মাগুরানিউজ.কমঃ
হালখাতা শব্দটি আমোদের ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে গেছে ওতোপ্রত ভাবে। বঙ্গাব্দ বা বাংলা সনের প্রথম দিনে ব্যবসায়ীরা দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করে থাকেন। বছরের প্রথম দিনে ব্যবসায়ীরা তাদের দেনা-পাওনার হিসাব সমন্বয় করে হিসাবের নতুন খাতা খোলেন। এজন্য খদ্দেরদের বিনীতভাবে পাওনা শোধ করার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়।
এ উপলক্ষে নববর্ষের দিন ব্যবসায়ীরা তাদের খদ্দেরদের মিষ্টিমুখ করিয়ে থাকেন। খদ্দেররাও তাদের সামর্থ অনুযায়ী পুরোনো দেনা শোধ করে দেন। আগেকার দিনে ব্যবসায়ীরা একটি মাত্র মোটা খাতায় তাদের যাবতীয় হিসাব লিখে রাখতেন। এই খাতাটি বৈশাখের প্রথম দিনে নতুন করে হালনাগাদ করা হতো। হিসাবের খাতা হাল নাগাদ করা থেকে “হালখাতা”-র উদ্ভব। শুধু বাংলাদেশ নয় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ছোট বড় মাঝারি যেকোনো দোকানে এটি পালন করা হয়ে থাকে।
ইতিহাস বলছে, ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে মুগল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। ঐ সময়ে বঙ্গে শক বর্ষপঞ্জি ব্যবহৃত হতো, যার প্রথম মাস ছিল চৈত্র। বাংলা বর্ষপঞ্জি প্রথমে ‘তারিখ-ই-এলাহী’ বা ‘ফসলি সন’ নামে পরিচিত ছিল। পরে বাংলা সন পরিবর্তন করে বছরের প্রথম দিন হিসেবে পহেলা বৈশাখ করা হয়। আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। তখন প্রত্যেককে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সব খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হতো। এর পরদিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। এ
উপলক্ষ্যে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হতো। এই উৎসবটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয় যার রূপ পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে এই পর্যায়ে এসেছে। তখনকার সময় এই দিনের প্রধান আনুষ্ঠানিকতা ছিল হালখাতা করা। হালখাতা বলতে একটি নতুন হিসাব-বই বোঝানো হয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে হালখাতা হলো বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। গ্রাম, শহর বা বাণিজ্যিক এলাকা, সকল স্থানেই পুরনো বছরের হিসাব-বই বন্ধ করে নতুন হিসাব-বই খোলা হয়। হালখাতার দিনে দোকনদাররা তাদের ক্রেতাদের মিষ্টান্ন আপ্যায়ন করে থাকে। এই প্রথাটি এখনও অনেকাংশে প্রচলিত আছে, বিশেষত স্বর্ণের দোকানে।
মূলত পঁচিশে বৈশাখের সকালে সনাতন ধর্মাবলম্বী দোকানী ও ব্যবসায়ীরা সিদ্ধিদাতা গনেশ ও বিত্তের দেবী লক্ষ্মীর পূজা করে থাকেন এই কামনায় যে তাদেরর সারা বছর যেন ব্যবসা ভালো যায়। দেবতার পূজার্চনার পর তার পায়ে ছোঁয়ানো সিঁদুর ও চন্দন চর্চিত খাতায় নতুন বছরের হিসাব নিকাশ শুরু করে। তবে হালখাতার এই রীতি সব ধর্মাবলম্বী ব্যাবসায়ীদের মাঝে বিদ্যমান। এখনো আমাদের গ্রামে বা ছোট গঞ্জে হালখাতার রীতিটা বেশ রমরমা। কোথাও কোথাও মাইক বাজিয়ে মেজবান করে হালখাতা করা হয়। দোকান ঘর সাজানো হয় রঙিন কাগজ, জরি, ফুল ইত্যাদি দিয়ে। ক্রেতার সঙ্গে বিক্রেতার এ যেন বন্ধুত্বকে হালনাগাদের অপর নাম মাত্র।


