মাগুরানিউজ.কম:
চারদিকে পোড়া গন্ধ। ছড়ানো-ছিটানো ছাই কয়লার স্তূপ। কয়েক জায়গা দিয়ে এখনো সাদা ধোঁয়া উঠছে। আগুনের লেলিহান শিখা নিভে গেলেও তার ধ্বংসচিহ্ন এখনো স্পষ্ট। তিলতিল করে গড়ে তোলা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে আহাজারি করছেন কেউ। কেউ অসীম শূন্যের পানে তাকিয়ে আছেন। যেখানে ছিল সাজানো ব্যবসা, এখন সব জায়গায় শুধুই কাঠ কয়লার স্তূপ। দেখলে মনে হবে যেন বিধ্বস্ত কোনো জনপদ।
কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা দুর্ঘটনা নয়। এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের জের ধরে প্রতিপক্ষের লোকজনের পেট্রল ঢেলে ধরিয়ে দেয়া আগুনে মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার পলাশবাড়িয়া ইউনিয়নের ডাঙ্গাপাড়া বাজারের চিত্র এখন এমনই।
গত বুধবার বিকালে বিবদমান দুই গ্রামের আওয়ামী লীগের দুই নেতার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের পর প্রকাশ্যে অগ্নিসংযোগে ১০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়েছে। আরো অন্তত ১০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর লুটপাট চালাানো হয়েছে। এতে ক্ষতির পরিমাণ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে ক্ষতিগ্রস্তরা জানান।
সরেজমিন বৃহস্পতিবার দুপুরে জানা গেছে, পলাশবাড়িয়া ইউনিয়নের মল্লগাতি ও রোনগর বড় দুইটি প্রতিবেশি গ্রাম। ডাঙ্গাপাড়া স্থানীয় হাটবাজার হিসেবে পরিচিত। এ দুই গ্রামে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে আগ থেকেই বিরোধ ছিল। গত সোমবার দুই ছাত্রের মধ্যে স্কুলে হাতাহাতি হয়। তাদের বাড়ি উপজেলার পাশের মল্লগাতি ও রোনগর গ্রামে। এ ঘটনায় দুই গ্রামের মধ্যে উত্তেজনা শুরু হয়।
এ ঘটনায় মহম্মদপুর থানার ওসি আতিয়ার রহমান নিজে উপস্থিত হয়ে উভয় পক্ষকে ডেকে মঙ্গলবার মীমাংসা করেন। এরপরও দুই গ্রামবাসী ঘটনার বদলা নিতে রণ প্রস্তুতি নিতে থাকে।
বুধবার নহাটা পুলিশ ফাঁড়ির এসআই জামাল ও লতিফ বনগ্রাম স্কুল মাঠে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য সালিস বৈঠক বসান। সালিসে পুলিশের উপস্থিতিতে চার নেতার সমর্থক মল্লগাতি ও রোনগর গ্রামবাসীর মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ শুরু হয়। প্রায় দুই ঘন্টা স্থায়ী ঝগড়ায় দেশী অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে একে অপরের ওপর হামলা চালান। হামলা, আগুনে পুড়ে ও পুলিশের গুলিতে উভয় পক্ষের কমপক্ষে ৫০ জন আহত হয়েছেন।
সংঘর্ষ চলাকালে রোনগর গ্রামবাসী মল্লগাতির বাসিন্দা ডাঙ্গাপাড়া বাজারের ব্যবসায়ীদের প্রতিষ্ঠানে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এত ১০টি মুদি-তেল-ধান-পাটের গুদাম পুড়ে হয়ে যায়। হামলা-ভাঙচুর লুটপাটে ক্ষতিগ্রস্ত হয় আরো ১০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এসব ব্যবসায়ীদের মালপত্র লুট করে নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেন তারা। সংঘর্ষ চলাকালে ডাঙ্গাপাড়া বাজারে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে ভাঙচুর চালানো হয়।
গতকাল দুপুরে সরেজমিন দেখা গেছে, সংঘর্ষে জড়িত মল্লগাতি ও রোনগর গ্রামে পুরুষ লোকজন তেমন নেই। হামলা মামলার ভয়ে বেশির ভাগ বাড়ি ছাড়া। বৃদ্ধ নারী শিশুরা বাড়িঘর পাহারা দিচ্ছেন। তাদের চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ।
বাড়িতে কোনো রান্না হচ্ছে না। এক কাপড়ে অর্ধাহারে অনাহারে আছেন তারা। আত্মীয়স্বজনদের পাঠানো খাবার খাচ্ছেন নারী শিশুরা। ক্ষেতখামারে চাষবাস বন্ধ। গবাদি পশুগুলো রয়েছে অভুক্ত। প্রতিপক্ষের লোকজন এ ঘটনার বদলা নিতে যেকোনো সময় আবার হামলা চালাবে এমন গুজব সর্বত্র। অনেকে বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে মূল্যবান মালপত্র ও গৃহস্থালি সামগ্রী ও গবাদিপশু সরিয়ে নিতে দেখা গেছে। রাস্তায় বিক্ষিপ্ত পড়ে আছে সংঘর্ষে ব্যবহৃত ভাঙা ইটের স্তূপ। রাস্তায় তেমন লোকজন ও যানবাহন নেই। পুলিশের টহল গাড়ি আসা-যাওয়া করছে। গ্রামের প্রবেশপথে পুলিশকে অবস্থান নিতে দেখা গেছে। এলাকায় এখনো থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।


