জীবনটাই মাটি

মাগুরানিউজ.কমঃ 


file (1)

সবুজ নিসর্গে ঘেরা একটি গ্রাম গঙ্গারামপুর। মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলার সাত নম্বর ইউনিয়ন গ্রাম। এই গ্রামের বুকের ভেতর দিয়ে বইছে নদী ‘নবগঙ্গা’। গ্রামের উত্তরে মাগুরার দূরত্ব ২৮ কিলোমিটার, দক্ষিণে নড়াইল ২১ কিলোমিটার। এই গ্রামে সব সম্প্রদায়ের, সব পেশার মানুষ বাস করে। এই গ্রামের বিশেষ ঐতিহ্য ১৯০০ সালে প্রতিষ্ঠিত গঙ্গারামপুর ‘প্রসন্নকুমার উচ্চ বিদ্যালয়’। চারপাশের বিশাল জনপদ শিক্ষিত হয়েছে এই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে। মহান মুক্তিযুদ্ধে এই গ্রামের রয়েছে বিশেষ অবদান।

মৃৎশিল্প বাংলাদেশের অন্যতম আদি পেশা। মৃৎপাত্রের ব্যবহার প্রাচীন কাল থেকে চলে আসছে। শিলালিপি ও পুরাকীর্তিতে এদেশের মৃৎশিল্পের নানা পরিচয় মেলে। এদেশের মৃৎশিল্পের গুণগত মানও নানা ভাবে প্রশংসিত। পথ পরিক্রমায় এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা শৈল্পিক উৎকর্ষ। এই শিল্পের ব্যবহার বৈচিত্র্য ক্রমশ সম্প্রসারিত হচ্ছে।

গঙ্গারামপুর একটি প্রাচীন জনপদ। নবগঙ্গা নদীর পূর্বপাড়ে কুমোর বা পাল পাড়া। এ গাঁয়ে ওরা আদিবাসী। এই পেশাও আদি পেশার অন্যতম। নতুন সভ্যতা গড়ার মত মাটিকে ওরা নানা আকার দেয়, শরীর বানায়। চল্লিশোর্ধ্ব গীতা পাল জানালেন, প্রজন্ম ধরে তারা মাটির কাজ করেন। শিক্ষার আলো তারা বড় একটা পায় না। রাষ্ট্র বড় কোন খবর নেয় না। গণতন্ত্রের ভোট তাদের বড় একটা কাজে লাগে না। দিনরাত তাদের শরীর কাজ করে। ওদের অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যত যেন একই সুতায় বাধা।

প্রবীণতম তারাপদ পাল বললেন, কাজ এবং কাজই তাদের জীবন। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তারা কাজ করে যান। তাদের ভোর হয় সূর্য ওঠার অনেক আগে। এই আঁধারি ভোরে ওরা যায় দূর বিলে। ঝাঁকা ভর্তি করে আনে এঁটেল মাটি। শরীর ঘামে আর মাটি-কাদায় চটচট করে। তার পর বের হয় জঙ্গল ঘাটতে। ঘুরে-ঘুরে জোগাড় করে নাড়া, সুপারির খোলা, মরা কলার পাতা, কাঁচা আশ্শালি বেত, বাঁশের মুথা, কাঠ ইত্যাদি জ্বালানি। এসব পঁয়শালে আগুনের খাদ্য। সব কুড়িয়ে পাওয়া যায় না, বাড়িবাড়ি গিয়ে কিনতে হয়। নৌকা নিয়ে নদীর ওপারে যেতে হয়।

তারপর তিনি জানালেন, কী করে শুরু হয় মাটি-পানি-কাদার যুদ্ধ। হাতে-পায়ে মাটি ছেনে কাদা করে। পি-পি- কাদা চাকে তোলে, শক্ত পেশিতে বাঁশের ডগা দিয়ে চাকা ঘুরায়, দু’হাতের তালু-আঙ্গুল দিয়ে সূক্ষ নিরিখে হাড়ি কলসি গড়ে এবং সেগুলো রোদে শুকায়, আগুনে পুড়ায়। শকানো হাড়িগুলো খুব কৌশলে সাজাতে হয় পঁয়শালে। খড়-নাড়া ও কাদা – মাটির পুরুট প্রলেপে পাঁজা ঢাকতে হয়। পঁয়শালের মুখের ভেতরে ঢুকে সারাক্ষণ জ্বাল দিতে হয়। চুলোর ভেতরে আগুন গন্গন্ করে। পাঁজার উপরে কাদা মাটির প্রলেপ ফুঁড়ে বের হয় পাঁজা-পাঁজা কালো ধূঁয়ো। ধূঁয়োয় চারপাশের এলাকা আচ্ছন্ন হয়ে যায়। রাত বাড়ে। পাঁজার পেটের ভেতরে গনগনে আগুনে মাটি আর তাদের শরীর পুড়ে পুড়ে গড়ে ওঠে মৃৎশিল্পের নানা শরীর।

