মাগুরানিউজ.কমঃ
এবারও দেশের সবচেয়ে জাকজমকপূর্ণ ও বিশ্বের সর্ববৃহৎ কাত্যায়নী পূজার আয়োজন করা হয়েছে মাগুরায়। এ পূজাকে সামনে রেখে সাজ সাজ রব বিরাজ করছে গোটা মাগুরায়। ইতোমধ্যে পূজার সব প্রস্তুতি শেষ করেছে পূজা কমিটিগুলো। এ বছর শহরের প্রধান ৮টিসহ জেলায় মোট ৫৫টি মণ্ডপে অনুষ্ঠিত হবে ঐতিহ্যবাহী শ্রী শ্রী কাত্যায়নী পূজা।
২৯ অক্টোবর ষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে ২ নভেম্বর (দশমী) বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এ উৎসব।
এছাড়া পূজা উপলক্ষে আয়োজন করা হয়েছে বিশেষ মেলার। ১২ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে মেলা।
মাগুরা নিজনান্দুয়ালী নিতাই গৌর সেবাশ্রমের মহারাজ চিন্ময়ানন্দ দাস চঞ্চল বলেন, “বৈদিক যুগে বিষ্ণু ছিলেন অন্যতম প্রধান দেবতা। বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সার্বিক সৃষ্টি, ধ্বংস ও রক্ষার কর্তা ছিলেন তিনি। ক্রেতা যুগে জন্মান্তরের মাধ্যমে তিনি এসেছিলেন দশরথ পুত্র রাম হিসাবে। পরবর্তীতে দাপর যুগে এসেছিলেন কংসের বিনাশকারী কৃষ্ণরূপে। সে সময় ব্রজবাসিনীর ভালবাসার পরীক্ষা নিতে এক সময় তিনি উধাও হয়ে যান। তার এই অন্তর্ধানে আকুল হয়ে ওঠেন ব্রজবাসিনীরা।”
তিনি বলেন, “সে সময় মা যশোদা কৃষ্ণকে ফিরে পেতে মাসব্যাপী কৃষ্ণ আরাধনায় মহামায়া দেবী দূর্গাকে পূজার মাধ্যমে জাগ্রত করতে বলেন। যশোদার সেই পরামর্শ অনুযায়ী প্রচীন যুগের হেমন্তের সময় গোপীরা কৃষ্ণকে ফিরে পেতে যমুনা তীরে একমাস ব্রত পালন করে। তাদের ব্রতে সন্তুষ্ট হয়ে মহামায়া দূর্গা তাদের দেখা দেয়। সেই সাথে ক্রোড়ে স্থান পায় গোপীদের আরাধ্য দেবতা কৃষ্ণ। সেই থেকে কৃষ্ণ আরাধনায় মহামায়া দূর্গা কাত্যায়নী নামে পুজিত হয়ে আসছে।”
তিনি বলেন, “প্রতিমা স্থাপনের দিক দিয়ে এই পূজার অবয়ব দূর্গা পূজার অনুরূপ। কিন্তু পার্থক্য হিসাবে দূর্গা মায়ের ক্রোড়ে থাকে কৃষ্ণমূর্তি। যার অর্থ হচ্ছে কাত্যায়নী দেবী দূর্গার মাধ্যমে কৃষ্ণের আরাধনা। এই পূজা চলাকালীন নবমী ও দশমীতে প্রতিটি মণ্ডপে একই সাথে পালিত হয় জগদ্ধতি পূজা। পৃথক মণ্ডপে এ সময়টকে ভক্তরা তাদের অঞ্জলি দিয়ে থাকেন।”
জনশ্র”তি মতে মাগুরায় কাত্যায়নী পূজা অত্যন্ত আড়ম্বরে ও উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হতে শুরু করে ১৯৪০ এর দশকে। মগুরা শহরতলীর পারনান্দুয়ালী মাঝিপাড়ার জনৈক সতীশ মাঝিই এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভুমিকা পালন করেন। পেশায় তিনি ছিলেন মুদি ব্যবসায়ী ও জেলে। তিনিই প্রথম নিজ বাড়িতে কাত্যায়নী দেবীর পূজা জাঁকজমকভাবে পালন করার প্রচলন করেন।
কারণ হিসাবে দুটি বিষয় পাওয়া যায়। প্রথমত, দেবী কর্তৃক স্বপ্নাদেশ। দ্বিতীয়ত, ব্যবসায়িক কারণে প্রতি বছর দূর্গা পূজার সময় মাঝি মাল্লারা মাছ ধরার কাজে এলাকার বাইরে থাকত। ফলে তারা দূর্গা পূজার আনুষ্ঠানিকতা ও উৎসব থেকে বঞ্চিত হতো।
দেবী দূর্গার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ও আনন্দ উৎসব পালন করার জন্য দূর্গা পূজার ঠিক একমাস পর শাস্ত্রমতে একই আদলে মূর্তি স্থাপন করে সতীশ মাঝি এই পূজা শুরু করেন।
