১৯৭১ সালে মাগুরা-ঝিনাইদহ জেলার সীমান্তবর্তী কামান্না গ্রামে পাক হানাদার ও তাদের দোসর রাজাকার আলবদরদের হামলায় নির্মমভাবে নিহত হন ২৮ জন মুক্তিযোদ্ধা। যাদের বাড়ি মাগুরার হাজিপুরসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন গ্রামে।
প্রতিবছর ২৬ নভেম্বর মাগুরাবাসী এ দিনটিকে কামান্না শহীদ দিবস হিসেবে পালন করে আসছেন। এদিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শহীদদের স্বজন ও সহযোদ্ধারা শহীদদের দেহাবশেষ মাগুরায় তাদের নিজ গ্রামে নিয়ে এসে সৎকারের দাবী জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় যে সমস্ত রাজাকার ও আলবদরের সহায়তায় পাকিস্থানি সেনাবাহিনী ২৮ জন তরতাজা মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করেছিল তাদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবী করেছেন।
এ প্রসঙ্গে মাগুরা জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডের কমান্ডার মোল্যা নবুয়ত আলী বলেন- ‘কামান্নায় শহীদ অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধার বাড়ি যেহেতু মাগুরা জেলার মধ্যে। সেহেতু এ সকল মুক্তিযোদ্ধার দেহাবশেষ মাগুরায় নিয়ে এসে তাদেরকে যথাযোগ্য মর্যাদায় সমাহিত করতে পারলে তাদের পরিবার যেমন শান্তি পাবে। তেমনি তাদের সহযোদ্ধারাও অনেক স্বস্তি পাবে। তাদের কবর অন্য জেলায় হওয়ার কারণে শহীদ পরিবারগুলি কবর জিয়ারত কিংবা যে কোন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে সমস্যায় পড়েন।’ তিনি কামান্নায় যারা যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল তাদের বিচার দাবী করেন।
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সাইদুর রহমান বলেন, ‘কামান্নায় শহীদ ২৮ মুক্তিযোদ্ধার দেহাবশেষ কামান্না থেকে মাগুরার হাজিপুরে স্থানান্তর করে একটি স্মৃতি সৌধ নির্মানের জন্য আমরা দীর্ঘদিন দাবী জানিয়ে আসছি। একই সঙ্গে ওই সময় যে সকল রাজাকার আলবদর রাতের আধারে পাকিস্থানি বাহিনীকে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছিল তাদের বিচার চাই।’
কামান্নায় শহীদ গৌর চন্দ্র রায়ের বৌদি (বড় ভাইয়ের স্ত্রী) দুর্লভী রায় বলেন- ‘আমার যখন বিয়ে হয় গৌর তখন ২ বছরের শিশু। ওই বয়স থেকেই গৌরকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছি। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল ২৩ বছর। আমাদের না বলে যুদ্ধে চলে গেল। যুদ্ধে সে শহীদ হলো। কিন্তু আমরা তার মৃতদেহ ধর্মীয় রীতিমত সৎকার করতে পারলাম না। তার দেহের অবশিষ্ট অংশ যদি পেতাম তাহলে ধর্মীয় রীতিতে তার অন্তেষ্টিকৃয়া শেষ করতাম। আর যারা তাদের মারলো তাদের যেন উপযুক্ত শাস্তি হয় তা দেখে যেতে চাই। ’
উলেখ্য- ১৯৭১ সালের ২৫ নভেম্বর রাতে মাগুরার এক দল মুক্তিযোদ্ধা পার্শ্ববর্তী শৈলকুপা উপজেলার কামান্না গ্রামে গিয়ে রাত্রি যাপনের জন্য মাধব কুন্ডু নামে এক ব্যক্তির বাড়ির পরিত্যাক্ত একটি টিনের ঘরে অবস্থান নেয়। মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের এ খবর স্থানীয় রাজাকাররা শৈলকুপা মাগুরায় পাক বাহিনীর ক্যাম্পে পৌঁছে দেয়। খবর পেয়ে রাজাকার আলবদর বাহিনীর সহযোগিতায় শৈলকুপা ও মাগুরা থেকে আসা পাক সেনারা ভোর রাতে মুক্তিযোদ্ধাদের উপর অতর্কিতে গুলি বর্ষণ শুরু করে। মুক্তিযোদ্ধারাও পাল্টা গুলি ছুড়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চেষ্টা করে। কিন্তু সুসজ্জিত পাকিস্থানী বাহিনীর আক্রমনের মুখে ঘটনাস্থলেই ২৮ মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।
শহীদ মুক্তিযোদ্ধারা হচ্ছেন আলমগীর হোসেন, আলী হোসেন, কাদের, মোমিন, সলেমান, ওয়াহেদ, আজিজ, আকবর, রিয়াদ, শরীফুল, আলিউজ্জামান, মনিরুজ্জামান, মাছিম, রাজ্জাক, শহিদুল, আব্দুর রাজ্জাক, কাওছার, সালেক, সেলিম, মতলেব, হোসেন আলী, খন্দকার রাশেদ, গোলজার, তাজুল ইসলাম, আনিসুর, অধীর হালদার ও গৌর চন্দ্র রায়। পাক সেনারা চলে গেলে মুক্তিযোদ্ধারা এলাকাবাসীর সহায়তায় কামান্না স্কুল মাঠের পাশে নদীর তীরে ৫টি গণ কবরে এ বীর শহীদদের সমাহিত করেন।


