আজকের পত্রিকাtitle_li=খেলাধুলা মাগুরার ফয়সালের বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব-আল-হাসান হয়ে ওঠার গল্প  

মাগুরার ফয়সালের বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব-আল-হাসান হয়ে ওঠার গল্প  

মাগুরানিউজ.কম:

mnরাজীব মিত্র জয়-

৯ পেরিয়ে ১০-এ পা রাখলেন মাগুরার ‘সাকিব আল হাসান’। ক্রিকেটের তিন ফরমেটেই তিনি এখন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার। মাগুরাতে তিনি ফয়সাল নামেই পরিচিত। লর্ডস, মেলবোর্ন, ইডেন গার্ডেন, মিরপুর মাঠ দাপিয়ে বেড়ানো সাকিবের শুরুটা কিন্তু হয়েছিল মাগুরার আলোকদিয়ার মাঠে !মাগুরার ‘ফয়সাল’ যেভাবে হয়ে উঠলেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার ‘সাকিব আল হাসান’ সে গল্পই আজ মাগুরানিউজ’র পাঠকদের জন্য।

৬ আগস্ট ২০০৬, বাংলাদেশ বনাম জিম্বাবুয়ে ৫ম ওয়ানডে ম্যাচ । অভিষেক হলো এক তরুণ খেলোয়াড়ের, নাম সাকিব আল হাসান । বল হাতে ১০ ওভারে ৩৯ রানের বিনিময়ে এলটন চিগাম্বুরার উইকেট এবং ব্যাট হাতে ৪৯ বলে অপরাজিত ৩০ রানের একটি ইনিংস । এভাবেই শুরু হয়েছিল সাকিবের আন্তির্জাতিক ক্যারিয়ার ।

এরপর দিন যত গড়িয়েছে সাকিব নিজেকে নিজে ছাড়িয়ে গেছেন তত। মাগুরার ফয়সাল হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের সাকিব । তিনিই আজ বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচাইতে বড় বিজ্ঞাপন । যে কোন ফরম্যাটের ক্রিকেটেই বাংলাদেশ দলের অন্যতম নির্ভরতার নাম হচ্ছে সাকিব আল হাসান । তার একটি দায়িত্বশীল ইনিংস কিমবা একটি ঘূর্ণিজালের স্পেল দলের ভাগ্য গড়ে দিতে পারে । তাইতো সাকিবের জন্য খেলার মাঠে প্লাকার্ড হাতে নিয়ে দর্শক দাঁড়িয়ে থাকে, তাতে লেখা থাকে ‘বাংলাদেশের জান, সাকিব আল হাসান’ ।

সাকিবের জন্ম ২৪ মার্চ, ১৯৮৭ । সারা দেশের কাছে তার পরিচয় সাকিব আল হাসান নামে হলেও জন্মস্থল মাগুরায় তার পরিচিতি ফয়সাল নামে । আজকে ক্রিকেটার সাকিবকে নিয়ে সারা দেশ জুড়ে যে উন্মাদনা সেই সাকিবের হয়তো কখনো ক্রিকেটই খেলা হত না ! সাকিবের বাবা মাশরুর রেজা যে চাইতেনই না তার ছেলে ক্রিকেটের পেছনে সময় নষ্ট করুক ।

সাকিবের বাবা যৌবনে মাগুরার জেলা দলের হয়ে নিয়মিত ফুটবল খেলেছেন । তিনি ছেলের ফুটবল খেলা মেনে নিতে পারতেন কিন্তু ক্রিকেট কখনোই না । ক্রিকেটটা সেই সময়ে এখনকার মত এতটা জনপ্রিয়ও ছিল না । একটা সময় অবশ্য সাকিব নিজেও চাইতেন ফুটবলার হতে ।

১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল কেনিয়াকে হারিয়ে আইসিসি ট্রফি জয় করে বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ লাভ করলে দেশ জুড়ে যে ক্রিকেট জ্বর শুরু হয় তাতে সাকিবও আক্রান্ত হন । ক্রিকেটের প্রতি তার আগ্রহ এবং ভালবাসা দুটোই বাড়তে থাকে । তাই শেষ পর্যন্ত সাকিব ক্রিকেটকেই বেছে নিলেন । তার সিদ্ধান্ত যে ভুল যে মোটেও ভুল ছিল না তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না । লর্ডস, মেলবোর্ন, ইডেন গার্ডেন, মিরপুর মাঠ দাপিয়ে বেড়ানো সাকিবের শুরুটা কিন্তু হয়েছিল আলোকদিয়ার মাঠে !

