মাগুরানিউজ.কমঃ
হাজারো মানুষের ভালবাসায় সিক্ত হলো মায়ের পেটে গুলিবিদ্ধ শিশু মাগুরার সুরাইয়া। সবকিছুকে হারিয়ে টিকে থাকার লড়াইয়ের এক নজির যেন সে! সুরাইয়াকে এক নজর দেখতে সারাদিনই শত শত নারী পুরুষ শিশু তার বাড়িতে ভিড় করে। পুলিশের সতর্ক উপস্থিতি ছিলো চোখে পড়ার মতো। এককথায় মাগুরা দোয়ারপাড়ে সুরাইয়াদের বাড়িতে সারাদিনই ছিলো উপচেপড়া মানুষের ভিড়।
গুলির ক্ষত নিয়ে ২৬ দিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট’২০১৫) রাত পৌনে এগারটার দিকে মাগুরা শহরতলীর দরি মাগুরার দোয়ারপাড় এলাকার নিজ বাড়িতে ফেরে সে ও তার মা নাজমা বেগম। মাগুরা সদর থানা পুলিশের একটি পিক-আপ কামারখালি এলাকা থেকে তাদের প্রহরা দিয়ে বাড়িতে নিয়ে আসে।
এদিকে সুরাইয়ার বাড়ি ফেরার খবরে আজ সকাল থেকেই গোটা বাড়িতে উৎসুক জনতার ভিড় বাড়ছিল। যা বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি পেয়ে জনমেলায় পরিনত হয়। উপস্থিতরা সুরাইয়ার বেঁচে ওঠার এই ঘটনাকে বিরল আখ্যা দিয়ে এটি স্বয়ং আল্লাহ তায়ালার কুদরত বলে উল্লেখ করেন। সারাদিনই বাড়িতে লোকে লোকারণ্য ছিল।
এদিকে দীর্ঘ ভ্রমন। অসুস্থ সুরাইয়া। তাই দীর্ঘসময় অপেক্ষা করেও সুরাইয়াকে না দেখে ফিরে যেতে হয় অনেককে। তারপরও সারাদিনই অগুনতি মানুষ হাজির মৃত্যুঞ্জয়ী শিশুটিকে দেখতে।
দুপুরে মাগুরা নিউজের মুখোমুখি হন সুরাইয়ার বাবা-মা। দাদী দুলালী বেগমের কোলে তখন সুরাইয়া ঘুমিয়ে। দীর্ঘ দিনের অসুস্থতার ধকল আর ভ্রমণের ক্লান্তি নাজমা বেগমের চোখে মুখে স্পষ্ট। সুরাইয়ার বাবা বাচ্চু ভূঁইয়া ও মা নাজমা বেগম মাগুরা নিউজকে কান্না জড়িত কণ্ঠে জানান, ‘কোনো দিন ভাবতে পারিনি মেয়েকে ফিরিয়ে বাড়ি আনতে পারব। আপনাদের জন্য দোয়া করি। নাজমা তাকে ও তার শিশুকে নানাভাবে সাহায্য করার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মন্ত্রীবর্গ, প্রশাসন, চিকিৎসক, পুলিশ ও সাংবাদিকসহ দেশবাসীর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
এক প্রশ্নের জবাবে নাজমা মাগুরা নিউজকে বলেন, ‘সহিংসতার দুঃসহ স্মৃতি আমাকে তাড়া করতো। মানুষের ভালোবাসায় এখন তা অনেকটাই মন থেকে মুছে গেছে। এখন মনে হচ্ছে সমাজে খারাপ মানুষের চেয়ে ভালো মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি।’
সুরাইয়ার বাবা বাচ্চু শেখ বলেন, ‘ঢাকায় চিকিৎসা করতে যাওয়ার সার্মথ ছিল না। পুলিশ সুপার স্যার ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ নিয়ে মুত্যুপথযাত্রী সুরাইয়াকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন, যে কারণে তার কাছে আমরা চির কৃতজ্ঞ।’
দুপুরে কয়েকবার এদিক-ওদিক তাকিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ে সুরাইয়া। দাদী দুলালী বেগমের কাছেই বড় বোন সুমাইয়া ও ভাই সোহাগ অপেক্ষায় কখন ঘুম থেকে উঠবে সুরাইয়া।
