আজকের পত্রিকাtitle_li=বাংলাদেশ বাঙ্গালীর ঐতিহ্যমন্ডিত নলেন গুড়ের গল্প

বাঙ্গালীর ঐতিহ্যমন্ডিত নলেন গুড়ের গল্প

মাগুরানিউজ.কম: রাজীব মিত্র জয়- 

নলেন গুড়৷ নাম শুনলেই কেমন জিভে জল এসে যায়৷ স্বাদই এমন যে জিভে জল আসারই কথা৷ তার সঙ্গে রয়েছে সুন্দর গন্ধও৷ গুড় তৈরি থেকে শুরু করে খাওয়ার আগে পর্যন্ত ওই গন্ধই ম ম করে সর্বত্র৷ তাই শীতের পর শীত ধরে নলেন গুড়ের জনপ্রিয়তা রয়ে গিয়েছে অমলিন৷

নলেন গুড় খাওয়া যতটা সহজ, তৈরি কিন্তু মোটেও সহজ নয়৷ এর জন্য পরিশ্রম করতে হয় নিরলস৷ ভোর থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত খাটতে হয় গাছিদের৷ তার পরই খেজুরের রস থেকে মেলে ‘লাভের’ গুড়৷

তাই প্রথমেই জেনে নেওয়া যাক কীভাবে তৈরি করতে হয় নলেন গুড়৷ সঠিক গুণমানের নলেন গুড় তৈরি করতে হলে বেশ কয়েকটি ধাপ মেনে কাজ করতে হয়৷ যার প্রথম ধাপই হল ‘গাছ কাটা’৷ হেমন্তের হিমেল হাওয়া যখন ধীরে ধীরে আমাদের চারপাশে প্রভাব ফেলতে শুরু করে, সেই সময় থেকেই এই কাজ শুরু করতে হয় গাছিদের৷ সারা বছর পাতায় ভরে থাকা খেজুর গাছ কেটে পরিষ্কার করতে হয়৷ কেটে ফেলতে হয় অধিকাংশ পাতা৷ এই কাজকেই গ্রাম্য ভাষায় বলে ‘গাছ কাটা’৷

‘গাছ কাটা’র পর খেজুর গাছের একেবারে উপরের দিকে পাতার ঠিক নিচের অংশে কান্ড কেটে পরিষ্কার করতে হয়৷ ধারালো কাটারি দিয়ে এই কাজ করে থাকেন শিউলিরা৷ ওই অংশ চেঁচে পরিষ্কার করার পর খেজুর গাছের কান্ডের ওই অংশ কিছুটা নরম হয়ে যায়৷ তখন কান্ডের অংশে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় একটা কাঠি৷ যে কাঠি বেয়েই বেরিয়ে আসে খেজুর রস৷ তবে যে কোনও কাঠিতেই কাজ হয় না৷ মূলত বাঁশের কঞ্চিকে ব্যবহার করতে হয়৷ কঞ্চির একটা অংশ কেটে নিয়ে সেটাকে লম্বালম্বি মাঝখান থেকে চিরে ফেলতে হয়৷ ফলে মাঝখানে একটা সরু পথ তৈরি হয়৷ সেই পথ দিয়েই রস বেরিয়ে আসে খেজুর গাছ থেকে৷

তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ইদানীং ‘গাছ কাটা’র কাজ কিছুটা হলেও পরে করা হয়৷ কারণ, আবহাওয়ার পরিবর্তের জন্য এখন শীতের হিমেল হাওয়া আসতে অনেক দেরি হয়ে যায়৷ তাই এখন হেমন্তকাল মানে কার্তিক মাস বা অক্টোবরের মাঝামাঝি সময় ‘গাছ কাটা’ শুরু হয় না৷ বরং নভেম্বরের গোড়া থেকে এই কাজ শুরু হয়৷

গাছ কেটে রস বেরনোর পথ তৈরি করার পর বেশ কিছুদিন অপেক্ষা করতে হয় গাছিদের৷ শীতের শুরু থেকেই গাছে রস আসতে শুরু করে৷ তখন শুরু হয় নলেন গুড় তৈরির দ্বিতীয় ধাপ৷ সূর্য ডোবার আগে মাটির কলসি কাঁধে নিয়ে গাছের গোড়ায় হাজির হতে হয় শিউলিদের৷ তার পর গাছে উঠে গাছিদের তা ঝুলিয়ে দিতে হয়৷ কলসির মুখটা রাখতে হয় কাঠির নিচে৷ এর পর শিউলিদের আর কোনও ভূমিকা নেই৷ খেজুর গাছে হাঁড়ি বেঁধে তাঁদের বাড়ির পথ ধরতে হয়৷ ফিরতে হয় শেষরাতে৷ ততক্ষণে হাঁড়িতে রস জমেছে৷ রাতভর হাঁড়িতে ধীরে ধীরে রস জমা হয়৷ ভোরের আগে কলসি থেকে জমা রস নিয়ে আবার বাড়ির পথ ধরেন গাছিরা৷

এর পরই শুরু আসল কাজ৷ নলেন গুড় তৈরির তৃতীয় তথা শেষ ধাপ৷ সবচেয়ে কঠিন কাজ৷ ভাল গুণমানের নলেন গুড় তৈরি করতে হলে তৃতীয় ধাপেই গাছিদের যথেষ্ট মুন্সিয়ানার প্রয়োজন হয়৷ মাটির উনুনে কাঠের জ্বালানি ব্যবহার করে রস ফোটাতে হয়৷ রস ফোটার সময় তার মধ্যে বিশেষ ধরনের হাতা দিয়ে সারাক্ষণ নাড়তে হয়৷ মূলত নারকেলের মালার অর্ধেক অংশে লম্বা কাঠ লাগিয়ে এই হাতা তৈরি করা হয়৷ কয়েক ঘণ্টা ধরে রস ফোটাতে হয়৷ যত সময় এগোয়, ততই নলেন গুড়ের গন্ধ পাওয়া যায়৷ গন্ধ যত বাড়বে, বুঝতে হবে গুড়ের মান ততই ভাল হচ্ছে৷

তবে রসের উপরও অনেক সময় গুড়ের গুণমান নির্ভর করে৷ টানা তিনদিন রস সংগ্রহের পর বন্ধ করে দিতে হয়৷ একে বলে গাছের জিরেন৷ কারণ, প্রতিদিনই গাছে হাঁড়ি ঝোলানোর সময় কান্ডের কিছুটা অংশ চাঁচতে হয়৷ গাছকে জিরেন দিলে ওই তিন দিন, তা চাঁচতে হয় না৷ এর পর চতুর্থদিন বা জিরেনের পর প্রথমদিন যে রস সংগ্রহ করা হয়, তার স্বাদ অন্যদের তুলনায় একেবারেই আলাদা৷ অনন্য৷ এটা জিরেন-কাটের রস নামে পরিচিত৷ জিরেন-কাটের রস থেকেই জিরেন-কাটের গুড় তৈরি হয়৷ ওই গুড়ের স্বাদও একেবারে আলাদা৷

যদিও ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার জেরে আজকাল এই নিয়ম আর মানেন না কোনও গাছিরাই৷ তিনদিন রস সংগ্রহের পর একদিনের বেশি আর কেউ জিরেন দেন না৷ তাই জিরেন-কাটের রস আগের মতো মধুর হয় না৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সেপ্টেম্বর ২০১৮
সোম মঙ্গল বুধ বৃহঃ শুক্র শনি রবি
« আগ    
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০

মাগুড়া সদর

ফেসবুকে আমরা

বিভাগ

দিনপঞ্জিকা

সেপ্টেম্বর ২০১৮
সোম মঙ্গল বুধ বৃহঃ শুক্র শনি রবি
« আগ    
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০

রাজনীতি

অর্থনীতি