আলোর দিশারী “স্বর্ণকিশোরী” এবং একজন “ফারজানা ব্রাউনিয়া”

মাগুরানিউজ.কম:

MN

রাজীব মিত্র জয়-

ফারজানা ব্রাউনিয়া। একজন আলোর দিশারী। দেশজুড়ে কিশোরীদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন  “স্বর্ণকিশোরী” নেটওয়ার্ক। কাজ করছেন তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অধিকার নিয়ে। সেই সাথে চ্যানেল আই প্রতি সপ্তাহে “স্বর্ন-কিশোরী” অনুষ্ঠানটি প্রচার করছে। ফলে কিশোরীরা আজ নিজেদের সমস্যা গুলো দ্বিধাহীন ভাবে বলতে শিখছে, অবিভাবকরা হচ্ছেন সচেতন। আর এসবই সম্ভব হচ্ছে ফারজানা ব্রাউনিয়ার অদম্য প্রচেষ্টার কারনে। স্বর্ণকিশোরী নিয়ে অনেক স্বপ্ন ব্রাউনিয়ার। জানালেন, দেশের প্রতিটি কিশোরী সঠিক ভাবে বিকশিত হোক এটাই তার স্বপ্ন। আর এ লক্ষে তিনি বাংলাদেশের দুই কোটি কিশোরীদের সবচেয়ে বড় নেটওয়ার্ক “স্বর্ণকিশোরী” গড়ার কাজে নিরলস কাজ করে চলেছেন।

বয়ঃসন্ধিতে একজন কিশোরীর শরীর ও মনে ঘটে নানান পরিবর্তন। কিন্তু একটা সময়ে আমাদের দেশের কিশোরীরা কোন ভাবে বিষয়গুলো শেয়ার করতে পারছিলো না তাদের পরিবার বা আপনজনের সাথে। ঠিক সেই মূহুর্তে দেশের সব কিশোরীর পাশে এসে দাড়িয়েছেন “ফারজানা ব্রাউনিয়া”।

কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ গণমাধ্যমে স্বাস্থ্যখাতে উন্নয়ন মূলক অবদানের জন্য ফারজানা ব্রাউনিয়াকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে একাধিকবার জাতীয় স্বাস্থ্য সম্মাননা দেয়া হয়েছে।

ফিরে দেখা-

অজপাড়া গাঁয়ের এক স্কুল ছাত্রী। যে কখনো পিরিয়ডের সময় স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করার সুযোগ পায়নি। বৃষ্টি বাদলার দিন চারদিকে স্যাঁতসেতে পরিবেশ। বাড়িতে পিরিয়ডে ব্যবহার্য কাপড় শুকানোর কোন জায়গাই নেই। সমাজ মেয়েদের শিখিয়েছে পিরিয়ড লজ্জাজনক সুতরাং এই সময় রাখঢাক করে চলতে হবে। যদিও পিরিয়ড কোন লজ্জাজনক পরিস্থিতি কিংবা অসুস্থতা নয়, এটি নারীর শরীরের স্বাভাবিক একটি চক্র। কিন্তু মেয়েটি তো আর সেটা জানে না। কি আর করা! ঘরের এক কোণে বেড়ার সাথে মেয়েটি শুকানোর জন্য কাপড়টি মেলে দেয়। পরেরদিন ঐ কাপড় ব্যবহার করে স্কুলে যাওয়ার পর সে খারাপবোধ করতে থাকে। শিক্ষককে অসুস্থতার কথা জানালে উল্টো ধমক দিয়ে তাকে বসিয়ে দেয়া হয়। কিছুক্ষণ পর মেয়েটি বেঞ্চ থেকে পরে যায়। চিকিৎসকের কাছে নেয়ার পরে পরীক্ষা নিরীক্ষাকালীন সময়ে মেয়েটির অকাল মৃত্যু হয়। চিকিৎসক যখন মৃত্যুর কারনটা জানতে পারেন তখন হতবাক হয়ে যান। আলট্রাসাউন্ড করে চিকিৎসক মেয়েটির শরীরে জোঁকের অস্তিত্ব টের পান। বেড়ার সাথে মেলে দেয়া পিরিয়ডের কাপড়টিতে জোঁক বাসা বেঁধেছিল। সেটি মেয়েটির শরীরে প্রবেশ করে। মর্মান্তিক এই ঘটনাটি ঘটেছে মেহেরপুর জেলায়।

আমাদের সমাজে কিশোরী মেয়েরা যে কতটা স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে আছে তা এ ঘটনা থেকে সহজেই অনুমান করা যায়। এই মৃত্যুর জন্য দায়ী কিন্তু মেয়েটি নিজে নয়। প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে ছোট্ট মেয়েটি ছিল পুরো অন্ধকারে। অন্ধকারকে ধীরে ধীরে জোঁনাকির আলোয় ভরিয়ে দিতে সে নিজের পাশে কাউকেই পায়নি।

আমাদের সমাজের প্রেক্ষিতে এই গল্পটি নতুন না। কৈশোরে প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে তথ্য বিভ্রাট কিংবা জটিলতায় পড়েনি এমন মেয়ে আমাদের সমাজে খুব কমই আছে।

সময়ের জয়গান-

লক্ষ লক্ষ কিশোরী মনের অজ্ঞতা ও স্বাস্থ্যগত জটিলতার বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে লড়াই করতেই জন্ম হয় “স্বর্ণকিশোরী”র। স্বর্ণকিশোরী সেই জন যে সবরকম বিভ্রান্তিকে দুরে সরিয়ে স্বাস্থ্যগত তথ্যে সমৃদ্ধ একজন প্রাজ্ঞ কিশোরী। একজন স্বর্ণকিশোরী প্রতিনিধিত্ব করবে সমাজকে। তাকে অনুসরণ করবে তার চারপাশের কয়েক হাজার কিশোরী।

