বিশেষ প্রতিবেদক-
‘এই… লিচুর ‘শ’ একশ টাকা, ‘কম দামে লিচু খান’। ‘লিচুর এলাকায় দাম একটু কম হবে এটাই স্বাভাবিক’ শাহরিয়ার নামের এক ক্রেতার এই কথা শেষ না হতেই আক্ষেপের সুরে পাশে থাকা বাগানী সেন্টু মিয়া বলে ওঠলেন, বাগানের চিত্রটি দেখলে বুঝতে পারতেন, কেন এতো কম দামে লিচু বিক্রি করতে হচ্ছে। অর্থদন্ড হচ্ছে চোখের সামনে।
কাছে গিয়ে কথা বলতে গিয়ে সব গোমর ফাঁস হলো। সেন্টু বললেন, এবারই প্রথম এতো কম দামে লিচু বিক্রি করছি। তাও আবার লিচুর মৌসুম শুরুর দিকে। যে গাছে পাঁচ হাজার লিচু হওয়ার কথা সেই গাছে মাত্র ৫০০টি লিচু ভালো পেয়েছি। বাকি সব রোদে পুড়ে ফেটে নষ্ট হয়ে গেছে।
পাশেই থাকা আরেক লিচু চাষি বারেক মিয়া জানালেন, লিচুর মান অনুযায়ী এসব লিচু পাইকারি ১০০টি লিচুর দাম পরতো দুই থেকে তিন শত টাকা। কিন্তু সময়ের আগেই পেকে যাওয়ায় ক্ষতিতে বিক্রি করছেন। তাছাড়া সংরক্ষণও করে রাখতে পারছেন না। তাই এখন তাদের ক্রেতাদের পেছনে ছুটতে হচ্ছে, নইলে বিপরীত চিত্র হতো।
মাগুরানিউজের সরেজমিনে চাষিদের সঙ্গে কথা বলে ওঠে আসলো চলতি মৌসুমে লিচুর দুর্যোগের এমন চিত্র। চাষিরা জানালেন, দেশী আগাম জাতের লিচুর পুড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ফেটে যাওয়ার গল্প।
চাষি খলিলুর রহমান জানান, বর্তমানে যে আকারের লিচু বাজারে পাওয়া যাচ্ছে তার দ্বিগুণ আকার হতো অন্যান্য বছরে। ফলে ছোট আকৃতির এসব লিচু বাজারে কেউ কিনছেন না। সময়ের আগেই অপুক্ত অবস্থায় লাল হয়ে যাচ্ছে লিচুগুলো।
সেন্টু জানালেন, এই সময়ে লিচুর বাগানে মন খুলে কাজ অথবা গল্প করে সময় কাটানোর কথা। বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যাপারীরা লিচু নেয়ার জন্য পেছনে পেছনে ছুটে বেড়াতো। অথচ তাকেই হকারের মতো লিচু বিক্রি করতে হচ্ছে।
সরেজমিনে পাওয়া গেলো, গত দশদিন ধরে এভাবে লিচু পুড়ে যাওয়ার পরও কোনো ভালো পদক্ষেপ নিতে পারছেন না চাষিরা। কারও কাছেই মিলছে না বিপদ কাটিয়ে ওঠার সঠিক মন্ত্র। ফলে দিন যত যাচ্ছে ততই হতাশা গ্রাস করছে তৃণমূল পর্যায়ের এসব চাষিদের।
লিচু চাষি আফতাব আহমেদ বলেন, গাছ থেকে সব লিচু একসঙ্গে পাড়ার পর বাজারে নিয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি নেই। আরও কিছুদিন পর লিচু পাকতে শুরু করতো। কিন্তু রোদে পুরে এখনই অপুক্ত অবস্থায় লাল হয়ে ফেটে যাচ্ছে। এভাবে চোখের সামনে লিচু নষ্ট হতে দেখে ভালো লাগছে না। তাই স্থানীয়ভাবে যতটুকু সম্ভব বিক্রি করছি।
বৃষ্টির অপেক্ষায় থাকা এসব চাষিদের লিচুর মৌসুমটি একেবারেই খারাপ যাচ্ছে। এখন বৃষ্টি হলে আবার পরিস্থিতি কেমন হয়। এরকম নানান দু:শ্চিন্তা ভর করে সময় পার করছেন তারা।
সারাদেশে সুনাম রয়েছে মাগুরার হাজরাপুরী লিচুর। বছরে এ জেলার ৪০টি গ্রাম থেকে কমপক্ষে ৩০ কোটি টাকার লিচু বিক্রি হয়। মাগুরার সদরের হাজরাপুর, হাজীপুর, রাঘবদাইড় ও পৌরসভার ৪০ গ্রামে লিচু উৎপাদন হচ্ছে ২০ বছর ধরে। প্রায় আড়াই হাজার বাগানে লিচু গাছ রয়েছে ৪৫ হাজার। কিন্তু এবার মুকুল আসার সময় দু’দিনের টানা বৃষ্টিতে বেশিরভাগ গাছের মুকুল নষ্ট হয়ে গেছে। আর কিছু গাছে মুকুল এলেও পরে খরার কারণে বড় না হতেই ঝরে গেছে লিচু।


