওপরও নির্ভর করে। একবার গাছ কাটার পর ২-৩ দিন রস পাওয়া যায়। প্রথম দিনের রসকে স্থানীয়ভাবে বলে জিরেন রস। এই জিরেন রস স্বাদে ও মানে অনন্য। জিরেন রস দিয়েই তৈরি হয় উন্নতমানের গুড় ও পাটালি। দ্বিতীয় দিনে পাওয়া রসকে দোকাট ও তৃতীয় দিনের রসকে তেকাট বলে। এই রস দিয়ে তৈরি হয় ঝোলা গুড়।

রসের জন্য গাছ একবার কাটার পর ৫-৬ দিন বিশ্রাম দেয়া হয়। রোদে কাটা অংশ শুকিয়ে গেলে আবার ওই অংশ চেঁচে রস সংগ্রহ করা হয়। আর এ কারণেই সাধারণ খেজুর গাছ পূর্ব ও পশ্চিম দিকে কাটা হয়, যাতে সূর্যের আলো সরাসরি ওই কাটা অংশে পড়তে পারে। বৃহত্তর যশোরের মধ্যে খাজুরার গুড়-পাটালি বেশি বিখ্যাত। এখানকার দক্ষ কারিগররা যে গুড়-পাটালি তৈরি করেন তা দেখতে অনেকটা মিছরির মতো এবং লালচে বর্ণের। পাটালির সারা শরীর কাঁচের মতো মোটা দানায় পরিপূর্ণ থাকে। এই পাটালির বাইরের অংশ শক্ত মনে হলে ভেতরটা থাকে রসে টইটুম্বুর।

গাছি আবদুর রহিম জানান, আশ্বিনের শেষের দিকে খেজুর গাছকে প্রস্তুত করতে হয় রস আহরণের জন্যে। গাছের বাকল কেটে গেছে ‘গাছ তোলা’ হয়। গাছ তোলা শেষে গাছ কাটার পালা। কোমরে মোটা দড়ি বেঁধে ধারালো গাছিদা দিয়ে সপ্তাহে নির্দ্দিষ্ট দিনে গাছ কেটে রস আহরণ করা হয়।

রস পেতে হলে কিছু কাজ করতে হয়। গাছের উপরিভাগের নরম অংশকে কেটে সেখানে বসিয়ে দেয়া হয় বাঁশের তৈরি নালা। গাছের কাটা অংশ থেকে চুইয়ে চুইয়ে রস এনে নল দিয়ে ফোটায় ফোটায় জমা হয় ভাঁড়ে। প্রথম রস একটু নোনা। গাছি এক কাটের পর বিরতি দেন। কিছুদিন বিরতির পর আবার কাটেন। এবারের রস সুমিষ্ট, সুগন্ধে মৌ মৌ সারাদিক। এর সুবাস আর স্বাদ দিতে ভিড় জমায় পিঁপড়া, মৌমাছি, পাখি, কাঠবিড়ালী। এই রসের নামই নলেন রস।

এ অঞ্চলের মানুষ রস দিয়ে তৈরি করেন নানা ধরণের পিঠা। গুড় দিয়েও তৈরি হয়। পিঠার পাশাপাশি বানানো হয় নানা ধরনের পাটালি। আকৃতি, রং ও স্বাদের দিকেও থাকে ভিন্নতা। এখানকার মানুষ নারিকেলের পাটালি বিশেষ পছন্দ করেন। যে পাটালি পাঠানো হয় তাদের স্বজন আত্মীয় পরিজনকে। এসব ছাপিয়ে যায় একটি পাটালিতে। আর এই বিশেষ ধরণের পাটালি কেবল এখানকার কারিগররাই বানাতে পারেন। এখানকার মানুষ বংশানুক্রমে এ পাটালি তৈরি করে আসছেন।

কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. রওশন আলী বলেন, এই অঞ্চলের মাটি সাধারণত বেলে দোঁ-আশ। আর পানিতে লবণাক্ততা নেই। ফলে গাছের শিকড় অনেক নিচে পর্যন্ত যেতে পারে। সব মিলিয়ে জলবায়ু উপযোগী যশোরের খাজুরা, বাঘাপাড়া, মাগুরার শালিখায় খেজুরের রস সুগন্ধি ও সুস্বাদু হয়ে থাকে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

September ২০২৬
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
« Aug    
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০  

ফেসবুকে আমরা

বিভাগ

দিনপঞ্জিকা

September ২০২৬
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
« Aug    
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০  
%d bloggers like this: