আজকের পত্রিকাtitle_li=মাগুরা সদর ৭১’র নির্মম হত্যাযজ্ঞের সাক্ষী ”মাগুরার ১০ বধ্যভূমি ও গণকবর”

৭১’র নির্মম হত্যাযজ্ঞের সাক্ষী ”মাগুরার ১০ বধ্যভূমি ও গণকবর”

মাগুরানিউজ.কমঃ

বিশেষ প্রতিবেদন- 

১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস্‌ মাগুরাতে ব্যাপক গণহত্যা চালায়। এই গণহত্যার প্রক্রিয়া এবং প্রকৃতি যেমন ছিলো পৈশাচিক, ভয়াবহ-তেমনি ছিলো নৃশংসতা আর নিষ্ঠুরতার স্বাক্ষরবাহী। পাকিস্তানীরা বাঙালিদের কথনো গুলি করে, কখনো বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে, কখনো জবাই করে, কখনো আগুনে পুড়িয়ে, আবার কখনোবা নির্যাতনের পর গর্তের মধ্যে ফেলে জীবন্ত মাটিচাপা দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে।

নির্মম হত্যাযজ্ঞের সাক্ষী বধ্যভূমি ও গণকবরগুলো ধীরে ধীরে মিশে যাচ্ছে বিস্মৃতির অতলে। স্বাধীনতার দীর্ঘ বছর পেরিয়ে গেলেও সেসব স্থানে কোন স্মৃতিসৌধ, স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়নি।

কিন্তু মাগুরাতে কতগুলো বধ্যভূমি ও গণকবর আছে এটি কি আমাদের জানা আছে? এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত বধ্যভূমি ও গণকবরের তালিকা এবং সংখ্যা হয়তো পূর্ণাঙ্গ নয়। ‘মাগুরানিউজ’ জানাচ্ছে মাগুরার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রকাশিত ও স্বীকৃত তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে মাগুরার ১০ বধ্যভূমি ও গণকবরের হদিস।

ঢাকা রোড পাকা ব্রিজ বধ্যভূমি : মাগুরার বধ্যভূমিগুলোর মধ্যে ঢাকা-মাগুরা সড়কের (ঢাকা রোড স্লুইস গেট) পাকা ব্রিজটি ছিল অন্যতম। এই ব্রিজেই হত্যা করা হয়েছে অসংখ্য বাঙালিকে। পাক হানাদাররা বিভিন্ন গ্রাম থেকে যুবকদের ধরে এনে তাদের গলায় দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে দিত। তারপর গুলি করে ওপর থেকে ছেড়ে দিত। পানিতে পড়ার শব্দের সঙ্গে সঙ্গে লাশগুলো তলিয়ে যেত নবগঙ্গার বুকে। স্বাধীনতার পর এ ব্রিজের আশপাশে ছড়িয়ে ছিল অসংখ্য নরকঙ্কাল।

মাগুরার ঢাকা রোড বাসস্ট্যান্ড স্লুইস গেট সংলগ্ন এ স্থানটিতে ১৯৭১ সালে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করে ফেলে যেত হানাদাররা।

পারনান্দুয়ালী ক্যানেল : শহরতলির পারনান্দুয়ালী ক্যানেল এলাকা বর্তমান পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের অদূরে। এটি ছিল ‘৭১ সালের সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের মূল স্থান। এখানে মাগুরা শহরের মুক্তিকামী সাধারণ মানুষ ও অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধাকে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডের নেতৃত্ব দিত তৎকালীন ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক রিজু কবীর। জেলার মুক্তিযোদ্ধারা জানান এখানে কমপক্ষে ৩ শতাধিক লোককে হত্যা করা হয়েছে।

পিটিআই বধ্যভূমি : মাগুরা শহরের সাতদোহা নবগঙ্গা নদীর ঘাট ও পিটিআই স্কুলের বর্তমান মহিলা ছাত্রীবাসের অদূরে রয়েছে বধ্যভূমি। যুদ্ধকালীন এখানে অনেককে হত্যা করা হয়। ইসলামী ছাত্রসংঘের রিজু ও কবীর ছিল মাগুরার বিখ্যাত কসাই। তারা মানুষ হত্যার জন্য যশোর সামরিক ছাউনি থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছিল। প্রতিদিন তাদের হাতে মারা যেত দশ থেকে বারো জন। পিটিআই স্কুল ছিল জেলার পাক হানাদারদের বড় ঘাঁটি। এখানে পাক আর্মি অফিসাররা ক্যাম্প স্থাপন করেছিল।

কাঠের পুল বধ্যভূমি : মাগুরা শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নবগঙ্গা নদীর একটি শাখা নদী হলো কালীগাঙ। এই কালীগাঙ নদীর ওপর নির্মিত (সাবেক স্পাহানি পাট গোডাউন বর্তমান ভূমি অফিসের অদূরে)। কাঠের পুল সংলগ্ন এলাকা ছিল পাকবাহিনীর বধ্যভূমি। যুদ্ধকালীন এখানে বহু মানুষকে হত্যা করা হয়।

দত্ত বিল্ডিং : শহরের আতর আলী রোডের দত্ত বিল্ডিংয়ে রাজাকারদের সহযোগিতায় মুক্তিযোদ্ধার পক্ষের লোকদের ধরে এনে নির্যাতন করা হতো। পাশাপাশি রাজাকাররা লুটপাট করে এখানে মালপত্র রাখত।

দিনান্ত ক্লাব বধ্যভূমি ও নোমানী ময়দান আনসার ক্যাম্প : মাগুরা শহরের নোমানী ময়দান সংলগ্ন দিনান্ত ক্লাব এলাকা ছিল পাকবাহিনীর অন্যতম বধ্যভূমি। মাগুরার দূর-দূরান্তে বিভিন্ন গ্রাম থেকে নিরীহ মানুষদের ধরে এনে হত্যা করে এখানে পুঁতে রাখা হয়। নোমানী ময়দান আনসার ক্যাম্পের এখানে পাক হানাদার বাহিনীর স্থাপিত ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী বাঙালিদের ধরে এনে অত্যাচার-নির্যাতন করা হতো।

শালিখার হাজরাহাটি : শালিখার হাজরাহাটি গ্রামে চিত্রা নদীর পাড়ে ৮ ব্যক্তির গণকবর রয়েছে। তারা সবাই ৭ ডিসেম্বর ভারত থেকে বাড়ি ফেরার পথে রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ে নিহত হন। তারা হলেন ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারীর উপজেলার জয়পাশা গ্রামের যদুনাথ গুহ, পঞ্চানন পাল, হরিপদ দাশ, নিত্যানন্দ ভদ্র ও পরমেশ্বরদী গ্রামের মনোরঞ্জন দত্ত। একই্ জেলার নগরকান্দা উপজেলার সাধুহাটি গ্রামের নাড়ূ গোপাল রায় ও ফুলবাড়িয়া গ্রামের শুসেনকর এবং অজ্ঞাতপরিচয় একজন।

শালিখার আড়পাড়া ডাকবাংলো ঘাট ও শালিখা পুরনো থানা ভবন : শালিখা উপজেলার আড়পাড়া বাজার সংলগ্ন ডাকবাংলোতে সাধারণ মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নির্যাতনের পর ফটকি নদীর ঘাটে তাদের হত্যা করা হতো। শালিখা পুরনো থানা ভবনে রাজাকারদের ক্যাম্প স্থাপন করে। পরে থানা সংলগ্ন চিত্রা নদীতে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়।

ছয়ঘরিয়ার গণকবর : শালিখা উপজেলার ছয়ঘরিয়াতে ২টি গণকবরে ৬ জন শায়িত আছেন। তারা ৯ ডিসেম্বর ভারত থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ে শহীদ হন তারা। এদের মধ্যে যাদের নাম পাওয়া গেছে_ তারা হলেন শালিখা উপজেলার দেশমুখপাড়া গ্রামের সৈয়দ আকরাম হোসেন, মো. মান্নান জমার্দার, মো. মমিন উদ্দিন মোল্যা ও হাটবাড়িয়া গ্রামের মো. আবদুল রউফ বিশ্বাস। বাকি ২ জনের নাম জানা যায়নি।

তালখড়ি গণকবর : নভেম্বর মাসের দিকে ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজ এলাকা ফরিদপুর যাওয়ার পথে তালখড়িতে রেঞ্জার পুলিশ ও রাজাকারদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে ৭ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। এদের নাম জানা যায়নি। এখানে ওই ৭ মুক্তিযোদ্ধার গণকবর রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জানুয়ারি ২০১৮
সোম মঙ্গল বুধ বৃহঃ শুক্র শনি রবি
« ডিসে    
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০৩১  

মাগুড়া সদর

ফেসবুকে আমরা

Pages