ফিচারtitle_li=স্বাস্থ্য ফরমালিন এর ইতিবৃত্তঃ ক্ষতিকর দিক এবং প্রতিকার

ফরমালিন এর ইতিবৃত্তঃ ক্ষতিকর দিক এবং প্রতিকার

formalin1বেশ কয়েকদিন ধরেই ফরমালিন এর বিরুদ্ধে অভিযান চলছে, জরুরী পদক্ষেপ হিসেবে ধ্বংস করা হয়েছে বিপুল পরিমানে ফরমালিন যুক্ত ফল, আর এভাবেই ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ফরমালিন ও কার্বাইডযুক্ত ফলের বিরুদ্ধে অভিযানে বেরিয়ে এসেছে ভয়াবহ তথ্য। আসুন জেনে নেই ফরমালিন সম্পর্কে বিস্তারিতঃ

ফরমালিনে কি?

ফরমালিন হল এক ধরনের কেমিক্যাল রসায়ন বিজ্ঞানের ভাষায় মিথান্যাল আর অ্যালকোহল এর জলীয় দ্রবণ। এটি সাধারণত মেডিক্যাল সাইন্স ও বায়োলজি এর বিভিন্ন ল্যাব গুলোতে নানা জীবজন্তুর বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংরক্ষণের কাজে ব্যবহার করা হয়। ফরমালিনের খুব কাছাকাছি আর একটি জিনিস আছে নাম ফরমিক এসিড যা পিঁপড়ার কামড়ে থাকে। প্রিয় পাঠক পিঁপড়া কিন্তু তাঁর খাবার সংরক্ষণ করে অনেকটা অসাধু ব্যাবসায়িদের মত ফরমালিন এর কাছা কাছি একটা জিনিস দিয়ে।

ফরমালিন এ ক্ষতির মাত্রাঃ

এক কেজি মাছে যে পরিমাণ ফরমালিন দেওয়া হয় সেটা যদি সবচেয়ে কম করে ধরা হয়  তাহলে তা প্রায় কয়েক শত কোটি বড় লাল পিঁপড়ার কামড়ের ফরমিক এসিড থেকে পরিমানে অনেক বেশী। ভাবুন তো একটা বড় লাল পিঁপড়া কামড় দিলে শরীরের কি অবস্থা হয়! যদি শত শত কোটি পিঁপড়া কামড় দিত তাহলে কি হত? আর খাবারের সাথে ফরমালিন খাবার ফলে তা হজমের সময় রক্তে চলে যায় এবং ধীরে ধীরে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ যেমন পাকস্থলী, লিভার, কিডনি ইত্যাদি কে অকার্যকর করে ফেলে। এমনকি ক্যান্সারের মত মারাত্নক রোগ হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়িয়ে দেয় কয়েকশত গুন।

ফরমালিন সনাক্তকরণ- কিটবক্সঃ

বতর্মানে সারাদেশে বিভিন্ন বাজার ও প্রতিষ্ঠানে ৮৭টি ফরমালিন সনাক্তকরণ ‘কিটবক্স’ রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। খাদ্য মন্ত্রণালয় এই কিটবক্স বিতরণ করে বিভিন্ন পয়েন্টে। তাছারা ও কৃষিবিজ্ঞানী ফারুক বিন হোসেন ইয়ামিন এর উদ্ভাবিত প্রযুক্তি তে  বলেছেন ১ টিউব পরিমাণ পানি নিয়ে তার মধ্যে মাছ, ফল, সবজি ধুয়ে ফেলুন। এরপর ১ ফোঁটা ফরমালিন টেস্টার (দ্রবণ) মিশিয়ে ৫ সেকেন্ড ঝাঁকুন। দ্রবণের রং হলুদ বা বর্ণহীন হলে বুঝতে হবে ফরমালিন আছে। আর দ্রবণের রং সবুজ বা নীল হলে ফরমালিন নেই বলে প্রামাণিত হবে। আর এই এক ফোঁটা ফরমালিন টেস্টার বা দ্রবণটির দাম পড়বে মাত্র ১ টাকা।

মানব শরীরে ফরমালিনের সহনীয় মাত্রাঃ 

সম্প্রিতি রাজধানীতে ডিএমপির ধারাবাহিক অভিযানে কারওরান বাজার এলাকার ফলের দোকান ও বাজারেও অভিযান চালায় তারা। অভিযানে আমে ১০১.৭৪ পিপিএম মাত্রায় ফরমালিন পাওয়া যায়। লিচুতে পাওয়া যায় ৭৩.৩২ পিপিএম। যেখানে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতেফলের ক্ষেত্রে ০.১৫ পিপিএম পর্যন্ত ফরমালিন মানুষের জন্য সহনীয়। 

ফরমালিনের ক্ষতিকর দিক-

ফরমালডিহাইড চোখের রেটিনাকে আক্রান্ত করে রেটিনার কোষ ধ্বংস করে। ফলে মানুষ অন্ধ হয়ে যেতে পারে।

তাৎক্ষণিকভাবে ফরমালিন, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, কারবাইডসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহারের কারণে পেটের পীড়া, হাঁচি, কাশি, শ্বাসকষ্ট, বদহজম, ডায়রিয়া, আলসার, চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগ হয়ে থাকে।

ধীরে ধীরে এসব রাসায়নিক পদার্থ লিভার, কিডনি, হার্ট, ব্রেন সব কিছুুকে ধ্বংস করে দেয়। লিভার ও কিডনি অকেজো হয়ে যায়। হার্টকে দুর্বল করে দেয়। স্মৃতিশক্তি কমে যায়।

ফরমালিনযুক্ত খাদ্য গ্রহণ করার ফলে পাকস্থলী, ফুসফুস ও শ্বাসনালিতে ক্যান্সার হতে পারে। অস্থিমজ্জা আক্রান্ত হওয়ার ফলে রক্তশূন্যতাসহ অন্যান্য রক্তের রোগ, এমনকি ব্লাড ক্যান্সারও হতে পারে। এতে মৃত্যু অনিবার্য।

মানবদেহে ফরমালিন ফরমালডিহাইড ফরমিক এসিডে রূপান্তরিত হয়ে রক্তের এসিডিটি বাড়ায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাস অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করে।

ফরমালিন ও অন্যান্য কেমিক্যাল সামগ্রী সব বয়সী মানুষের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। তবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ শিশু ও বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে। ফরমালিনযুক্ত দুধ, মাছ, ফলমূল এবং বিষাক্ত খাবার খেয়ে দিন দিন শিশুদের শারীরিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে। কিডনি, লিভার ও বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নষ্ট, বিকলাঙ্গতা, এমনকি মরণব্যাধি ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে শিশু-কিশোররা। শিশুদের বুদ্ধিমত্তা দিন দিন কমছে।

গর্ভবতী মেয়েদের ক্ষেত্রেও মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে। সন্তান প্রসবের সময় জটিলতা, বাচ্চার জন্মগত দোষত্রুটি ইত্যাদি দেখা দিতে পারে, প্রতিবন্ধী শিশুর জন্ম হতে পারে।

এ ধরনের খাদ্য খেয়ে অনেকে আগের তুলনায় এখন কিডনি, লিভারের সমস্যাসহ বিভিন্ন রোগের সমস্যায় ভুগছেন। দেখা যাচ্ছে, কয়েক দিন পরপর একই রোগী ডায়রিয়ায় ভুগছেন, পেটের পীড়া ভালো হচ্ছে না, চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

 মাছ থেকে ফর্মালিনের দূর করার উপায়-

পরীক্ষায় দেখা গেছে পানিতে প্রায় ১ ঘন্টা মাছ ভিজিয়ে রাখলে ফর্মালিনের মাত্রা শতকরা ৬১ ভাগ কমে যায়।

লবনাক্ত পানিতে ফর্মালিন দেওয়া মাছ ১ ঘন্টা ভিজিয়ে রাখলে শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ ফর্মালিনের মাত্রা কমে যায়।

প্রথমে চাল ধোয়া পানিতে ও পরে সাধারন পানিতে ফর্মালিন যুক্ত মাছ ধুলে শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ ফর্মালিন দূর হয়।

সবচাইতে ভাল পদ্ধতি হল ভিনেগার ও পানির মিশ্রনে (পানিতে ১০ % আয়তন অনুযায়ী) ১৫ মিনিট মাছ ভিজিয়ে রাখলে শতকরা প্রায় ১০০ ভাগ ফর্মালিনই দূর হয়।

ফল ও সবজি থেকে ফর্মালিনের দূর করার প্রক্রিয়া –

খাওয়ার আগে ১০ মিনিট গরম লবণ পানিতে ফল ও সবজি ভিজিয়ে রাখতে হবে।

ফরমালিন দূর করতে হলে সবার প্রথমে এর আমদানি বন্ধ করতে হবে, পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০০৯-১০ থেকে ২০১২-১৩ এ চার অর্থবছরে ৩৮টি আমদানিকারকের মাধ্যমে মোট ১০ লাখ ৭৪ হাজার ৪৪৮ দশমিক ৪৫ কেজি ফরমালিন আমদানি করা হয়। সবচেয়ে বেশি ফরমালিন এসেছে ২০০৯-১০ অর্থবছরে। এ বছর মোট পাঁচ লাখ ৪৪ হাজার ৮৪৬ দশমিক ৫৩ কেজি ফরমালিন আমদানি করা হয়েছে। এর পরে ২০১০-১১ অর্থবছরে দুই লাখ ৬৯ হাজার ৩৩২ দশমিক ৭৭ কেজি, ২০১১-১২ অর্থবছরে দুই লাখ পাঁচ হাজার ৯৬ দশমিক ১৫ কেজি এবং ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৫৫ হাজার ১৭৩ কেজি ফরমালিন আমদানি করা হয়। এ আমদানি রোধের ক্ষেত্রে ব্যাবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছে বানিজ্য মন্ত্রনালয়।

এছারা ডিএমপি উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান জানান, চেকপোস্টে পরীক্ষায় যে পরিমাণ ফরমালিন পাওয়া যাচ্ছে তা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। ফরমালিন খাদ্য গ্রহণের ফলে মানবদেহে ক্যানসার, অকালমৃত্যু, কিডনী বিকল হওয়া, কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে সমস্যা, চোখের কর্ণিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পাওয়া এবং নানা রকম শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়।

অসাধু ব্যবসায়ীকে কোনো ফলে ফরমালিন বা কার্বাইড মেশাতে দেখলে বা ওই কাজে কাউকে সহযোগিতা করতে দেখলে বা এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলে ০১৭১৩৩৯৮৩১৩ ও ০১৭৭০৫৪০৯০৪ নম্বরে জানানোর জন্য ডিএমপির পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ডিসেম্বর ২০১৭
সোম মঙ্গল বুধ বৃহঃ শুক্র শনি রবি
« নভে    
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১

মাগুড়া সদর

ফেসবুকে আমরা

Pages