এরপর থেকে মাগুরা শহরে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে এ পূজার ব্যাপকতা ছড়িয়ে পড়ে।
স্বাধীনতা পরবর্তীকালে সতীশ মাঝি পরিবারসহ ভারতে চলে যান। তবে এখনো তার বাড়ির এলাকায় একইভাবে এ পূজা উদযাপিত হচ্ছে।
এলাকাবাসীরা জানান, ভারতের পাটনায় সতীশ মাঝির পরিবার একইভাবে এই পূজা করে আসছে।
১৯৮০ এর দশকের শুরু থেকে মাগুরা শহরের ছানাবটতলা, নতুন বাজার, দরি মাগুরা, সাতদোহা পাড়া, তাঁতীপাড়া, বাটিকাডাঙ্গা বৈদ্য বাড়ি, জামরুলতলাসহ বিভিন্ন স্থানে সমানভাবে পালিত হয়ে আসছে এই পূজা।
কাত্যায়নী পূজার মূল আকর্ষণ থাকে সাজসজ্জায়। প্রতিটি মণ্ডপে প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে কারুকার্যময় প্রতিমা স্থাপন, নয়নাভিরাম গেট-প্যান্ডেল নির্মাণ, ব্যাপক আলোকসজ্জার পাশাপাশি থাকে নানা ধরনের প্রদর্শণী। গেট ও প্যান্ডেল করা হয় প্রাচীন স্থাপত্য ও বিশ্বের বিভিন্ন বড় বড় স্থাপনার অনুরূপ।
মাগুরা জামরুলতলা পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ কুমার কুণ্ডু এ বছরের কাত্যায়নী পূজার আয়োজন সম্পর্কে জানাতে ইতিমধ্যেই সংবাদ সম্মেলন করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার পূজায় আলোকসজ্জা ও গেট-প্যান্ডেলের সাজসজ্জায় বাহার এবং আয়োজন থাকবে অনেক বেশি।
ভারত উপমহাদেশের মধ্যে শুধু মাগুরায় ব্যাপক আয়োজনে এ পূজা অনুষ্ঠিত হয়। পূজা উৎসবে দেশের বিভিন্ন স্থান ছাড়াও ভারত ও নেপাল থেকে দর্শনার্থীদের আগমন ঘটে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি স্থানীয় মুসলিম ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকজনের বাড়িতেও এ সময় আত্মীয় স্বজনের আগমন ঘটে।
বাঙালি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলে এ পূজা উৎসবে অংশগ্রহণ করে থাকে। পূজার ৫ দিনই সন্ধ্যার পর হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে লাখ লাখ দর্শনার্থীর আগমন ঘটে মাগুরায় পূজা মণ্ডপে। রাত যত বাড়তে থাকে দর্শনার্থীদের ভিড়ও বাড়তে থাকে।
পূজা উপলক্ষে বসে মাসব্যাপী মেলা। মেলায় নানা ধরনের আসবাবপত্র, গহনা, প্রসাধনী, পোশাক, খেলনা, হাড়ি পাতিলসহ নিত্য ব্যবহার্য জিনিসপত্রের পসরা বসে।
কাত্যায়নী পূজা উপলক্ষে জেলা ও পুলিশ প্রশাসন ইতিমধ্যে পূজা কমিটির নেতৃবৃন্দ এবং গন্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে সভা করেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
পূজায় শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।পূজা মণ্ডপের নিরাপত্তার জন্য ঢাকা থেকে বিশেষ বোমা সনাক্তকরণ সুইপিং মেশিন ব্যবহার ও প্রতিটি মণ্ডপে ভিডিও ধারণ করা হবে বলে জানান পুলিশ সুপার জিহাদুল কবির।
এ পূজাকে ঘিরে সব ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয় মাগুরায়। এ পূজাকে ঘিরে এ অঞ্চলের হিন্দু-মুসলিমসহ সব সম্প্রদায়ের মানুষ উৎসবে মেতে ওঠেন। এ বছর কাত্যায়নী পূজা উপলক্ষে তিনদিনে কমপক্ষে ২০ লাখ মানুষের সমাগম হবে বলে আশা করছেন আয়োজকরা।



