মাগুরানিউজ.কম:
সিলেটের রাজনের ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই পৈশাচিক নির্যাতনে প্রাণ গেল রাকিব (১৩) নামে খুলনার আরেক শিশুর। মোটরসাইকেলের চাকায় হাওয়া দেওয়ার কমপ্রেসার মেশিনের মাধ্যমে সোমবার বিকেলে তার মলদ্বার দিয়ে বাতাস ঢোকানো হয়। এতে পেটের নাড়ি ও ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে রাতেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় রাকিব।
নগরীর ব্যস্ততম টুটপাড়া কবরখানা মোড়ে প্রকাশ্যে এমন ঘটনায় হতবাক এবং ক্ষুব্ধ এলাকার মানুষ। নৃশংস এই হত্যার বিচার দাবিতে সোমবার রাত থেকেই বিক্ষোভ শুরু করেন তারা। রাতেই মোটরসাইকেল গ্যারেজের মালিক শরীফ (৩০), তার কর্মচারী মিন্টু খানকে (৩৫) গণপিটুনি দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেন স্থানীয়রা। পুলিশ ঘটনাস্থলে থাকা শরীফের মা বিউটি বেগমকেও আটক করে। আটক বিউটি বেগমকে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে আদালতে পাঠিয়েছে পুলিশ। মামলার প্রধান আসামি শরীফ ও মিন্টু গণপিটুনির শিকার হয়ে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রিজন সেলে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
এদিকে রাকিব হত্যার ঘটনায় আটক তিনজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন রাকিবের বাবা ট্রাকচালক নূর আলম। মামলার তদন্ত মনিটরিং করতে তিন সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করেছে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি)।
নগরীর টুটপাড়া সেন্ট্রাল রোডে শওকত হোসেনের টিনশেড বাড়ির একটি কক্ষ ভাড়া থাকত রাকিবরা। তার বাবা সাতক্ষীরা জেলায় ট্রাক চালান। মা লাকী বেগম অন্যের বাসায় কাজ করেন। বছর দুয়েক আগে রাকিবকে টুটপাড়া কবরস্থান মোড়ে শরীফের মোটরসাইকেলের গ্যারেজে (শরীফ মটরস) কাজে লাগিয়ে দেন তার বাবা। তার মজুরি ছিল প্রতিদিন ৫০ টাকা। তাও ঠিকমতো দিত না শরীফ। আর একটু-আধটু ভুল হলে গালাগাল তো ছিলই। এ অবস্থায় চার মাস আগে শরীফের গ্যারেজ ছেড়ে রাকিব পিটিআই মোড়ের নূর আলমের গ্যারেজে কাজ নেয়। এতে ক্ষিপ্ত হয় শরীফ।
সোমবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে রাকিব কবরখানা মোড়ে রঙ কিনতে গেলে শরীফ তাকে ধরে নিয়ে যায়। পরে গ্যারেজ ছাড়ার কারণ জানতে চায় এবং রাকিবকে মারধর করে। রাকিব গালাগাল দিতে বারণ করলে শরীফ ক্ষিপ্ত হয়ে মিন্টুকে রাকিবের প্যান্ট খুলে ফেলতে নির্দেশ দেয়। একপর্যায়ে মাটিতে ফেলে রাকিবের মলদ্বারে কমপ্রেসারের পাইপ ঢুকিয়ে মেশিন ছেড়ে দেয়। মুহূর্তের মধ্যেই রাকিবের শরীর ফুলে গিয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। তখন তাকে প্রথমে গুডহেলথ ক্লিনিক ও পরে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ১০টায় রাকিব মারা যায়।
চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে খুলনা থানার ওসি সুকুমার বিশ্বাস জানান, শিশু রাকিবের শরীরে অস্বাভাবিক পরিমাণ বাতাস প্রবেশ করানোর কারণে তার পেটের নাড়িভুঁড়ি ছিঁড়ে যায়, ফুসফুস ফেটে যায়। এ ছাড়া তার শরীরের বিভিন্ন অর্গান অকেজো হয়ে যাওয়ায় সে মারা যায়।
তিনি জানান, রাকিবের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এলাকাবাসী। তারা গ্যারেজ থেকে শরীফ ও মিন্টুকে ধরে বেদম পিটুনি দেয়। পরে পুলিশ তাদের উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রিজন সেলে নিয়ে যায়। ঘটনাস্থল থেকে শরীফের মা বিউটি বেগমকে আটক করা হয়। দুপুরে আসামি বিউটি বেগমকে আদালতে পাঠিয়ে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা থানার এসআই কাজী মোস্তাক আহমেদ। আদালত আগামীকাল বৃহস্পতিবার রিমান্ডের শুনানির দিন ধার্য করেছেন।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে রাকিবের মরদেহ গতকাল দুপুর পৌনে ৩টায় তার পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আসরের নামাজের পর তাকে টুটপাড়া কবরস্থানে দাফন করা হয়।
এদিকে নির্মম এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মঙ্গলবার হত্যা মামলা করেছেন রাকিবের বাবা নূর আলম। মামলায় নগরীর টুটপাড়া কবরখানা মেইন গেট এলাকার বাসিন্দা গ্যারেজ মালিক শরীফ, তার কর্মচারী টুটপাড়া দিলখোলা রোড এলাকার আসাদ সাহেবের বাড়ির ভাড়াটিয়া মিন্টু খান ও শরীফের মা বিউটি বেগমকে আসামি করা হয়েছে।
পৈশাচিক এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে নগরীতে বিক্ষোভ হয়েছে দিনভর। সকাল ৯টার দিকে স্থানীয় লোকজন গ্যারেজসহ ওই ভবনে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। কিছু সময় পর টুটপাড়া সেন্ট্রাল রোডের দুই পাশে ব্যানার ঝুলিয়ে এবং বেঞ্চ রেখে সড়ক অবরোধ করা হয়। দিনভর গ্যারেজ ও রাকিবের বাড়ির সামনে পুলিশ মোতায়েন ছিল।


