মাগুরানিউজ.কমঃ
মাগুরা থেকে আজ রাতে সোহাগ পরিবহনের বাসে ঢাকায় যাওয়ার কথা ছিল জাহিদুল ইসলামের। আগেই টিকিট কেটেছিলেন। তবে সন্ধ্যার দিকে বাস কাউন্টারে টিকিট ফেরত দিয়ে একই পরিবহনের সকালের বাসের টিকিট নিলেন তিনি।
টিকিট পরিবর্তনের কারণ জানতে চাইলে জাহিদুল মাগুরানিউজ’কে বলেন, ‘স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা চায় না রাতে যাই।’ মাগুরায় শনিবার রাতে ট্রাকে পেট্রলবোমা হামলার ঘটনায় ভয় পেয়েছেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা। তিনিও ভয় পেয়েছেন। তবে তাঁকে কাজের কারণে বাধ্য হয়েই যেতে হয়। তিনি জানান, রাতে না যাওয়ার কারণে তাঁকে অফিস থেকে ছুটি নিতে হয়েছে।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের ডাকা চলমান অবরোধ-হরতালে দক্ষিণাঞ্চলে এ পর্যন্ত বড় নাশকতার ঘটনা মাগুরায় পেট্রলবোমা হামলা। ওই হামলার পর পরথেকে রাতে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ফেরিঘাট পার হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে রাতের বাসে যাত্রী চলাচল কিছুটা কমে গেছে। যাত্রী কম থাকায় কয়েকটি বড় পরিবহন কোম্পানি রোববার থেকে রাতের বাস কমিয়ে দিয়েছে। মাগুরার ঘটনা মানুষের মনে ভীতি ছড়ানোর কারণে যাত্রী কমেছে বলে মনে করছেন পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
মাগুরায় একটি ট্রাকে পেট্রলবোমা হামলায় দগ্ধ নয়জনের মধ্যে চরজন মারা গেছেন।
ওই ঘটনায় কেবল ঢাকার সঙ্গেই যোগাযোগ ব্যাহত হয়নি, এই দুই এলাকার জেলাগুলোর মধ্যেও রাতে বাসে লোক চলাচল কমেছে। জেলা থেকে উপজেলা সড়কে চলাচলরত মানুষের মধ্যেও ভীতি কাজ করছে।
অবশ্য যান চলাচল নির্বিঘ্ন করতে এই মহাসড়কের পাশে পুলিশ নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করেছে। তল্লাশিচৌকি বসানো হয়েছে। রাতে মহাসড়কে হেঁটে বা মোটরসাইকেলে চলাচলরত বা দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিদের তল্লাশি করছে পুলিশ।
মাগুরার পুশিশ সুপার জিহাদুল কবির বলেন, ‘একটি ঘটনা ঘটেছে। তবে এতে সাধারণ মানুষকে এখনই আতঙ্কিত না হতে বলব। কেননা পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে এবং এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তিনি বলেন, এই অঞ্চলে বড় ধরনের নাশকতার ঘটনা সেভাবে ঘটেনি। তবে যারা করছে তাদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
শনিবারের আগ পর্যন্ত অবরোধ-হরতালে খুলনা বিভাগের জেলাগুলোর মধ্যে যশোর, মাগুরা ও নড়াইলে যানবাহন ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের কিছু ঘটনা ঘটেছে। পেট্রলবোমা হামলা এবং এতে প্রাণহানির ঘটনা শনিবারই প্রথম। বিভাগের অন্য জেলাগুলোর মধ্যে কোথাও কোথাও ককটেল বিস্ফোরিত হলেও নাশকতার ঘটনা ঘটেনি।
শনিবারের পর রাতে বাসে ঢাকা থেকে মাগুরায় এসেছেন এমন তিনজন যাত্রী তাঁদের যাত্রার অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সৌরভ সাহা নামের এক যুবক মাগুরানিউজ’কে বলেন, ‘যাত্রীদের চেয়ে বাসের লোকেরাও কম ভয় পাচ্ছেন না। ফেরিঘাট পার হওয়ার পর থেকেই বাসের সুপারভাইজার জানালা খুলতে দেননি। ফেরিঘাট থেকে নতুন কোনো যাত্রী বাসে উঠেছেন কি না, তা দেখে নিয়েছেন। ঢাকায় বাসে ওঠার সময় একবার ব্যাগ তল্লাশি হয়েছিল, পথে আবারও ব্যাগ তল্লাশি করেছেন। এ ছাড়া ফেরিঘাট পার হওয়ার পর দুই জায়গায় তল্লাশি হয়েছে। পুলিশও বাস তল্লাশি করেছে।
এনজিও কর্মী নারগিস পারভিন ঢাকা থেকে এসি বাসে মাগুরায় এসেছেন। তিনি বললেন, ‘বাসের হেলপার, চালক ও সুপারভাইজার মোটামুটি যাত্রীদের চেহারা মুখস্থ করে ফেলেছিলেন। তার পরও ফেরিতে ওঠার পর যাঁরা বাস থেকে নেমেছিলেন, তাঁদের টিকিট দেখিয়ে বাসে উঠতে হয়েছে। হাতের ব্যাগও তল্লাশি করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, কাজের জন্য তাঁকে মাগুরায় আসতে হয়। সাধারণত রাতেই চলাচল করেন। তবে রোববার রাতে বাসে ওঠার পর নিজের মধ্যে ভয় কাজ করেছে। পরিবারের লোকেরা ভোররাত পর্যন্ত ফোন করে খোঁজখবর নিয়েছে।
মাগুরার কয়েকজন পরিবহন ব্যবসায়ী ও পরিবহন কোম্পানির কর্মকর্তারা বলেন, স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে এমনিতেই এখন রাতে বাস চলাচল কম। অনেক দিন ধরে এই মহাসড়ক নিরাপদ থাকায় রাতে বাস চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর প্রতিদিনই বাসের সংখ্যা বাড়ছিল। মাগুরার ঘটনার আগ পর্যন্ত রাতে বাস চলাচল ৬০ শতাংশের মতো স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। একজন বাসমালিক বলেন, পেট্রলবোমার ঘটনায় প্রাথমিকভাবে ভয়ে কিছু যাত্রী কমে গেছে। তবে এ ধরনের আর কোনো নাশকতা না ঘটলে এক সপ্তাহের মধ্যে রাতের বাস চলাচল স্বাভাবিক হয়ে যাবে।