স্বর্ণকিশোরী ক্যাম্পেইনের মূল ভাষ্য হলো- কিশোরী সুস্বাস্থ্য এবং নিরাপদ মাতৃত্ব। আর তাই স্বাস্থগত প্রাথমিক বিষয়াদি সম্মন্ধে কিশোরীদের সজাগ করা হবে যারা ভবিষ্যতে নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করবে।

প্রাথমিক বিষয়ের মধ্যে আছে স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার। স্যানিটারি প্যাডকে নারীর সুস্বাস্থ্যের যুগান্তকারী আবিস্কার বলা হয়। পিরিয়ডের সময় শুধুমাত্র স্যানিটারি প্যাড ব্যবহারের মাধমেই একজন কিশোরী হাজারটা অসুখ থেকে মুক্ত থাকতে পারবে। এই তথ্যটি সর্বস্তরের কিশোরীদের জানাবে একজন স্বর্ণকিশোরী। প্রয়োজনে এই খাতে ভর্তুকি প্রদান করা হবে। অস্বাস্থ্যকর কাপড় ব্যবহারের কারণে অপ্রতিরোধ্য নানা অসুখ মেয়েরা সারাজীবন বহন করে যার প্রভাব পরে মাতৃত্বকালীন সময়ে।

“স্বর্ণকিশোরী” নেটওয়ার্ক-

“কিশোরী সুস্বাস্থ্যে বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক” এই স্লোগান নিয়ে স্বর্ণকিশোরীর যাত্রা শুরু হয় ২০১৩ সালে। স্বর্ণকিশোরী নেটওয়ার্ক প্রধান ফারজানা ব্রাউনিয়া জানান, স্বর্ণকিশোরী ক্যাম্পেইনকে সামনে রেখে তারা ২০১৫-২০১৯ মোট পাঁচ বছর মেয়াদী একটি নেটওয়াকিং প্রকল্পের পরিকল্পনা করেছেন।

স্বর্ণকিশোরী প্রথম বছরে ১০,০০০ কিশোরীকে নেটওয়ার্কের অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং ৪টি আদিবাসী গোষ্ঠীর ১,০০০ কিশোরীকে এই নেটওয়ার্কে নিয়ে এসেছে। স্বর্ণকিশোরীর পাঁচ বছর মেয়াদী প্রকল্পের প্রথম বর্ষের আয়োজন থেকে মোট ২০ জন স্বর্ণকিশোরীকে পেয়েছে দেশ। এরা সবাই বিভাগীয় পর্যায় থেকে উঠে এসেছে। এখন থেকে ক্রমান্নয়ে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদ এবং প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে নেটওয়ার্কিং করা হবে।

আগামী পাঁচ বছরে দুই কোটির ওপরে স্বর্ণকিশোরী বের হয়ে আসবে। তাদেরকে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। একেকজন স্বর্ণকিশোরীর তত্ত্বাবধানে থাকবে ১৫০০ জন করে ফলোয়ার। ফলোয়াররা সবাই কিশোরী বয়সী। স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কোন জিজ্ঞাসা থাকলে কিশোরী মেয়েরা নিজেদের পাশে স্বর্ণকিশোরীকে পাবে।

জানালেন, দেশব্যাপি স্বর্ণকিশোরী তৈরির এই মহতী আয়োজনের সাথে সহযোগিতায় আছে ব্যুরো হেলথ এডুকেশন, ইনসেপটা, ওয়েল গ্র“প এবং চ্যানেল আই।

প্রথম মেয়াদ শেষ হবার পর স্বর্ণকিশোরী শুরু করবে ২০২০-২০২৪ সাল পর্যন্ত আরো পাঁচ বছর মেয়াদি বৃহৎ পরিকল্পনা। এই সময়ে নেটওয়ার্কের অর্ন্তভূক্ত স্বর্ণকিশোরীদের ই-হেলথ প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। প্রত্যেক স্বর্ণকিশোরী তার নিজ নিজ ফলোয়ারদের ই-হেলথ প্রক্রিয়ায় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করবে। হুটহাট প্রয়োজনে ডাক্তারের কাছে না গেলেও ফলোয়াররা পাশে পাবে তথ্য সমৃদ্ধ স্বর্ণকিশোরীকে। আর এভাবেই তথ্য সমৃদ্ধ হবে ফলোয়ার কিশোরীরাও। ভবিষ্যতে হয়তো থাকবে না মাতৃত্বকালীন মৃত্যু। দেখতে হবে না ভগ্ন স্বাস্থ্যের কোন মাকে। বলিষ্ঠ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে গর্জে উঠবে হাজার হাজার স্বর্ণকিশোরী এমনটাই প্রত্যাশা করেন ফারজানা ব্রাউনিয়া। 

অভিনন্দন ফারজানা ব্রাউনিয়াকে তার স্বর্ণকিশোরী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আলোর দিশারী হয়ে দেশের সব কিশোরীদের পাশে দাড়াবার জন্য। 

 

লেখক- সম্পাদক, মাগুরা নিউজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

September ২০২৬
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
« Aug    
 ১২৩৪৫৬
৭৮৯১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০  

ফেসবুকে আমরা

বিভাগ

দিনপঞ্জিকা

September ২০২৬
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
« Aug    
 ১২৩৪৫৬
৭৮৯১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০  
%d bloggers like this: