মাগুরানিউজ.কম:
রাজীব মিত্র জয়-
গোপাল’দা। পুরো নাম গোপাল বিশ্বাস। বাড়ি মাগুরা শহরের পারনান্দুয়ালি গ্রামে। মাগুরা শহরবাসীর কাছে বিশেষ করে বিগত কয়েকযুগ শহরের স্কুলগুলোতে যারা লেখাপড়া করেছেন তাদের কাছে অতি সুপরিচিত একটি নাম। আর তাই ছোট্ট এ মাগুরা শহরে ছোট বড় সবার কাছেই তিনি গোপাল অথবা গোপালদা। আইসক্রিমের সাথে পরিচয় গোপালদার হাত দিয়েই। আর গোপালদা সেই একই রকম ভাবে আজও চালিয়ে যাচ্ছেন।
কখনো পিঠে। কখনো মাথায়। আবার সুযোগ হলে ভাড়া করা ভ্যানগাড়িতে আইসক্রিমের বাক্স নিয়ে ওই যাচ্ছেন গোপাল দা। স্বাভাবিক চলাফেরা। আর এই ভাবেই কাটিয়ে দিলেন প্রায় পঞ্চাশ বছর। ৫ পয়সা দামের লাল রংঙের আইসক্রিম দিয়ে যার ব্যবসা শুরু। কে খায়নি সেই আইসক্রিম! আহা!!
গোপালদা এখনো আইসক্রিম বিক্রি করছেন। তবে স্বাদে এবং গুনে আরো উন্নত হয়েছে। কিন্তু গোপালদার অবস্থার তেমন কোন উন্নতি হয়নি।
অত্যন্ত মিষ্টভাষি গোপালদার চাহিদাও বেশি নয়। মাগুরা শহরের শিশু বিদ্যালয় গুলোর কাছে যিনি অত্যন্ত প্রিয় একজন মানুষ। জীবনের বেশির ভাগ সময়ই তিনি কাটিয়ে দিলেন ওইসব স্কুলের আনাচে কানাচে।
মাগুরার হাজারো শিক্ষার্থীর শৈশবের স্বপ্ন একদিন নিজের পায়ে দাড়িয়ে গোপালদাকে সহযোগিতা করতে হবে।
গোপালদার স্বপ্ন-
সেই কৈশরে বয়সেই যে ভারি বাক্স কাধে তুলে নিয়েছিলেন সেটি বইতে বইতে এখন তিনি খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। তাই বলে অন্যের গলগ্রহ হাবার ইচ্ছে নেই একেবারেই। বিদ্যালয়ের শিশুরা তার খুবই প্রিয়। তাদের জন্যই একটি ভ্রাম্যমান দোকান করবার শখ অনেকদিনের। এটি তার স্বপ্নও। তিনি ভাবেন, একদিন তার এই স্বপ্ন পূরণ হবে।
দীর্ঘ ৫০ বছরে হাজার হাজার শিশুরা আমার কাছ থেকে আইসক্রিম কিনে খেয়েছে। কিন্তু গাড়িটা কখোনোই মনের মতো হয়নি। একটা ক্ষোভ সবসময় কাজ করে একটি ভালো ভ্যানগাড়িতে আইসক্রিম বিক্রি না করতে পারার ক্ষোভ।
একটি ভ্যানগাড়ি। অনেক রঙে, ফুল পাখিতে ভরে থাকবে গাড়িটি। মাথার উপর থাকবে ছাউনি। তাও রঙিন। আর চারপাশে ফ্রেমে বাধাই করা। শিশুদের উপযোগী নানা রকমের খাবার নিয়ে যাবেন বিভিন্ন স্কুলে স্কুলে। আর বেশি কিছুই নয়। এমন সাদাসিদা চাওয়াই তার।
স্বপ্ন পুরন-
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের কল্যাণে মাগুরার দরিদ্র আইসক্রিম বিক্রেতা সকলের প্রিয় গোপালদা পেলেন তার স্বপ্নের গাড়ি।
‘প্রিয় ফেরিওয়ালা আমাদের গোপালদা’ নামে একটি ফেসবুকের প্রায় সাড়ে ৩শ বন্ধু তহবিল সংগ্রহ করে তার জন্য কিনে দিলেন অত্যাধুনিক একটি আইসক্রিম ট্রলি। সোমবার বিকালে আনুষ্ঠানিক ভাবে তার হাতে ট্রলিটি তুলে দেয়া হয়।
মাগুরা শহরের পারনান্দুয়ালি গ্রামের বাসিন্দা গোপাল বিশ্বাস দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে মাগুরার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাধে ভারি বাক্স নিয়ে আইসক্রিম বিক্রি করে আসছিলেন। সেই ছোট বেলা থেকে যারা তার কাছ থেকে আইসক্রিম কিনে খেয়েছেন দেশ বিদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সেই শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে গ্রুপ তৈরি করে তার জন্য তহবিল সংগ্রহ করেন।
সোমবার বিকালে শহরের সৈয়দ আতর আলি গণ গ্রন্থাগার প্রাঙ্গণে আইসক্রিম ট্রলিটি হস্তান্তর করা হয়। সেখানে ফেসবুক গ্রুপের উদ্যোক্তা সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মাগুরা জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম হিরক, সাংবাদিক আবু বাসার আখন্দ, প্রভাষক শতদল বিশ্বাস, শিউলি খন্দকার, এড. রাশেদ মাহমুদ শাহিন সহ আরো অনেক সদস্য।
হস্তান্তর অনুষ্ঠানে উপস্থিত গৃহিনী শিউলি খন্দকার বলেন, ছোটবেলায় গোপালদার কাছ থেকে অনেক আইসক্রিম খেয়েছি। অনেক সময় পয়সা না থাকলেও তার কাছ থেকে বাকি খেয়েছি। অনেক সময় সেইসব টাকা শোধ করা হয়নি। তার প্রতি রয়েছে আমাদের অনেক ভালবাসা রয়েছে।
ফেসবুক গ্রুপের হাত থেকে মূল্যবান আইসক্রিম ট্রলিটি পেয়ে উচ্ছসিত গোপাল বিশ্বাস বলেন, ২০ বছর বয়স থেকেই আইসক্রিম বিক্রি করছি। এই দীর্ঘ ৫০ বছরে হাজার হাজার শিশুরা আমার কাছ থেকে আইসক্রিম কিনে খেয়েছে। যারা এখন অনেক বড় ও প্রতিষ্ঠিত। সেই সব শিশুরা অনেক বড় হয়েও যে তাকে মনে রেখেছে এটা আমার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। তাদের ভালবাসার এই ঋণ আমি কখনো শোধ করতে পারবো না।
‘প্রিয় ফেরিওয়ালা আমাদের গোপালদা’ গ্রুপের উদ্যোক্তা সাংবাদিক আবু বাসার আখন্দ বলেন, এখন ফেসবুক সামাজিক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে দাড়িয়ে গেছে। গোপালদাকে সহায়তার মাধ্যম দিয়ে এখানে ফেসবুকের ইতিবাচক দিকটিই তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
সদিচ্ছা থাকলে অনেক কঠিনতম কাজও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সহজেই করা সম্ভব যার একটি অন্যতম উদাহরণ তৈরি করেছে মাগুরার এই ফেসবুক গ্রুপটি।


