দশ কোটি টাকা লোকসান; মাগুরায় গো খামারিদের স্বপ্ন ভঙ্গ

মাগুরানিউজ.কমঃ 

Cow20141013130633

মাগুরার গরু খামারি ও ব্যবসায়ীরা কোরবানীর গরু বিক্রিতে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।এতে জেলার চারটি উপজেলার প্রায় দেড় হাজার ব্যবসায়ি ও খামারির প্রায় দশ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।

জানা গেছে, জেলার ব্যসায়ীদের রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বড় পশুহাটগুলোতে আনা বিশাল আকৃতির গরুগুলো অবিক্রীত থেকে যাওয়ায় তারা চরম ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছেন। এসব গরুর দাম বড় অঙ্কে হাঁকা হলেও শেষ মুহূর্তে অনেক বিক্রেতা তা এক প্রকার পানির দরে বেচে দেন। ‘স্টেরয়েড হরমোনসহ নানা রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে গরু মোটাতাজা করা হয়েছে’- গণমাধ্যমে এমন খবর প্রকাশিত হওয়ায় পশুহাটে এর প্রভাব পড়ে। বিশাল আকারের গরু দেখার দর্শক থাকলেও ক্রেতার আগ্রহ ছিল ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর দিকে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর গাবতলী পশুহাটে বিশাল আকৃতির একটি গরু বিক্রি করতে যান রামনগরের গরু ব্যবসায়ি লিয়াকত হোসেন। গরুটির দাম সাত লাখ টাকা হাঁকা হলেও রোববার রাতে তা মাত্র এক লাখ ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। লিয়াকত জানান, ওই গরুটির কেনা দাম, ট্রাকভাড়া, খাবার ও শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে তার সাড়ে তিন লাখেরও বেশি খরচ হয়ে গেছে। তার মতো, পঞ্চাশ জনেরও বেশি ব্যাপারী লাভের আশায় ওই হাটে বড় গরু নিয়ে এ রকম বিপাকে পড়েন বলেও জানান, লিয়াকত।

শেষ মুহূর্তে অনেক বিক্রেতা ২৫-৩০ হাজার টাকা দাম কমিয়ে দিয়েও এসব মোটা গরু বিক্রি করতে পারেননি বলে জানা গেছে। হাট ভেদে লাখ টাকারও বেশি দামের গরু ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন বলে, তারা জানান।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ‘স্টেরয়েড, ডেক্রামিথাসন, বিটামিথাসন ও হাইড্রোকর্টিসনের মতো মারাত্মক হরমোন গরু মোটাতাজাকরণে ব্যবহার হচ্ছে’- ঈদের আগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে এমন খবর প্রকাশিত হয়। এসব গরুর মাংস স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বলেও ওইসব খবরে জানানো হয়। ফলে সাধারণের মধ্যে এই ধারণাই সৃষ্টি হয় যে, বড় গরু মানেই হরমোন দেয়া পশু। আর এতেই হাটগুলোতে বড় বড় গরু নিয়ে আসা ব্যবসায়ীরা বিপুল লোকসানের মুখে পড়েন।

অনেকেরই রয়েছে ব্যাংকের চড়া সুদের ঋণ। গোখাদ্যের মূল্য বেশি হওয়ায় তারা কোরবানীর গরু ফেরত এনে পড়েছেন বিপাকে। এবার বিপর্যয়ের মূল কারণ হিসেবে স্থানীয়রা মিডিয়ার অপপ্রচারকে বেশি দায় করছেন।

গো-খামারি এবং ব্যবসায়ীদের মতে, দেশে বিগত ১০ বছরের বেশি সময় ধরে দেশে গরু মোটা তাজাকরণের মাধ্যমে পশু উৎপাদনে যে রেকর্ড তৈরি হয়েছিল, অসাধুপন্থায় মোটা তাজাকরণকারীদের বিরুদ্ধে প্রচারণার ধাক্কা সে রেকর্ডে আঘাত হেনেছে। তার ধাক্কা বিপর্যস্ত হয়েছেন সাধারণ গো-খামারিরাও।

বিগত বছরগুলোয় বড় গরুতে বেশি মুনাফা হলেও এবার অবস্থা ভিন্ন। হাটের জৌলুশও বাড়াতো এসব পশু। কোন গরুটির দাম সবচে’ বেশি তা-ও মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার করা হতো; কিন্তু এবারে ঘটেছে উল্টো ঘটনা। মিডিয়ার জনবান্ধব ভূমিকার কারণে এ বছর কোরবানির পশু ক্রেতারা সচেতন হয়েছিলেন।

মাগুরা সদরের আলমগীর হোসেন, শ্রীপুরের সাগর হোসেন, শালিখার রোস্তম মিয়ার কণ্ঠে তাই শোনা গেল হতাশার কথা। তারা অবশ্য বললেন, এবার তাদের বেশ ভালো শিক্ষা হয়েছে। আগামীতে তারা এ দিকে লক্ষ্য রাখবেন।

গরু ব্যবসায়ি মহিদুল ইসলাম জানান, তিনি ২০টি গরু নিয়েছিলেন চট্রগ্রামের মীরসরাই হাটে। বিক্রি করেছেন মাত্র ৯টি, তাও কম দামে। এতে তার লোকসান হয়েছে প্রায় দুই লাখ টাকা।

তারা আরো বলেন, পশুহাটে যেসব বিক্রেতা বড় গরু নিয়েছিলেন তাদের অনেকেই কান্নাকাটি করেছেন। পানির দরে বিক্রির চেষ্টা করেও, ব্যর্থ হয়ে এসব পশু ফিরিয়ে এনেছেন তারা।

মাগুরা সদরের বাসিন্দা আব্দুর রউফ শ্রীপুরের লাঙ্গলবান্দ হাট থেকে হাসিলসহ ৬০ হাজার টাকায় একটি বড় গরু কিনেছিলেন। অথচ স্থানীয়রা বলছেন, এর বাজারমূল্য কমপক্ষে এক লাখ ২০ হাজার টাকা।

ঈদের পর এলাকায় ঘুরে ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি বাড়িতেই কৃষক এবং খামারিদের পরিবারের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে বিষন্নতা। পরিবারগুলোর সদস্যদের সাথে কথা বলে চাপা কান্নার সুর লক্ষ্য করা গেছে। এই কোরবানীকে ঘিরে এলাকার হাজার হাজার কৃষক পরিবারের মাঝে হাজারো স্বপ্ন ছিল কিন্তু কোরাবানীর হাটের বেচা বিক্রি মন্দার কারনেই সব স্বপ্নই যেন মুহুর্তে ভেঙ্গে গেছে।

এদের কারোর ব্যাংক ও এনজিওর ঋণ পরিশোধ, গো-খাদ্যের দোকানের বাকী মেটানো, ছেলে মেয়ের বিয়ে, সুন্নাতে খাতনাসহ পারিবারিক নানান সমস্যা মেটানো কিন্তু আজ সব কিছু শুধু স্বপ্নই থেকে গেল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

August ২০২৬
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
« Jul    
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১  

ফেসবুকে আমরা

বিভাগ

দিনপঞ্জিকা

August ২০২৬
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
« Jul    
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১  
%d bloggers like this: