স্বাস্থ্য মানবদেহে কার্বাইডের নানা ক্ষতিকর দিক

মানবদেহে কার্বাইডের নানা ক্ষতিকর দিক

আম, কলা, কাঁঠাল, লিচু, পেঁপে এবং অন্যান্য অনেক ফল পাকানোর কাজে কার্বাইড ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে

page12অনেকে অভিযোগ করছেন বোমা বানানোর মসলা এবং ওয়েল্ডিংয়ে ঝালাইয়ের ক্যালসিয়াম কার্বাইড (সংক্ষেপে কার্বাইড) দিয়ে নাকি কাঁচা আম পাকানোর কর্মটি ব্যাপকভাবে সম্পাদিত হচ্ছে। এ দুষ্কর্মটি শুধু আমের বেলায় নয়, আরো নানা রকম ফল যেমন-কলা, নাশপাতি, জাম, আনারস, কিউইসহ আরো অনেক ফলের ক্ষেত্রেও করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, ভারত, পাকিস্তান, মালয়েশিয়াসহ অনেক দেশেই ফল পাকানোর জন্য কার্বাইড এবং এ জাতীয় অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।

এশিয়ার অনেক দেশে ফল পাকানোর জন্য প্লাস্টিকের আবরণ ব্যবহার করা হয়। সাধারণত ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশে আম পাকানোর জন্য এর সঙ্গে ক্যালসিয়াম কার্বাইড ব্যবহার করা হয়। ক্যালসিয়াম কার্বাইড (ঈধ ঈ২) ধূসর কালো দানাদার রসুনের গন্ধযুক্ত রাসায়নিক পদার্থ। ইস্পাত কারখানায়, ধাতব বস্তু কাটাকাটি, ওয়েল্ডিং ইত্যাদি কাজের জন্য অ্যাসিটিলিন গ্যাস তৈরি করার জন্য এটা ব্যবহার করা হয়। বিস্ফোরক দ্রব্য তৈরির জন্যও এটি ব্যবহার করা হয়। সাধারণত এটা ‘কার্বাইড’ বা ‘মশলা’ নামে পরিচিত।

যেসব রাসায়নিক উপাদান জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি বহন করে সে তালিকায় ক্যালসিয়াম কার্বাইড অন্তর্ভুক্ত। বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত ক্যালসিয়াম কার্বাইড বিশুদ্ধ নয়। এর সঙ্গে আর্সেনিক এবং ফসফরাস মিশ্রিত থাকার ফলে মানব স্বাস্থ্যের জন্য এটা আরো ক্ষতিকর। এজন্য ফল পাকানোর কাজে অধিকাংশ দেশে এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু ইদানীং জানা যাচ্ছে আম, কলা, কাঁঠাল, লিচু, পেঁপে এবং অন্যান্য আরো অনেক ফল পাকানোর কাজে কার্বাইড ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ক্যালসিয়াম কার্বাইড মানবদেহের সংস্পর্শে এলে তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদি উভয় ধরনের বিষক্রিয়া এবং ক্ষতিকর প্রভাবের আশঙ্কা রয়েছে।

ক্যালসিয়াম কার্বাইডের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে ঃ
* শ্বাসের সঙ্গে ক্যালসিয়াম কার্বাইডের গ্যাস গ্রহণ করলে তা ফুসফুসের জন্য ক্ষতিকর। সাধারণত এর ফলে শ্বাসকষ্ট এবং কাশি হয়। অতিমাত্রায় গ্রহণ করলে ফুসফুসে পানি জমে তীব্র শ্বাসকষ্ট হতে পারে।
* ক্যালসিয়াম কার্বাইড ত্বকের সংস্পর্শে এলে জ্বালা পোড়া হয় এবং লাল হয়ে ফুলে যেতে পারে।
* চোখের সংস্পর্শে এলে চোখেও জ্বালা পোড়া হয় এবং চোখের কর্ণিয়া বিনষ্ট হতে পারে।
* ক্যালসিয়াম কার্বাইড মুখ, গলা এবং কোমল ঝিলি্ল পর্দায় প্রদাহ সৃষ্টি করে। 
* ক্যালসিয়াম কার্বাইড থেকে উৎপন্ন অ্যাসিটিলিন গ্যাস অতিমাত্রায় শরীরে প্রবেশ করলে মাথা ঝিমঝিম করে, মাথাব্যথা, দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, বুক ধড়ফড় করা, ডায়রিয়া, পেটে ব্যথা, বমিবমিভাব এবং বমি হতে পারে। এমনকি অ্যাসিটিলিন বিষক্রিয়ার ফলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদে ক্যালসিয়াম কার্বাইড এবং অ্যাসিটিলিনের মানবদেহের ওপর ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে তেমন কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না। তবে বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী আশঙ্কা করা হয় এর ফলে নানারকম দীর্ঘমেয়াদি স্নায়ুরোগ এমনকি বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার হতে পারে। গর্ভবতী মায়েরা কার্বাইড দিয়ে পাকানো ফল খেলে গর্ভস্থ শিশুর ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ক্যালসিয়াম কার্বাইড শুধু ফল ভোক্তাদের জন্য ক্ষতিকর নয়; এটা ব্যবহারকারী কৃষক এবং ব্যবসায়ীরাও এর বিষক্রিয়ার শিকার হতে পারে। আর কার্বাইডের সঙ্গে মিশ্রিত আর্সেনিক এবং ফসফরাসের ক্ষতিকর প্রভাবের সম্ভাবনা অনেক বাড়িয়ে দেয়।

বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য অধ্যাদেশ ২০০৫ সাল অনুসারে সব ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদান যেমন-ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ফরমালিন, ইটেফন, কীটনাশক উপাদান কিংবা ক্ষতিকর বিষাক্ত খাদ্য বস্তুকে/স্বাদ বৃদ্ধিকারক উপাদান ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। কিন্তু আইনের বাধানিষেধ উপেক্ষা করে অসাধু ব্যবসায়ীরা এসব দ্রব্য অবলীলায় ব্যবহার করছে এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। অতএব সবাইকে এদিকে নজর দিতে হবে এবং সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।

জনসাধারণকে ফল ও সবজি কেনা এবং খাওয়ার ক্ষেত্রে কতগুলো বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত : 
* ফল কেনার সময় ক্ষতযুক্ত ফল কেনা উচিত নয়।
* কৃত্রিম উপায়ে পাকানো সব ফলের রঙ একই রকম হয় এবং এদের রঙ চকচকে আকর্ষণীয় হয়ে থাকে।
* খাবার এবং রান্নার আগে ফল এবং সবজি পরিষ্কার প্রবাহমান পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে।
* ফল-সবজি রান্নার আগেই এর খোসা ছাড়িয়ে নিলে বিষাক্ত কীটনাশক উপাদানের পরিমাণ কমে যাবে।
* খোলা বাজার থেকে কাটা ফল কেনা উচিত নয়।
* ছত্রাক সংক্রমিত ফল-সবজি কখনো খাওয়া উচিত নয়।
* ফল এবং সবজির মৌসুম ছাড়া অন্য সময়ে বিক্রীত পাকা ফল কেনা উচিত নয়। কারণ এগুলো কৃত্রিম উপায়ে পাকানোর সম্ভাবনা বেশি থাকে।
* ফল ও সবজি ধোয়ার জন্য ডিটারজেন্ট ব্যবহার করা উচিত নয়। কারণ এর ফলে ডিটারজেন্টের রাসায়নিক উপাদান ফল ও সবজির ভেতর প্রবেশ করে।

ফল এবং সবজি স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। ফল এবং সবজি আমাদের পুষ্টি, ভিটামিন ও খনিজ উপাদানের চাহিদা মেটায়; রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে। কিন্তু নিয়তির পরিহার কিছু অসাধু বিবেকবর্জিত ব্যবসায়ী চক্রের দুষ্কর্মের কারণে ফল এবং সবজি পরিণত হয়েছে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এবং আশঙ্কার বিষয়। আমরা নিরাপদ ফল এবং সবজি গ্রহণ করতে চাই। ফল ও সবজির চাষাবাদ এবং ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার চাই। কিন্তু যাদের অপকর্মের জন্য আম, লিচু, কলা কিংবা অন্যান্য ফল ও সবজি জনস্বাস্থ্যের জন্য আতঙ্কের বিষয়ে পরিণত হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি এ বিষয়ে জনগণকে অধিকতর সচেতন হতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সেপ্টেম্বর ২০১৮
সোম মঙ্গল বুধ বৃহঃ শুক্র শনি রবি
« আগ    
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০

মাগুড়া সদর

ফেসবুকে আমরা

বিভাগ

দিনপঞ্জিকা

সেপ্টেম্বর ২০১৮
সোম মঙ্গল বুধ বৃহঃ শুক্র শনি রবি
« আগ    
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০

রাজনীতি

অর্থনীতি