অনেক বছর পরে সেই মাঠে গিয়ে সাকিব নিজেই যেমন বলেছিলেন, ‘মনে হচ্ছিল এই মাঠ থেকেই সব শুরু হয়েছিল । এই মাঠের জন্যই এত দূর এসেছি ।’ ২০০১ সালের দিকে ক্লাস সেভেনে থাকা কালীন সময়ে আলোকদিয়ার ওই মাঠটাতে ‘খ্যাপ’ খেলতে গিয়েছিলেন সাকিব আল হাসান । বিধ্বংসী ব্যাটিং আর পেস বোলিংয়ে নজর কেড়েছিলেন সবার । হ্যাঁ, সাকিব প্রথমে পেসারই ছিলেন ! সাকিবের ঐ দিনের পারফরমেন্স মুগ্ধ করেছিল সেই ম্যাচের আম্পায়ার সাদ্দাম হোসেন (গোর্কি) কে । পরবর্তীতে এই সাদ্দাম হোসেনের পরামর্শেই সাকিব মাগুরায় ইসলামপুরপাড়া স্পোর্টিং ক্লাবে যোগ দেন । টেপড টেনিস বলে খেলা সাকিব সেখানেই প্রথম আসল ক্রিকেট বল হাতে পান । প্রথমে পেস বল করলেও পরে তার কোচ সাদ্দাম হোসেনের পরামর্শে সাকিব স্পিন বল করা শুরু করেন ।

সাকিব ২০০১ সালে বিকেএসপির প্রতিভা অন্বেষন কার্যক্রমে মাগুরা জেলার হয়ে নড়াইল ক্যাম্পের জন্য মনোনীত হন । নড়াইল ক্যাম্প থেকে ঢাকার বিকেএসপিতে প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য যে ২০ জন সুযোগ পায় তার মধ্যে সাকিবও ছিলেন ।

বিকেএসপির তৎকালীন ক্রিকেট প্রশিক্ষক আশরাফুল ইসলাম বাপ্পী এবং সাকিবের কোচ সৈয়দ সাদ্দাম হোসেন গোর্কির পরামর্শে সাকিবের বাবা শেষ পর্যন্ত সাকিবকে বিকেএসপির ক্রিকেট বিভাগে ভর্তি করিয়ে দেন ।

বিকেএসপিতে ভর্তির পর বাংলাদেশের হয়ে বয়সভিত্তিক দল গুলোতে অর্থাৎ অনূর্ধ-১৫, অনূর্ধ-১৭, অনূর্ধ-১৯ এর হয়ে খেলার সুযোগ পান এবং নিজের প্রতিভার সাক্ষর রাখেন । ২০০৬ তে ওয়ানডে অভিষেকের পর ২০০৭ তে ভারতের বিপক্ষে টেষ্ট অভিষেক হয় সাকিবের । শুরুটা সাকিব সুলভ না হলেও নিজের জাত চেনান সাকিব । এ

কজন অলরাউন্ডার হওয়া সত্ত্বেও অক্টোবর ২০০৮ এর নিউজিল্যান্ডের বাংলাদেশ ট্যুরের আগ পর্যন্ত সাকিবকে বোলার নয়, ব্যাটসম্যান হিসেবেই গণ্য করা হত । পরের মাসেই বাংলাদেশ দল দুটি টেস্ট, তিনটি ওয়ানডে ও একটি টি-২০ খেলতে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে যায় । দক্ষিণ আফ্রিকার শক্তিশালী ব্যাটিং লাইন আপের বিপক্ষে ১ম টেস্টের দ্বিতীয় দিনেই পাঁচ-পাঁচটি উইকেট তুলে নেন সাকিব । দ্বিতীয় টেস্টে সাকিব আবারও এক ইনিংসে ৫ উইকেট শিকার করেন । ঐ সিরিজে সাকিব ২০.৮১ গড়ে ১১টি উইকেট নেন । ২০০৯ সালটা সাকিবের ক্যারিয়ারের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল ।