তরূন গৌতম পাল জানালেন, এভাবেই পোড়া মাটি আর ছাই থেকে বের হয় বাংলার মৃৎশিল্প। গৃহস্থলির নানা তৈজসপত্র। তৈজসপত্রের মধ্যে আছে হাড়ি কলসি,ঘট,মালশা,ঝাঁলর,ঝালা-চাঁচ-ঢাকুন-শানকি-থালা-কাপ-বদনা-ধুপদানি প্রভৃতি। মাটি দিয়ে তৈরি হয় নানা রকম ফল-পশু-পাখি, শিশুদের খেলনা এবং নানা আকারে পুতুল। আবার পূজোর সময় তারা তৈরি করে প্রতিমা। আর নানা রং দিয়ে এদের শরীরকে ছোট বড় নানা নকশায় সাজায়।

আরেক মহিলা কর্মী জবারাণী পাল বললেন, তারা এ পেশায় নারী-পুরুষ একত্রে কাজ করেন। কোন শ্রম বিভাজন নেই। কুমোরদের মৃৎ কারখানাও দেখার মত। প্রশস্ত খোলা ঘরে নানা আয়োজন, নানা উপকরণ। হয়তো একপাশে মেয়েরা কাদা বানায়, অন্য দিকে পুরুষেরা চাক ঘুরায়। কাজের ফাঁকে একত্রে বসে তারা আহার সেরে নেয়।

উত্তম পাল জানালেন কী করে এগুলো বেচা-কেনা হয়। বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় এই মৃৎপাত্রগুলো বেচা-কেনা চলে। স্থানীয় ও পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোর হাটে হাটে যেয়ে বিক্রি করা হয়। নৌকায় নদীপথে পরিবহণ করা হয়। বতরে ধান বিনিময় করে তারা বেচাকেনা করে। তবে গ্রামীণ মেলায় বেচাকেনা ভালো হয়। অনেক ক্রেতা বাড়ি এসেও অনেক কিছু কেনা কাটা করে।

উমাপদ পাল বেশ আক্ষেপ করে জানান, অনেক প্রতিকূলতা পেরিয়ে এই গ্রামীণ শিল্প আজও মৃতপ্রায় টিকে আছে। এই শিল্পের সামনে নানা ভাবে আধুনিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এই গ্রামের কুমোর সম্প্র্রদায়ের মধ্যে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগে নি। প্রাচীন পদ্ধতিই তারা চালু রেখেছেন। রাষ্ট্রীয় কোন পৃষ্টপোষকতা নেই। সে কারণে তিনি এ পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। সরকার তাদের পাশে না দাঁড়ালে এ পেশা টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।

গোটা কুমোর পাড়া ঘুরে হতাশ হলাম। আমাদের মৃৎশিল্প ও শিল্পীদের প্রাচীন ঐতিহ্য ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন গঙ্গারামপুরের এই মৃৎশিল্প কর্মীরা। তারা তাদের জীবন ও জীবিকার জন্যে এই পেশায় টিকে থাকার জন্যে লড়াই করে চলেছেন। এদের সামাজিক ও নাগরিক নিরাপত্তাও মজবুত নয়। নানা রকম দলাদলি আছে। এ অবস্থায় তাদের টিকে থাকা কঠিন হবে। হয়ত একদিন কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে এই পেশা। আমাদের দায়িত্ব হবে এই প্রাচীন মৃৎশিল্প ও শিল্পীদের বাঁচিয়ে রাখা।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

March ২০২৬
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
« Feb    
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১  

ফেসবুকে আমরা

বিভাগ

দিনপঞ্জিকা

March ২০২৬
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
« Feb    
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১  
%d bloggers like this: