মাগুরানিউজ.কম:
তুচ্ছ ঘটনার অজুহাতে কখনো শরীরে ঢালতো গরম পানি আবার কখনো ছুরি বা বটি দিয়ে কুপিয়ে আমাকে করেছিলো জখম। আর চড় থাপ্পড় তো ছিল প্রতিদিনের বিষয়। হাসপাতালের বেডে শুয়ে-শুয়েই এভাবে আহাজারি করতে থাকে ১২ বছর বয়সী শিশু গৃহকর্মী খাদিজা।
এভাবে দীর্ঘ ১৫ মাসের নির্যাতনের চিহ্ন নিয়ে ঢাকার রকিবুল ইসলাম হিরো নামে এক ব্যাক্তির বাসায় বন্দিদশা থেকে পালিয়ে মাগুরায় নিজ বাড়িতে ফিরে এসেছে ১২ বছর বয়সের খাদিজা নামে এক গৃহকর্মী। শনিবার সকালে পরিবারের সদস্যরা খাদিজাকে মাগুরা সদর হাসপাতালে ভর্তি করেছেন। রকিবুল ইসলাম বর্তমানে আইন মন্ত্রণালয়ের কর্মরত। তিনি মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার বরুলিয়া গ্রামে আব্দুল রশিদ ফকিরের পুত্র।
মাগুরার শালিখা উপজেলার বাগডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা দিনমজুর সলেমান সর্দারের স্ত্রী ডালিম বেগম বলেন, তার মেয়ে খাদিজাকে অভাব-অনটনের কারনে দেড় বছর আগে গ্রাম্য প্রতিবেশি আবুল বাশারের মাধ্যমে ঢাকায় রকিবুল ইসলাম নামে এক ব্যাক্তির বাসায় মাসিক ১০০০ টাকা চুক্তিতে কাজে দেওয়া হয়। তার পর থেকে মেয়ের সাথে তাদের আর কোন যোগাযোগ নেই। রকিবুল ও তার স্ত্রীর মোবাইলে ফোন করলে তারা কখনো ফোন ধরেননি। প্রতিবেশি আবুল বাশারের কাছে মেয়র খোজ নিলে তিনি বলেন খাদিজা ভাল আছে। অবশেষে ১৫ মাস পরে শনিবার ভোরে মেয়ে অসুস্থ অবস্থা পালিয়ে বাড়ি এসেছে।
খাদিজা জানায়, কাজে যোগ দেওয়ার পর থেকে রকিবুলের উত্তরা ও বসুন্ধরার দুটি বাসায় তাকে রান্না ছাড়াও সব ধরনের কাজ করতে হতো। এ সময় তুচ্ছ অজুহাতে প্রদিনই তাকে চড়, থাপ্পড়, শরীরে গরম খুনতির ছ্যাকা ও গরম পানি ঢালা হতো। দিনে একবার পঁচাপান্তা খাবার দেওয়া হত। সর্বশেষ প্রায় দুই মাস আগে খাদিজার হাতের কনুইয়ের পাশে বটি দিয়ে ও কয়দিন পরে ধারালো ছুরি দিয়ে কুপিয়ে জখম করেন রকিবুলের বদমেজাজী স্ত্রী শামীমা জাহান সুমি। হাসপাতালের বেডে শুয়ে খাদিজা তার হাতের শুকিয়ে যাওয়া ক্ষত স্থানগুলো দেখিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে।
খাদিজা জানায়, অবশেষে নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে বৃহস্পতিবার রাতে উত্তরার বাসার গার্ডকে ১০ টাকা দিয়ে একটি পাউরুটি কিনতে পাঠিয়ে কৌশলে পালিয়ে পরদিন সাভার এসে বাসে উঠে মাগুরা ফিরে আসি। খাদিজা তার উপর নির্যাতনের দৃষ্ঠান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছে।
তবে খাদিজার মা ডালিম বেগম বলেন, তারা আমার মায়ের শরীরতে সব রক্ত ঝরায় ফেলিছে। আমি এর সঠিক বিচার চাই।
মাগুরা সদর হাসপাতালের চিকিৎসক মোহাইমানুল হক বলেন, খাদিজার শরীরের ওল্ড ইনজুরি আছে। তবে বর্তমানে সে সুস্থ্য। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অভিজ্ঞ চিকিৎসকেরা দেখে তার শারীরক অবস্থার ব্যাপারে রিপোর্ট দেবেন।
খাদিজার বাবা সলেমান সর্দার ও মামা বকুল মিয়া জানান, আমরা মামলা করার সাহস পাচ্ছি না। বিভিন্ন মহল থেকে মামলা না করতে চাপ দেওয়া হচ্ছে। প্রভাবশালীরা ভয় দেখিয়ে বলছে মামলা করলে কিছু হবে না। বরং কিছু টাকা নিয়ে বিষয়টি মিমাংসা করে ফেলা ভাল। আইনজীবিসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি রফিকুলের পক্ষ নিয়ে শালিস মিমাংসার কথা বলে একটি অফিসে বেলা ৩ টা পর্যন্ত দেন দরবার করেছে। আমরা টাকার কাছে বিক্রি হয়নি। এখন মামলা করবো।
জেলা মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক কাজী লাবনী জামান ও আইনজীবি সুরাইয়া পারভীন বলেন, আইনী সহায়তা প্রদানের জন্য ভিকটিমের পরিবারের সাথে কথা হয়েছিল। কিন্তু বেলা ৩ টা পর্যন্ত বসে থাকলেও নির্যাতিতা শিশু খাদিজার অভিভাবক বাবা ও মামাকে পাওয়া যায়নি। তাদের হাসপাতাল থেকে কারা ডেকে নিয়ে গেছে। পরে জানতে পারি মামলা না করার জন্য চাপ দিয়ে তাদের মিমাংসা বৈঠকে বসানো হয়েছে।
সদর থানার ওসি মুন্সি আছাদুজ্জামান বলেন, মাগুরা সদর হাসপাতালে ভর্তি শিশুটির শরীরের নতুন কোন নির্যাতনের চিহৃ নেই। তবে শরীবে পুরাতন দাগ রয়েছে।
পুলিশ সুপার এহসান উল্লাহ বলেন, নির্যাতনের বিষয়ে তার পরিবারের পক্ষ থেকে কোন অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। অভিযোগ পেলে এ বিষয়ে আইন তার সঠিক গতিতে চলবে।