ধারাবাহিক পারফরমেন্স এর পুরস্কার পান সাকিব । ২০০৯ সালের ২২ জানুয়ারী সাকিব প্রথমবারের মত আইসিসি’র ওডিআই অলরাউন্ডার তালিকার ১ নম্বরে উঠে আসেন । তিনি আইসিসি ক্রিকেটার অফ দ্যা ইয়ার এবং আইসিসি টেষ্ট প্লেয়ার অফ দ্যা ইয়ার এর জন্য মনোনয়ন পান । কিন্তু পুরষ্কার পাননি । তবে ঐ একই বছর শচীন টেন্ডুলকার, জ্যাক ক্যালিস, গৌতম গম্ভীরের মত খেলোয়াড়কে পিছনে ফেলে জিতে নেন উইজডেন টেষ্ট প্লেয়ার বর্ষসেরার পুরষ্কার ! ২০১১তে সাকিব সেরা টেষ্ট অলরাউন্ডারের তালিকায়ও ১ নম্বরে উঠে আসেন । বিশ্বের নম্বর ওয়ান অলরাউন্ডার, বিভিন্ন ফরম্যাটের ক্রিকেটে তাই সাকিবের চাহিদাও বাড়তে থাকে । বর্তমনে সাকিব বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যে সকল দলের হয়ে খেলছেন তাদের মধ্যে অন্যতম দল গুলো হলো- কলকাতা নাইট রাইডার্স, ওর্চেস্টারশায়ার, ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটরস, লিচেস্টারশায়ার, বার্বাডোজ ট্রাইডেন্ট, অ্যাডিলেড স্ট্রাইকার্স ।

এখন পর্যন্ত ৪২ টেস্ট, ১৫৫ ওয়ানডে ও ৩৮টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছেন সাকিব। টেস্টে ১৯টি ফিফটি ও তিনটি শতকের সাহায্যে ৩৯.৭৬ গড়ে ২,৮২৩ রান করেছেন। ওয়ানডেতে ৩৫.৩৩ গড়ে ৪,৩৮২ রান। ৩০টি অর্ধশতকের পাশাপাশি রয়েছে ছয়টি সেঞ্চুরি। আর ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত সংস্করণে ২৪.০৮ গড়ে ৮৪৩ রান করেন। এ ফরমেটে তিনি পাঁচটি পঞ্চাশোর্ধ ইনিংস উপহার দেন।

বল হাতেও দারুণ সফল সাকিব। টেস্ট, ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টিতে তার উইকেট সংখ্যা যথাক্রমে ১৪৭, ২০১ ও ৪৫। দেশের হয়ে টেস্ট বাদে বাকি দুই ফরমেটে তিনি সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি। একদিনের ক্রিকেটে আর মাত্র সাত উইকেট পেলেই আব্দুর রাজ্জাকের ২০৭ উইকেটের রেকর্ড টপকে যাবেন।

২০১২ সালের ১২ই ডিসেম্বর তারিখে সাকিব আল হাসান যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী উম্মে আহমেদ শিশিরের সাথে জীবনের দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করেন । শিশির সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এ স্নাতক, তিনি পড়াশোনা করেন মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে । এত এত খ্যাতির পরেও সাকিবকে মাঝেমাঝে অপ্রীতিকর অবস্থার মধ্যে পড়তে হয়েছে তার কিছু বিতর্কিত আচরনের জন্য । জরিমানা গুনতে হয়েছে এমনকি নিষিদ্ধ হয়েছেন জাতীয় দল থেকেও । তাকে নিয়ে আলোচনা সমালোচনার ঝড় বয়ে গেছে দেশ-বিদেশের ক্রিকেটাঙ্গনে । তবে কোন কিছুই মাঠে সাকিবের পারফর্মেন্সের উপর প্রভাব ফেলতে পারে নি । সাকিবের প্রত্যাবর্তন প্রতিবারই ছিল সাকিবের মতই ।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফেব্রুয়ারি ২০১৮
সোম মঙ্গল বুধ বৃহঃ শুক্র শনি রবি
« জানু    
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮  

মাগুড়া সদর

ফেসবুকে আমরা

Pages