সুরাইয়া সুস্থ্য হয়ে বাড়ি ফিরে আসায় দেশবাসীর সাথে খুশি মাগুরাবাসীও। মাগুরার জেলা প্রশাসক মুহ. মাহবুবর রহমান মাগুরা নিউজকে এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘সুস্থ হয়ে সুরাইয়া মাগুরাতে ফিরে আসায় দেশবাসীর সঙ্গে আমরাও স্বস্তি ফিরে পেলাম।’ তিনি বলেন আমি এই মুহূর্তটির জন্য অপেক্ষা করছিলাম। যারা সুরাইয়াকে বাঁচাতে ও সুস্থ করে তুলতে কষ্ট করেছেন, নানাভাবে সাহায্য করেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’ এসময় এই ধরনের ঘটনার পূনরাবৃত্তিরোধে সবাইকে সজাগ থাকার আহবান জানান তিনি।
মাগুরার পুলিশ সুপার এ কে এম এহসান উল্লাহ মাগুরা নিউজকে বলেন,‘ ঘটনার পর জেলা পুলিশ পরিবারটির পাশে এসে দাঁড়ায়। পুলিশের পক্ষ থেকে উদ্যোগী হয়ে সুরাইয়ার উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়। এখন পর্যন্ত সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। সেদিনের মৃত্যু পথযাত্রী সুরাইয়া আজ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে এসেছে এ জন্য আমি আনন্দিত।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পরিবারটির নিরাপত্তার জন্য পুলিশ সব ধরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’ এ ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সকলের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
মাগুরা সদর হাসপাতালে ঘটনার রাতে সুরাইয়ার শরীরে অস্ত্রপচারকারিদের অন্যতম ডা. সফিউর রহমান উপস্থিত ছিলেন সুরাইয়ার বাড়িতে। মাগুরা নিউজকে তিনি বলেন ‘মায়ের পেটে শিশু গুলিবিদ্ধের ঘটনা পৃথিবীতে সম্ভবত এটিই প্রথম। এরকম ঘটনার মুখোমুখি হতে আমি প্রস্তুত ছিলাম না। তবে সেদিন নামাজ পড়ে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রেখে অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে গুলিবিদ্ধ নাজমা বেগমকে অপারেশন করেছিলাম। গর্ভ থেকে গুলিবিদ্ধ শিশুটিকে বের করে এনেছিলাম। শিশুটির পিঠ দিয়ে গুলি ঢুকে বুকের ডান পাশ দিয়ে বের হয়ে তার হাত চোখেও আঘাত করেছিল। অপরেশনের পর মা ও শিশু দু’জনের অবস্থাই ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু আজ ঢাকা থেকে উন্নত চিকিৎসা নিয়ে মা, শিশু দু’জনই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আসায় আনন্দের পাশাপাশি গর্বিত বোধ করছি। আমার জীবনে এ ঘটনা বিরল স্মৃতি হয়ে থাকবে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, বাড়িতে ফেরার পরই সুরাইয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে। সে সুস্থ্য আছে। তার স্বাস্থ্যগত বিষয়টি আমরা সার্বক্ষনিক পর্যবেক্ষনে রাখবো।’
উল্লেখ্য, গত ২৩ জুলাই মাগুরা শহরের দোয়ারপাড় এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় থাকা দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ সময় গুলিতে নিহত হন মমিন ভূঁইয়া নামে একজন। গর্ভস্থ শিশুসহ গুলিবিদ্ধ হন গৃহবধূ নাজমা বেগম। ওইদিন রাতে মাগুরা সদর হাসপাতালের চিকিৎসকরা অপারেশনের মাধ্যমে সাড়ে সাত মাসের গুলিবিদ্ধ শিশুকে মায়ের পেট থেকে বের করেন। পরে ২৫ জুলাই নাজমা বেগমের গুলিবিদ্ধ শিশুকন্যাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে শিশুটি ‘বুলেটকন্যা’ নামে পরিচিতি পায়। পরে তার বাবা মেয়ের নাম রাখেন সুরাইয়া।


