মাগুরানিউজ.কমঃ
কাঠমিস্ত্রি হিসাবে অধিক উপার্জনের আশায় এক বছর আগে শালিখার জুনারী গ্রামের দালাল দোলন, নাজমুল ও রাজুকে দেড় লাখ টাকা দিয়ে মালয়েশিয়া যাবার উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়েন শরাফত হোসেন।কিন্তু আর ফিরে আসেন নাই। তার সঙ্গে যোগাযোগও করতে পারছেন না তার পরিবারের সদস্যরা।
‘কাঠ মিস্ত্রির কাম করে খাতো। কত কইছি আমাগের এতেই চলবি। আমার কথা শোনে নাই। কইছে দোয়া করেক, বিদেশ গেলি আমাগের বাড়ি হবি ঘর হবি। আমার ছাওয়ালগের হাতুর-বাটাল বাড়োয়ে আর খাতি হবে না। সব বেঁচে দালালরা কহানে নিয়ে গেল এক বছর কোন খোঁজ নাই।’কান্না জড়িতকণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন মাগুরার শালিখা উপজেলার জুনারী গ্রামের নিখোঁজ শরাফত হোসেনের স্ত্রী ফিরোজা বেগম ।
শুধু শরাফত হোসেন নয়, মানব পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে মাগুরা সদর উপজেলার ডেফুলিয়া, শালিখা উপজেলার জুনারী, হাজরাহাটি, দিঘলগ্রাম ও দিঘি গ্রাম থেকে ১০ ব্যক্তি সমুদ্র পথে মালয়েশিয়া যাবার সময় নিখোঁজ হয়েছেন বলে এখন পর্যন্ত খবর পাওয়া গেছে। আরও অনেক নিখোঁজ থাকলেও ঝামেলার ভয়ে মুখ খুলছেন না তাদের পরিবার।
নিখোঁজদের মধ্যে ৭ জন শালিখা উপজেলার জুনারী, হাজরাহাটি, দিঘলগ্রাম ও দিঘি গ্রামের। অপর ৩ জন সদরের ডেফুলিয়া গ্রামের। তাদের সন্ধানে সহায়তা চেয়ে পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন এসব পরিবারের সদস্যরা।
শালিখার জুনারী ও দিঘি থেকে নিখোঁজ ৭ জনের প্রত্যেকে স্থানীয় কয়েকজন দালালের মাধ্যমে ২ থেকে আড়াই লাখ টাকা দিয়ে দেড় বছর আগে সমুদ্র পথে মালয়েশিয়া যাত্রা করেন। তারপর তাদের আর কোন খোঁজ মেলেনি।
নিখোঁজ ৭ জন হচ্ছেন জুনারীর ফখর আলীর ছেলে টিটুল সরদার (১৮), ভাতিজা শরাফত হোসেন (২৫), শ্যালক ইসলাম আলী, শালিখার হাজরাহাটি গ্রামের শুকুর আলী, দিঘি গ্রামের ইকরাম হোসেন (৪৮), আল আমীন (১৮), দিঘল গ্রামের নান্নু মিয়া (৩৫)। সদর উপজেলার ডেফুলিয়া গ্রামের ৩ জন হচ্ছেন, ইমরান শেখ (২০), শাহীন হোসেন (২০) ও ইমরান মোল্যা (২৩)।
আল আমীনের মা জরিনা বেগম কাঁদতে কাঁদতে জানান, ‘দিঘি গ্রামের দালাল আজিজুুল অনেকটা ফুসলিয়েই তার ছেলেকে মালয়েশিয়া নিয়ে যাবার কথা বলে নৌপথে নিয়ে নিখোঁজ করে দিয়েছে। ছেলেকে খুঁজতে এ পর্যন্ত তিনি আরো ২ লাখ টাকা খরচ করেছেন। কিন্তু একমাত্র ছেলের কোন খোজ পাননি।’
জুনারী গ্রামের নিখোঁজ শরাফতের স্ত্রী ফিরোজা বেগম বলেন, ‘কাঠমিস্ত্রি হিসাবে অধিক উপার্জনের আশায় তার স্বামী দেড় বছর আগে জুনারীর দালাল দোলন, নাজমুল ও রাজুকে দেড় লাখ টাকা দিয়ে মালয়েশিয়া যাবার উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়েন। তারপর থেকে তার কোন খোঁজ মেলেনি। এখন ৩ সন্তান নিয়ে তিনি পথে পথে ঘুরছেন। তিনি তার স্বামীকে ফিরিয়ে দেয়ার আহবান জানান।’
নিখোঁজ ইকরাম হোসেনের ছেলে সোহেল জানান, ‘তার বাবাকে নির্মাণ শ্রমিকের কাজ দেওয়ার কথা বলে আজিজুল ২ লাখ ২০ হাজার টাকা নিয়েছে। পরে মালয়েশিয়া পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে ১৬ মাস আগে বাড়ি থেকে নিয়ে গেছে। তারপর থেকে তিনি নিখোঁজ। তারা একাধিকবার আজিজুলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। সে প্রথমে নানা কথা বলে ঘুরিয়েছে। পরে ঢাকার উত্তরার একটি বাসায় ডেকে নিয়ে তাকে হত্যার হুমকি দিয়েছে। বর্তমানে তার ফোন বন্ধ ও সে পলাতক।’
সোহেল আরও জানায়, ‘কিছুদিন আগে অজ্ঞাত এক ব্যক্তিকে তার বাবা সাজিয়ে আজিজুল ফোন দিয়ে বাড়িতে তার মুক্তি বাবদ আরো ১ লাখ টাকা চেয়েছিল। কিন্তু সন্দেহ হওয়ায় নানা প্রশ্ন করলে সে ফোনের লাইন কেটে দেয়।’
এদিকে মাগুরা সদরের ডেফুলিয়া গ্রামে নিখোঁজ ইমরান শেখ, ইমরান মোল্যা ও শাহিন হোসেনের কোন খোঁজ এখনো মেলেনি। দেড় মাস আগে রাজ্জাক ও রানা নামে দুই দালালের মাধ্যমে মালয়েশিয়া যাবার পথে তারা নিখোঁজ হন।
পুলিশ সুপার এ কে এম এসানউল্লাহ জানান, ‘নিখোঁজদের পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত আবেদন পাওয়ার পর থেকে মানব পাচারকারী দালালদের গ্রেফতারে অভিযান শুরু হয়। ইতিমধ্যে একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। এ ছাড়া নিখোঁজদের সন্ধানে সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে।’
মাগুরা জেলা প্রসাশকের কার্যালয়ের প্রবাসী কল্যাণ শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী কমিশনার মো. নাকিব হাসান তরফদার জানান, ‘প্রশাসনিকভাবে নিখোঁজদের বিষয়ে সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে। ভুক্তভোগীদের উচিত নিখোঁজ স্বজনদের বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো। একই সঙ্গে জড়িত দালাল চক্রকে পুলিশে দেয়া।’



